রাজধানী ও এর আশেপাশে বিভিন্ন এলাকার শতাধিক তৈরি পোশাক কারখানায় ঈদের আগে বেতন-বোনাস নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর এবং কয়েকটি শ্রমিক সংগঠন।
এমন আশঙ্কার পর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আগেভাগেই এসব কারখানার তালিকা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। পাশাপাশি কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরও আলাদা তালিকা পাঠিয়েছে তৈরি পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন-বিজিএমইএ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে।
শ্রমিক সংগঠনগুলো এরই মধ্যে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বেতন ও বোনাস দেয়ার অনুরোধ করেছে মালিকদের কাছে ।
তবে বিজিএমইএ বলছে, এই ধরনের কোনো আশঙ্কাই নাই তাদের। নিয়মমাফিক নির্দিষ্ট সময়ে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস দেয়া হবে। কোনো মালিক না দিলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে যেহেতু এটি অনেক বড় একটা খাত, সেক্ষেত্রে ২/১টি কারখানায় সমস্যা হতে পারে বলে মনে করে সংগঠনটি।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, আমরা মূল বেতনের সমান বোনাস দেয়ার দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু মালিকেরা তা না দিয়ে গড়ে ৫শ বা ১ হাজার টাকা হারে বোনাস দেয়।
প্রতি বছর ঈদের আগে শ্রম মন্ত্রণালয় মালিকদের সাথে বসে বেতন- বোনাস পরিশোধ করার জন্য দায়সারা গোছের একটা নির্দেশ দিয়ে থাকে এমন অভিযোগ করে এই শ্রমিক নেত্রী বলেন, আসলে কত টাকা বোনাস দেয়া হয়েছে, কত তারিখে দেয়া হয়েছে, কতগুলো কারখানা ঠিকমত বেতন-বোনাস দিয়েছে; এসবের কোনো তদারকি করে না শ্রম মন্ত্রণালয়।
সরকারের এই নির্দেশ যদি যথাযথ বাস্তবায়ন করা না হয়, তাহলে ঘোষণা দিয়ে কী লাভ, প্রশ্ন রাখেন মোশরেফা মিশু।
‘শুধু ৭৩ টি কারখানা নয়। বহু কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিতে পারে। আমার মনে হয়, শতাধিক কারখানায় এমন সমস্যা হতে পারে’।
শ্রমিকদের দিয়ে হয়তো ১৫ জুন পর্যন্ত কাজ করানো হবে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমরা ২৫ রোজা থেকে ছুটি দেয়ার অনুরোধ করেছি। কারণ এক সাথে সবাইকে ছুটি দেয়া হলে উত্তরবঙ্গের শ্রমিকদের বাড়ি ফেরা কষ্টকর হয়। তাই ধাপে ধাপে ছুটি দিলে ভাল হতো।
তবে বেতন-ভাতা নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না বলে মনে করেন বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান।
তিনি চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, প্রতি বছর ঈদে যেভাবে ঈদ বোনাস ও বেতন দেয়া হয়, এবারও সেভাবেই দেয়া হবে।
‘অনেকেই অনেক কথা বলে। কিন্তু গত ১০ থেকে ১২টি ঈদে এ জাতীয় ঝামেলা আমরা ভালভাবেই ট্যাকল দিতে পেরেছি। অতএব আমি মনেকরি না যে, এবার কোনো সমস্যা হবে। সমস্যা হলে সবাইকে মিলে সমাধান করতে হবে।’
তবে যেহেতু এত বড় একটা খাত। দুই-একটি কারখানায় সমস্যা হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ঈদের মাস বলতে বাড়তি কিছু না। প্রত্যেক মাসেই শ্রমিকদের বেতন দেয়া হয়। এবার শুধু বোনাসটা যোগ হবে।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, হাতে গোনা কয়েকটি কারখানায় সরকারের ঘোষিত নির্ধারিত তারিখে বেতন দেবে কিন্তু অধিকাংশ কারখানায় বেতন-বোনাস পরিশোধ করবে না।
এমন দাবির বিষয়ে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, সবাই নির্দিষ্ট তারিখে বেতন দেবে। কেউ না দিলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে এমন কারখানাগুলো চিহ্নিত করে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দিয়েছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। এতে তৈরি পোশাক কারখানা অধ্যুষিত এলাকা বলে খ্যাত ঢাকার আশুলিয়া ও টঙ্গীতে কয়েকটি কারখানায় বেতন-বোনাসের দাবিতে শ্রমিকরা আন্দোলন সংগ্রাম নামতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়।
এছাড়াও ঈদের আগে বেতন-বোনাস নিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে এমন কারখানাগুলোকে চিহ্নিত করে গত ৩০ মে একটি তালিকা বিজিএমইএ’কে দিয়েছে কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর।
ওই তালিকায় আশুলিয়ার জামগড়ার বাঁধন কর্পোরশেন লিমিডেট ও অন্বেষা স্টাইল কারখানাসহ ৭৩টি কারখানার নাম রয়েছে।
জাতীয় নির্বাচনের আগে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে দেশে-বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে। এ কারণে ঈদের আগে শ্রমিকরা যাতে সুষ্ঠুভাবে বেতন-ভাতা পায় সেজন্য সরকার ও বিজিএমইএ মিলে অগ্রিম প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে রেখেছে বলে জানা গেছে।
বিজিএমইএ সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, কারখানা মালিকদেরকে মে মাসের পুরো বেতন, জুনের অর্ধেক বেতন ও বোনাস পরিশোধ করতে হবে।
এক সাথে এই টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে চাপে পড়তে পারে কিছু কারখানা মালিক। তাই যাতে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে ঢাকাকে ১৫টি জোনে ভাগ করে জোনভিত্তিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়াও কেন্দ্রীয়ভাবে ক্রাইসিস কন্ট্রোল রুম রয়েছে। এর বাইরে সরকারের গঠিত আঞ্চলিক ক্রাইসিস কমিটিও কাজ করছে।








