ভারতের ১৭তম লোকসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে ৯৬টি আসনে ভোট চলছে আজ। সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলবে এ ভোটগ্রহণ। লোকসভা নির্বাচনের পাশাপাশি ১৮টি বিধানসভা আসনেও উপ-নির্বাচন।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে ভারতের লোকসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় পর্যায়ের ভোটগ্রহণ শুরু হলো। এর আগে ১১ এপ্রিল প্রথম দফায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল ৯১টি আসনের ভোটগ্রহণ। আর আজ ১১টি রাজ্য এবং একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মোট ৯৬টি আসনের ভোটযুদ্ধ।
নিরাপত্তার অভাবে ত্রিপুরার পূর্ব আসনে আজ ভোট গ্রহণের নির্ধারিত দিন থাকলেও মঙ্গলবার রাতে তা পিছিয়ে ২৩ এপ্রিল ধার্য করেছে দেশটির নির্বাচন কমিশন।
দ্বিতীয় ধাপে ১টি আসনের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুডুচেরি (প্রাক্তন পন্ডিচেরি) ও ৩৯টি আসনের রাজ্য তামিলনাড়ু ছাড়া বাকি ১০টি রাজ্যে আংশিক ভোটগ্রহণ হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে কর্ণাটকের ১৪টি, মহারাষ্ট্রের ১০টি, উত্তরপ্রদেশের ৮টি, জম্মু ও কাশ্মীরের ২টি এবং মণিপুরের ১টি।
এছাড়া আসাম, বিহার ও ওড়িশ্যায় ৫টি করে এবং পশ্চিমবঙ্গ ও ছত্তিশগড়ের ৩টি করে আসনেও ভোটগ্রহণ আজ।
এ দফায় ভারতজুড়ে ১৫ কোটি ৭৯ লাখ ৩৪ হাজার ৫১৮ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। যাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১ হাজার ৬২৯ জন প্রার্থী। আর মোট ভোটকেন্দ্র ১ লাখ ৮১ হাজারটি ৫২৫টি।
দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে হেভিওয়েট প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এইচ.ডি.দেবগৌড়া, বিজেপির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সদানন্দ দেবগৌড়া, কংগ্রেসের সাবেক মন্ত্রী দীপা দাসমুন্সি, ডিএমকে নেত্রী কানিমোঝি, সাবেক মন্ত্রী এ.রাজা, সাবেক অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরেরর ছেলে কংগ্রেস প্রার্থী কার্তি চিদাম্বরম এবং বিজেপির হেমা মালিনী।
যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। প্রথম দফা নির্বাচনে একাধিক সহিংসতা ও নিহত হবার ঘটনা ও ইভিএম বিকল হওয়ার পুনরাবৃত্তি যেন না হয় সেজন্য নির্বাচন কমিশন আরও সতর্কতা অবলম্বন করেছে।
আয়কর কর্মকর্তাদের নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের ঘটনায় ইতোমধ্যে ভেলোর আসনের ভোট বাতিল করা হয়েছে।
এক সপ্তাহ আগে প্রথম দফার নির্বাচনে ভারতজুড়ে ৬৯.৪৩ শতাংশ ভোট পড়েছিল। দুই দফার এ নির্বাচন শেষ হবার পর আরও পাঁচ দফায় ভোট নেওয়া হবে দেশটিতে। এরপর চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষিত হবে ২৩ মে।
১৭তম লোকসভা নির্বাচনকে ঘিরে গত এক মাস ধরেই সরগরম ছিল ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গন। সরকার ও বিরোধীদের একের পর এক আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে উত্তপ্ত ছিল প্রচারণা।
এবারের নির্বাচনে প্রধান প্রতিপক্ষ ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং কংগ্রেস। তবে নির্বাচনে সমাজবাদী পার্টি, বহুজন সমাজ পার্টি, লোকদল, তৃণমূল কংগ্রেস, তেলেঙ্গানা রাষ্ট্রীয় সমিতি, তেলেগু দেশম, আম আদমি পার্টির মতো আঞ্চলিক দলগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সাত ধাপের ভোট
ভোটে প্রভাব ফেলবে যে বিষয়গুলো
৫০ হাজার কোটি টাকা খরচের এবারের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দল বিজেপির সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে পুরোনো দল কংগ্রেসের মূল লড়াই হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিভিন্ন প্রভাবশালী আঞ্চলিক দলগুলোও ভোটের মোড় ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম। সরকার গঠনের জন্য কোনো দল বা জোটকে অন্তত ২৭২টি আসন পেতে হবে।
