যতদিন যাচ্ছে রোহিঙ্গা সঙ্কট বেশ ঘনিভূত হয়ে ওঠছে। এ সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক মাধ্যমগুলো তত একটা জোরালো ভূমিকা পালন না করলেও মিয়ানমারের পক্ষে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ভারত, পাকিস্তান ও চীন। পাশাপাশি মিয়ানমারকে পরোক্ষভাবে সহায়তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রও। যদিও জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের ওপর আমানবিক নীপিড়ন বন্ধে আহ্বান জানিয়েছিলো। কিন্তু সেটিতেও সাড়া দিচ্ছে না শান্তিতে নোবেল জয়ী সু চি’র মিয়ানমার। তারা অবধারিতভাবে বাংলাদেশে পুশইন করেই চলেছে রোহিঙ্গাদের!
জাতিসংঘের সর্বশেষ হিসেব মতে ইতোমধ্যে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রায় সোয়া একলাখ রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে। তবে এ হিসেব আরও বেশি। বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের দেয়া তথ্য বলছে এই সংখ্যা প্রায় তিন লাখের কাছাকাছি। এর মধ্যে বাংলাদেশ সংলগ্ন সীমান্তে ল্যান্ডমাইন পুঁতে রাখছে মিয়ানমার। গত তিনদিন ধরেই তারা এসব মাইন পোঁতা শুরু করেছে। যদিও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এর প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার এসব প্রতিবাদ কর্ণপাত না করে তাদের মতো করেই তারা কাজ করে চলেছে।
এদিকে গত দুই সপ্তাহ ধরে রোহিঙ্গা ইস্যুতে চলা সঙ্কট নিয়ে আন্তর্জাতিক মাধ্যমগুলো যে একেবারেই নিশ্চুপ, তাও নয়। বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিকাঙ্গণ এ ঘটনা নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও রোহিঙ্গা ইস্যুকে প্রাধান্য দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করছে। এর মধ্যে বৃটিশের প্রভাবশালী দৈনিক দ্যা গার্ডিয়ান এর সম্পাদকীয়তে লিখেছে ‘একটি দুষ্ট শাসকের সহানুভূতিহীন প্রতিমা হিসেবে অং সান সু চি আবির্ভূত হচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে।’
রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান ঘটনায় অং সান সু চি’র প্রতি ক্ষোভ বাড়ছে বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ও ব্যক্তিদের। দাবি উঠেছে সু চি’র নোবেল পুরস্কার বাতিল করারও। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ইউরোপিয়ান মিডিয়া ডাইরেক্টর অ্যান্ড্রু স্ট্র্যোলাইন সহ অনেক মানবাধিকারকর্মী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে এই দাবি তুলেন।
এর মধ্যে রোহিঙ্গাদের সহযোগিতার জন্য এবং তাদের সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য বাংলাদেশে এসেছিলেন ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেত্নো মাসুদি। এবার একই ইস্যুতে বাংলাদেশে এসেছেন তুরস্কের ফার্স্ট লেডি পরাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত চাভুসোগলুর। এর আগে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়িপ এরদোগান বলেছেন, রোহিঙ্গাদের পাশে থেকে তাদের সার্বিক সহযোগিতা করবে তার দেশ। একইভাবে ইন্দোনেশিয়াও রোহিঙ্গাদের পাশে থাকবে বলেও আশ্বাস দিয়েছে। বেশ ভালো কথা। কিন্তু এতে করে চলমান সঙ্কট কতটা নিরসন হবে? বিশেষ করে বাংলাদেশ কি ভারমুক্ত হতে পারবে?
সাম্প্রতিক বিষয়গুলো বিবেচনা করলে এতটুকু বোঝা যাচ্ছে, চলমান রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে বাংলাদেশ বেশ ঝামেলায় পড়তে যাচ্ছে! হতে পারে বাংলাদেশকে সমস্যায় ফেলতে এটা উপমহাদেশীয় রাজনৈতিক কৌশল। সব কিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছে রোহিঙ্গা একটা ইস্যুমাত্র; মূল টার্গেট বাংলাদেশ! আর এ শঙ্কাটা বাড়িয়েছে পাকিস্তান ও চীন। এ দু’টি দেশ মিয়ানমারের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে এবং মিয়ানমারকে তারা সার্বিক সহযোগিতাও করে যাচ্ছে।
মিয়ানমারের পাশে পাকিস্তান ও চীনের থাকার বিষয়টি আমাদের কাছে স্পষ্ট। কেননা, বাংলাদেশের কাছে একাত্তরে পরাজিত রাষ্ট্র পাকিস্তান। নানা ভাবেই এই দেশটি বাংলাদেশের বিরুদ্ধাচরণ করবে এটাই স্বাভাবিক। আবার একাত্তরে চীন আমাদের পাশে না থেকে পাকিস্তানের পাশেই থেকেছিল। তাদেরকেই সহযোগিতা করেছিল। এতে করেই বোঝা যায় পাকিস্তান ও চীন আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র নয়। তারা নানা কৌশলে বাংলাদেশকে সমস্যার মুখেই ঠেলে দিবে। কিন্তু প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের কৌশল নিয়ে! একাত্তরে যে ভারত আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিল, সেই তারা এবার মিয়ানমারের পক্ষে!
