মিয়ানমার এবং তাদের পরম মিত্রদের আপত্তিকে পাত্তা না দিয়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ নিয়ে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)।
নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আইসিসি’র একজন আইনজীবী জানিয়েছেন, লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে যেভাবে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে বিতাড়িত করা হয়েছে, তাতে যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রাথমিক তদন্ত হাতে নিয়েছে আদালত।
অান্তর্জাতিক মহলের ধারণা, আইসিসি’র এই সিদ্ধান্ত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর দমন অভিযানের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পথ খুলে যেতে পারে। যে দাবি দীর্ঘদিন ধরে করে যাচ্ছে নির্যাতিত রোহিঙ্গাসহ বিশ্বের বহুদেশ।
এমন দাবির মধ্যেই সম্প্রতি জাতিসংঘ একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রাখাইন রাজ্যে গণহত্যা এবং অন্যান্য অঞ্চলে মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্তের দাবি জানায়। যদিও সেই দাবি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে বর্মি সরকার বলেছে, এ ইস্যুতে আইসিসির হস্তক্ষেপ করার কোনো এখতিয়ার নেই।
আমরা জানি, গত বছরের আগস্টে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্বিচার হত্যা, গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে ছাই করে দেয়া কিংবা নারী-শিশু ধর্ষণের মতো ভয়াবহ সব ঘটনা ঘটে। এই নৃশংস নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা। তাদেরকে এখনো ফিরিয়ে নেয়ার বাস্তব কোনো পদক্ষেপ নেয়নি মিয়ানমার।
বলা যায়, গায়ের জোরেই এমন অন্যায়ের পরও মিয়ানমার উঁচু গলায় কথা বলে যাচ্ছে। দোষ দিচ্ছে চরম নির্যাতনের শিকার হওয়া রোহিঙ্গাদের উপরই। আর মিয়ানমারের সাথে তাল মিলিয়ে যাচ্ছে চীনের মতো প্রভাবশালী দেশ।
এত কিছুর পরও এই প্রথম আন্তর্জাতিক কোনো বিচারিক সংস্থা মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। এর আগে মিয়ানমারের ওপর কয়েকটি দেশের ‘সামান্য নিষেধাজ্ঞা’ ছাড়া তেমন কোনো পদক্ষেপ আমরা দেখিনি; যা দেশটিকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার মতো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে।
বাংলাদেশ এই সমস্যার শুরু থেকেই বিষয়টি শক্ত অবস্থান নিতে আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি আবেদন জানিয়ে আসছে। তবে সেই আবেদনে খুব একটা কাজ হয়নি বললেই চলে। অার কাজ হয়নি বলেই এদেশে আশ্রয় নেয়া কোনো রোহিঙ্গাকে তারা ফিরিয়ে নেয়নি। তারপরও ধৈর্য ধরে কূটনীতিক চ্যানেলে এই ইস্যু নিয়ে দেন-দরবার চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
আমরা মনে করি, আইসিসি’র এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সেই কূটনীতিক প্রচেষ্টারই ফল। এই সংস্থাটির তদন্তে রোহিঙ্গা নির্যাতনের পেছনে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ সবকিছুই উঠে আসবে বলে আমরা আশা করি। আমরা এও মনে করি যে তদন্ত প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমারের শীর্ষ সেনাকর্মকর্তাসহ দায়ী অন্যদেরকেও বিচারের মুখোমুখি করা হবে।