মঙ্গলবারই প্রথম দফার নির্বাচনের প্রচারাভিযান শেষ হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নতুন ভোটারদের প্রতি পাকিস্তানের বালাকোটে জঙ্গি শিবিরে ভারতের অভিযান এবং পুলওয়ামায় জঙ্গি হামলায় নিহত সেনাদের প্রতি তাদের ভোট উৎসর্গ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে কংগ্রেস ও বিরোধী দলগুলো সেনা সদস্যদের জীবন নিয়ে বিজেপির রাজনীতির প্রতিবাদ জানিয়েছে।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় এসেছিলেন ভারতের অর্থনীতিতে বিরাট সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কিন্তু সেই থেকে দেশটিতে বেকারত্বের হার কমেনি, বরং বেড়েছে। সমালোচনা-বিতর্কে জড়িয়েছে বড় বড় নীতিমালাগুলো। হয়তো সে কারণেই ক্ষমতা ধরে রাখতে তার বিজেপি এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় জাতীয়তাবাদকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
ধারণা করা হচ্ছে, এবারের লোকসভা নির্বাচনে মূল কিছু ইস্যু ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। এর মধ্যে অবশ্যই রয়েছে বেকারত্ব ও কর্মসংস্থান ইস্যুটি। কেননা এবারের নির্বাচনে তেরো কোটিই নতুন ভোটার।
এছাড়াও অনেক বড় ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে বর্ণপ্রথা ও ধর্মীয় বিভেদপূর্ণ ধারণা। ভারতের প্রায় ৮০ শতাংশ জনগোষ্ঠীই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তাই মোদি ও তার দল বারবারই হিন্দু জাতীয়তাবাদকে উসকে দিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
পাকিস্তান বিরোধী প্রচারণাকেও এ কাজে লাগানো হচ্ছে। এখানেই চলে আসে কাশ্মীর প্রসঙ্গ। কাশ্মীরের পুলওয়ামায় সাম্প্রতিক হামলার ঘটনার মধ্য দিয়ে বিজেপির হিন্দু জাতীয়তাবাদী প্রচারণার পালে হাওয়া লাগছে।
পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত লাগোয়া ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় অংশগুলোতে পাকিস্তানবিরোধী মনোভাব সেই ১৯৪৭ সাল থেকেই বেশ শক্তিশালী। কেননা এই অঞ্চলগুলোতে দেশবিভাগ থেকে শুরু করে পরবর্তী আরও তিনটি যুদ্ধে ব্যাপক প্রাণহানী হয়েছে।
কিন্তু এর পাশাপাশি মুসলিমবিরোধী মনোভাবও এখন দিন দিন ভারতে বেশ স্বাভাবিক একটি বিষয়ে পরিণত হচ্ছে, বিশেষ করে এই উত্তরাঞ্চলীয় এলাকাগুলোতে। ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ বিষয়টি প্রকট হচ্ছে। গত ৫ বছরে ভারতে শুধু বেআইনিভাবে গরু সরবরাহ ও গরুর মাংস খাওয়া বা বিক্রির সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে হিন্দু কট্টরপন্থি বেশ কিছু সহিংস দল ও গোষ্ঠীর আক্রমণে অন্তত ৪০ জন মুসলিম নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
একই সঙ্গে উঁচু ও নিচু বর্ণের ভিত্তিতে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোটা সুবিধার বিপুল ব্যবধান রাখার বিষয়টি উচ্চবর্ণে প্রশংসিত হলেও অন্যান্য বর্ণের জনগোষ্ঠীর জন্য তা হয়ে উঠেছে ক্ষোভের কারণ।
এছাড়া রাজনৈতিক জটিলতা বেশি এবারের লোকসভা নির্বাচনে। গতবারের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত রাজ্যগুলোর মধ্যে কংগ্রেস, বিজেপিসহ স্থানীয় দলগুলোর প্রতি যে বিশেষ অনুরাগ বিদ্যমান ছিল, বেশকিছু রাজ্যে গত বিধানসভা নির্বাচনেই এর মাঝে দেখা দিয়েছে ব্যাপক পরিবর্তন। সেই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা সাত ধাপের লোকসভা নির্বাচনেও থাকবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে ছয় সপ্তাহব্যাপী এ নির্বাচন শুরু হওয়ার পর শেষ হতে হতে আপাতদৃষ্টিতে প্রায় গুরুত্বহীন অনেক ছোট ছোট বিষয়ও শেষ পর্যন্ত বড় হয়ে দেখা দিতে পারে বলে ধারণা করছেন অনেকে।