এদিকে ভারতের সাথে পাকিস্তানের শত্রুতা আবার চীনের সাথেও। এবার রোহিঙ্গা ইস্যুতে তারা শত্রুতা ভুলে মিত্রর বেশ ধারণ করে এক্যজোট হয়ে মিয়ানমারের পক্ষে দাঁড়ানোটা বাংলাদেশের জন্য অশনি সঙ্কেত বলেই মনে হচ্ছে। তাদের এভাবে একজোট হওয়া মানেই বাংলাদেশের দিকে বিপদ ধেয়ে আসার সম্ভাবনাটা একেবারেই উড়িয়ে দেয়া যায় না।তারা নিজেদের স্বার্থের জন্য বাংলাদেশকে সমস্যায় ফেলার চেষ্টা করছে বা করবে, সেটি এখন অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে তাদের সাম্প্রতিক আচরণে।
সুযোগ পেলেই বাংলাদেশের প্রতি পতিশোধ নিতে চাইবে পাকিস্তান, ব্যাপারটা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। তবে চীন আর ভারত কেন বাংলাদেশকে বিপদের দিকে ঠেলে দিতে চাইবে? সব থেকে বড় কথা হচ্ছে ভারত তো আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র যাকে অকৃত্রিম বন্ধু বলা যায়। তাহলে তাদের স্বার্থ কী? এমন প্রশ্নটা অনেকের মাঝেই আসতে পারে। আসাটাও স্বাভাবিক। আজকে অমুক দেশের সাথে তমুক দেশের যেসব সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে সেসবই স্বার্থকেন্দ্রিক। একইভাবে মিয়ানমারের পাশে চীন ও ভারতের থাকাটাও স্বার্থকেন্দ্রিক।
বাংলাদেশের সাথে চীনের একটা অলিখিত প্রতিযোগিতা চলছে দীর্ঘদিন ধরেই। সেটা ব্যবসায়ীক প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশের গার্মেন্ট খাত নিয়ে চীন অনেক আগের থেকেই আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী। আমাদের দেশের অস্থির সময়কে পুঁজি করে গার্মেন্টস সেক্টরের অনেক কাজই তারা নিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। তারপরও বিশ্বব্যাপী ক্রেতাদের আগ্রহের মূল কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশের গার্মেন্ট, এখানকার কাজের কোয়ালিটি সহ স্বল্প মূল্যে পোশাক তৈরির দিকটা। তাই এখনও আমরা অন্যান্য দেশের তুলনায় সর্বোচ্চ এগিয়ে। কিন্তু চীন চাচ্ছে আমাদের এই সেক্টরকে শূন্য করে পুরো বাজারটা তাদের দখলে নিতে। এ জন্য দরকার বাংলাদেশে বড়সরো একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতির! সেটি হলেই চীন নিজেদর লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে।

অন্যদিকে ভারত আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র হলেও স্বার্থের দিক দিয়ে তারা বরাবরই নো কম্প্রোমাইজ নীতি অনুসরণ করে চলে। এটি তাদের অকৃত্রিম দেশপ্রেমেরই অংশ। তাদের সাথে আমাদের সমস্যাটা বঙ্গপোসাগরের এলাকা কেন্দ্রিক। আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে ২৫ হাজার ৬০২ বর্গ কিলোমিটার সমুদ্র এলাকার মধ্যে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গ কিলোমিটার সমুদ্র এলাকা বাংলাদেশকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল ভারত। দীর্ঘদিন ধরে এই বিশাল এলাকার ভোগ দখল করে আসা দেশটি নিশ্চয় এ ঘটনায় আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট নয়? ফলে বিশাল সমুদ্র এলাকা হাত ছাড়া হওয়ার কারণে বাংলাদেশের প্রতি তাদের মনঃক্ষুন্ন, স্বাভাবিক। হয়তো সেই প্রতিশোধ নিতেই রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে তারা। যদি তা না হবে, তাহলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী চলমান সঙ্কট সমাধানে মিয়ানমারকে চাপপ্রয়োগ না করে পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা কেন দিলেন?
