সকাল থেকেই ছিল ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি। একপর্যায়ে তা মুসলধারে বৃষ্টিতে পরিণত হয়। কিন্তু সেই বাঁধ না মানা বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার লোকে লোকারন্য হয়ে যায়। সদ্যপ্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা ও সংগীতের কিংবদন্তি তারকা লাকী আখান্দের দীর্ঘদিনের সহকর্মীরাও উপস্থিত হয়েছিলেন তাকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য।
লাকী আখান্দকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে শনিবার সকাল পৌনে ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে আসেন মরহুমের সহকর্মী ও নন্দিত ব্যক্তিত্বরা। এ সময় চ্যানেল আই অনলাইনের কাছে লাকী আখান্দকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন তাদের অনেকেই।
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এমপি
তার গান মানুষের হৃদয়ের গভীরে জায়গা করে নিয়েছে সেই আশির দশকেই। আমাদের প্রিয় মানুষ ও শিল্পী এই লাকী আখান্দ। তার গান বেঁচে রবে চিরকাল। তিনি গান দিয়ে হৃদয় জয় করেছিলেন সবার তেমনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও তিনি দেশমাতৃকার কাজে অবদান রেখেছেন। তার পরিবারের জন্য যা কিছু করা সব করবে সরকার।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নুর এমপি
আমি তার গানের ভীষণ ভক্ত ছিলাম। তিনি আমাদের মাঝে নেই এটাই মেনে নেওয়া কষ্টকর। তার গানগুলো যেন আজীবন বেঁচে থাকে সেজন্য সরকার আমি ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা করব। আর অবশ্যই গানের রয়্যালিটি যেন তার পরিবার পায় সেদিকেও খেয়াল রাখব। একজন মুক্তিযোদ্ধা ও আমার বন্ধু লাকীর জন্য যা করণীয় আমি করব। কথা দিলাম।
সৈয়দ হাসান ইমাম, সাস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
আমরা যারা তাকে ছোট থেকে বড় হতে দেখেছি, তাদের জন্য এই বিদায় বড় বেদনার। আমি দেখেছি কীভাবে সে গানগুলো মানুষপ্রিয় করেছে। তার আত্মার শান্তি কামনা করি।
খুরশিদ আলম, কণ্ঠশিল্পী
আমরা একসঙ্গে বেতার ও টেলিভিশনে কত গান করেছি। দিনগুলো কত ভালোই না ছিল। অথচ আজ সে নেই। আমার চেয়ে তো সে কমপক্ষে ১০ বছরের ছোট। তারপরেও আমার আগে চলে গেল। একদমই ভিন্ন আমেজ ছিল তার গানের সুরে। যেটা সব বয়সী মানুষের হৃদয়ে জায়গা নিয়েছিল।
তিমির নন্দী, স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রের শিল্পী
আমরা গানে গানে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দীপ্ত করেছি। তার গানের সুরে একটা মাদকতা ছিল। যার জন্য শুধু শ্রোতারাই নয়, গানের শিল্পীরাও তার ভক্ত ছিল। আমি নিজেও তার গানের ভক্ত। এমন মানুষের চলে যাওয়া কখনোই কাঙ্খিত নয়।
আসিফ ইকবাল, গীতিকার
লাকী আখান্দ গানের জগতে আমাদের নায়ক ছিলেন। এখনও আছেন, থাকবেনও। তরুণদের মাঝে লাকী ভাইকে আরও ছড়িয়ে দিতে আমাদেরকে কাজ করতে হবে। আমরা লাকী ভাইকে ধারণ করছি মনে-প্রাণে, প্রত্যাশা করি তরুণরাও এই গুণীকে হৃদয়ে ধারণ করবে।
শাকুর মজিদ, লেখক
আমি তাকে সরাসরি কখনো দেখিনি। কিন্তু গানের মধ্য দিয়ে তার সঙ্গে একটা হৃদয়ের যোগাযোগ আমার ছিল। আমি নিয়মিতই তার গান শুঅনতাম। অনেক শিল্পীই আছেন যাদের চাহিদার লিষ্টটা অনেক দীর্ঘ থাকে। কিন্তু আমি তাকে দেখে বোঝেছি মানুষ কতটা নির্লোভ হতে পারে।
মামিন্তী, লাকী আখন্দের মেয়ে
আমার বাবা দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। মিউজিক করে সবাইকে আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি দেশ ও মিউজিক ভালোবাসতেন। অসুস্থ অবস্থায়ও মিউজিক করেছেন, দেশের কথা ভেবেছেন। তার জন্য দোয়া করবেন, এটুকুই প্রত্যাশা সবার কাছে।
আজ শনিবার সকাল ১০টায় জন্মস্থান পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী ও মুক্তিযোদ্ধা লাকী আখন্দের প্রথম জানাজা শেষে মরদেহ নিয়ে আসা হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত সেখানে সর্বস্তরের লোকজন শিল্পীর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। এরমধ্যে বেলা ১১টা ২০ মিনিটের দিকে দেওয়া হয় রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার।
লাকী আখন্দকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এদিন হাতে গোনা উল্লেখযোগ্য মানুষের তালিকায় আছেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামন নূর, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম, ইমপ্রেস ট্রেলিফিল্ম ও চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, সংগীতশিল্পী নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী, তিমির নন্দী, ফোয়াদ নাসের বাবু, কাজী হাবলু, নকীব খান, খুরশীদ আলম, ফকির আলমগীর, লাবু রহমান, ওয়ারফেইজের টিপু, মাইলসের মানাম আহমেদ, বিজন চন্দ্র মিস্ত্রী, তানভীর আলম সজীব, তরুণ, শাহেদ, বেলাল খান, অদিত, গীতিকবি গাজী মাজহারুল আনোয়ার, শহীদুল্লাহ ফরায়জী, আসিফ ইকবাল, কবির বকুল, চিত্রনায়ক ফেরদৌস, অভিনেতা খায়রুল আলম সবুজ, শংকর সাঁওজাল, নাদের চৌধুরী প্রমুখ।
শহীদ মিনার থেকে বেলা ১টার দিকে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে। সেখানে বাদ জোহর দ্বিতীয় জানাজা শেষে নিয়ে যাওয়া হয় মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে। সেখানেই সমাহিত করা হয় নন্দিত এই মানুষটিকে।
টানা আড়াই মাস হাসপাতালে থাকার পর গত সপ্তাহে আরমানিটোলার নিজ বাসায় ফিরেছিলেন কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী লাকী আখন্দ। গতকাল শুক্রবার দুপুর নাগাদ তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। সন্ধ্যার আগে মিটফোর্ড হাসপাতালে নেওয়া হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা নাগাদ কর্তব্যরত চিকিৎসক লাকী আখন্দকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল প্রায় ৬১ বছর।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাকী আখান্দকে শেষ বিদায়ের কিছু আলোকচিত্র :





ছবি : জাকির সবুজ