তবে সে যাহোক, এই রোহিঙ্গা ইস্যুটি যে বাংলাদেশকে বেশ ভোগাবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশ যদি এখনই কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ না করে তবে, সামনের দিনগুলি অত্যন্ত ভয়াবহ রকম হতে পারে বলেই মনে হচ্ছে। বিশেষ করে মিয়ানমারের প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যমে যে তথ্য সম্বলিত খবর প্রকাশ করেছে এতে করে এটুকু বোঝা যাচ্ছে বাংলাদেশের দিকে ভয়াবহ বিপদ ধেয়ে আসতে শুরু করেছে!
মিয়ানমারের সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনুসারে মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএস এবং পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিস ইনটেলিজেন্স (আইএসআই) রোহিঙ্গা ইস্যু সৃষ্টির নেপথ্যে। ভারত ও বাংলাদেশের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে মঙ্গলবার (৫ সেপ্টম্বর) মিয়ানমারের সংবাদ মাধ্যম মিজিমা তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করেছে, ‘রাখাইন রাজ্যের চলমান সহিংসতার জন্য দেশটির সেনাবাহিনী দায়ী নয়। এ বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড দমননিপীড়নের পেছনে হাত রয়েছে পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের সন্ত্রাসী সংগঠন আইএসের।’
মিয়ানমারের সংবাদ মাধ্যম মিজিমা যে তথ্য দিচ্ছে এতে করে অনুমান করা যাচ্ছে রোহিঙ্গা ইস্যু নয়; বাংলাদেশকে টার্গেট করে এগিয়ে আসছে পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএস!
সংবাদ মাধ্যমটি তাদের প্রতিবেদনে আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মির (আরসা) সামরিক শাখার প্রধান হাফিজ তোহারের ফোনে আসা তিনটি কলের সূত্র ধরে ভারত ও বাংলাদেশের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ২৩ ও ২৪ আগস্ট ৩৪ মিনিট, ২৮ মিনিট ও ১৪ মিনিট সময়ব্যাপী পৃথক তিনটি ফোন কলে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ওপর হামলার ব্যাপারে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিস ইনটেলিজেন্স (আইএসআই) এর কর্মকর্তা আশফাক এবং ইরাকের একজন আইএস কর্মীর সাথে হাফিজ তোহারের আলোচনা হয়। এই আলোচনার পর ২৫ আগস্ট অন্তত ২০টির ওপরে তল্লাশী চৌকিতে হামলা চালানো হয়। মূলত এই সূত্র ধরে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে অভিযান শুরু করে।
মিয়ানমারের এই সংবাদ মাধ্যমের তথ্য যদি সঠিক হয় তাহলে পাকিস্তানের সহযোগিতায় বাংলাদেশে যে আইএস ঘাঁটি করার চেষ্টা চালাচ্ছে (!) সেটি ধারণা করতেই পারি। তাই যদি হয় তবে, সিরিয়া, লিবিয়া, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাকের মত পরিস্থিতিতে আমরাও পড়তে যাচ্ছি (?) কিনা সে নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। একই সাথে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে তুরস্ক যেভাবে সোচ্চার হচ্ছে সে ব্যাপারটিও ভাবনার কারণ হয়ে ওঠছে। কেননা, আইএসকে সমর্থন দেয়ার অভিযোগের তীর দীর্ঘদিন ধরেই তুরস্কের দিকে তাক করা। সব মিলিয়ে সার্বিক পরিস্থিতি অনেকটাই ঘোলাটে। আপতঃ দৃষ্টিতে যে রোহিঙ্গা সমস্য দেখতে পাচ্ছি তা আঞ্চলিক নয়; বৈশ্বিক। এই সমস্যার শিকড় অনেক গভীরে। এ নিয়ে হালকা ভাবে ভাবলে চলবে না।
অনেকেই মানবতার দোহাই দিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে। বিপরীতি এই হত্যাযজ্ঞ, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের পুশইন বন্ধেআন্তর্জাতিক মাধ্যমগুলোর অবস্থান ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ টাইপ। আবার বাংলাদেশও কেবল আলোচনার দিকে তাকিয়ে আছে। অথচ মিয়ানমার কোনো আলোচনার যোগ্য নয়, সেটি তারা বারংবারই প্রমাণ দিয়েছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে করা ১৯৭৮ সালের চুক্তি ভঙ্গ করে। এমনকি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নিয়ে এই দেশটি ১৯৯২ সাল থেকে নানা ধরণের নাটকের আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়েছে। এরপরও রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে তাদের সাথে আলোচনা করে এর সুষ্ঠু সমাধানে যাওয়া যাবে (?) সেই ধারণা কীভাবে পোষণ করছি!
মিয়ানমারের সংবাদ মাধ্যম মিজিমা’র তথ্য ধরে যদি এগিয়ে যাই তবে, বাংলাদেশে যেসব রোহিঙ্গা প্রবেশ করছে তাদের মধ্যে বিপুল পরিমাণের আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মির (আরসা) সদস্য রয়েছে। যারা সরাসরি সম্পৃক্ত রয়েছে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিস ইনটেলিজেন্স (আইএসআই) এবং মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট’র (আইএস) সাথে। তাদের অধিকাংশই পাকিস্তানের লস্কর-ই-তৈয়বা (এলইটি) থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। মূলত এদের মাধ্যমেই বাংলাদেশে নতুন করে তারা আস্তানা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। কেননা, ইরাক ও সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট (আইএস) কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। ফলে রোহিঙ্গা ইস্যুকে তারা পুঁজি করে এ দেশে কার্যক্রম ‘চালাতে পারে।
তবে রোহিঙ্গা ইস্যুকে পুঁজি করে বাংলাদেশে আইএস’র ঘাঁটি করার ব্যাপারটি যদি অমূলকও হয়, তারপরও এখনই কঠোর হতে হবে আমাদের। এই দেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের যাতে মিয়ানমার ফিরিয়ে নেয় এবং এভাবে যেন রোহিঙ্গাদের পুশইন না করে, এর জন্য জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে বাংলাদেশকেই। প্রয়োজনে তাদের সাথে সামরিক ভাষায় কথা বলতে হবে। বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, মিয়ানমার দীর্ঘসময় ধরে একলা চলে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। একারণে আন্তর্জাতিক চাপকে তারা তেমন একটা পাত্তা দিচ্ছে না।
এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মিয়ানমারের নিজস্ব অনেক সম্পদ রয়েছে। এছাড়া চীন তাদের পক্ষে জাতিসংঘে ভেটো দেয়। যার কারণে তারা আন্তর্জাতিকগোষ্ঠীর আহ্বানকে সেভাবে পাত্তা দিচ্ছে না। বিকল্প কোনো আঞ্চলিক ও সামরিক জোট ছাড়া মিয়ানমারকে বাগে আনা যাবে না।
আমরাও মনে করি এমন একটি জোট গঠনের মাধ্যমে মিয়ানমারকে সরাসরি হুঁশিয়ারির মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করা যেতে পারে, তাহলে দেশটির সামরিক নেতারা এই ভাষা ঠিকই বুঝবে। তারা অন্যকোনো ভাষা বুঝবে না। কেননা, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে অনেক বছর ধরেই কূটনীতিকভাবে বাংলাদেশ চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে সঙ্কট সমাধান তো হয়নি বরং আরও প্রকট হয়েছে। বর্তমানে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে বাংলাদেশ যেভাবে আন্তর্জাতিক মাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালাচ্ছে সেটিও এই সঙ্কট সমাধানে যথেষ্ট বলে মনে হচ্ছে না। এর মধ্যে রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়া বিভিন্ন তৎপরতা শুরু করেছে। তবে চলমান এই সঙ্কটে বড় ঝামেলাটা বাংলাদেশকেই পোহাতে হচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশ এক বা দুই বছর ধরে ঝামেলা পোহাচ্ছে না। সেই ১৯৭৮ সাল থেকে শুরু। সেসময় বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন জিয়াউর রহমান। তার সময়ে এদেশে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা প্রবেশ করে। বর্তমানে সরকারি হিসেব অনুসারে তাদের মধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রয়েছে মাত্র সাতাশ হাজারের মতো! বাকীরা মিশে গেছে বাংলাদেশের মূল স্রোতে। কেউ আবার বাংলাদেশি পরিচয় নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছে। যাদের অনেকেই নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। যার খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।
বর্তমানে বানের জলের মতো রোহিঙ্গারা প্রবেশ করছে এ দেশে। তারা কক্সবাজার টেকনাফসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় মিশে যাচ্ছে, বসতি গড়ছে। আমরা যারা মানবতার ধোঁয়া তুলে রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দেয়ার কথা বলছি, আশ্রয় দেয়ার পক্ষে মত দিচ্ছি, তারা কী নিজেদের নিরাপত্তার কথা একবারও ভেবে দেখেছি? আমাদের মনে রাখা দরকার, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেই সঙ্কট সমাধান হবে না। বরং আমাদের নিরাপত্তা সুরক্ষায় জন্য রোহিঙ্গাদের স্রোত ঠেকাতে হবে। একইসাথে এখানে যারা আছে তাদেরও ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। মিয়ানমারকে বাধ্য করতে হবে তাদের ফিরিয়ে নিতে। এবং খেয়াল রাখতে হবে রোহিঙ্গা জোনগোষ্ঠী কোনোভাবেই যেন এ দেশের মূল স্রোতে মিশে যেতে না পারে। সেই সাথে মিয়ানমারের গণমাধ্যম মিজিমাডটকমের প্রতিবেদনটিও আমলে নেয়া অত্যন্ত জরুরি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








