নির্মম নির্যাতন আর হত্যা-ধর্ষণের হাত থেকে পালিয়ে বাংলাদেশের আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের দুরবস্থা এখন আরও প্রকট। ঋতুচক্রে বর্ষার আগমন তাদের জন্য নিয়ে এসেছে নতুন দুর্ভোগ। অস্থায়ীভাবে কোনরকমে গড়া আবাসস্থলের বাসিন্দারা প্রবল বৃষ্টি, সাইক্লোন আর বন্যার হুমকিতে ভীত। এছাড়াও খাদ্য-পানির অভাবতো রয়েছেই।
বিভিন্ন আন্তজার্তিক গোষ্ঠি রোহিঙ্গা নির্যাতনের স্বপক্ষে প্রতিবেদন তুলে ধরার পরও বরাবরই তা অস্বীকার করছে মিয়ানমার। দেশটির প্রভাবশালী নেতা নোবেলজয়ী অং সান সু কি রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরার আহ্বান জানালেও ভরসা পাচ্ছেন না এই ‘রাষ্ট্রহীন’ সম্প্রদায়। আবার শরণার্থী শিবিরের অনিশ্চিত ভবিষ্যতও তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়।
মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের এই ‘নীরব দুর্ভোগকে’ উপজীব্য করে একটি প্রতিবেদন করেছে। রেবেকা রাইটের লেখা এই প্রতিবেদনের সাথে রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রসের (আইএফআরসি) মির্ভা হেলেনিয়াসের তোলা ছবি।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ৯ অক্টোবরের মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সীমান্ত অতিক্রম করা রোহিঙ্গার সংখ্যা ৭৪ হাজার। পালিয়ে আসা অধিকাংশই মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগ করেছে।
রোহিঙ্গাদের এই দুর্দশা নতুন নয়। সাম্প্রতিক সহিংসতার আগে থেকেই দেশটিতে রোহিঙ্গাদের অবস্থা শোচনীয়। বাংলাদেশে জাতিসংঘ পরিচালিত দুইটি শরণার্থী শিবিরে নতুন ভাবে আসা রোহিঙ্গারা অস্থায়ী ঘর করে বসবাস করছে। সহিংসতা থেকে বাঁচতে আগে থেকেই এখানে লক্ষাধিক রোহিঙ্গার বাস।
দুরবস্থার চিত্র
হত্যা ও নির্যাতন থেকে পালিয়ে রোহিঙ্গারা আশ্রয় নেয় কক্সবাজারের কাঁদা-মাটির কুড়ে ঘরে। এই বর্ষায় অস্থায়ী ক্যাম্পগুলোতে গাদাগাদি করে আশ্রয় নেওয়া হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অবস্থা আরও ভয়াবহ।

আইএফআরসি’র এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের মাইগ্রেশন কোঅর্ডিনেটর এজেকিয়েল সিম্পারিংহাম বলেন, এটা একটা নীরব দুর্ভোগ, যার প্রতি যথাযথ নজর দিচ্ছে না আন্তজার্তিক সম্প্রদায়।
এমতাবস্থায় যাদের ছাদে তারপুলিন রয়েছে তাদের ভাগ্যবানই বলা যায়, বাকিরা বাঁশের কাঠামাতো কালো প্লাস্টিক টেনে দিয়েছে। শক্ত জমিতে মাদুর বিছিয়ে থাকছে তারা। সিম্পারিংহাম বলেন, এই চরম আবহাওয়া মোকাবেলার মতো মজবুত নয় তাদের আশ্রয়স্থল। শুনেছি ১৮০ জনের জন্য রয়েছে মাত্র একটি ল্যাট্রিন।
সাহায্য সংস্থাগুলো খাদ্য, তারপুলিন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্যাম্পগুলোতে সরবরাহ করছে, কিন্তু চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
অস্থায়ী আশ্রয়স্থলে দুই সন্তান নিয়ে থাকা মোহসেনা (২২) বলেন, বেঁচে থাকার জন্য নুন্যতম খাবারটুকুই শুধু পাচ্ছি। একবার খাবার পাওয়ার পর, আবার কখন পাবো জানি না। সন্ত্বানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়াই আমার প্রধান চিন্তা।

স্বামীকে হত্যার পর ছেলে (৪) এবং মেয়েকে (৩) নিয়ে ৩ মাস আগে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসেন মোহসেনা। তার ছেলেটি প্রতিবন্ধী বলে কোনও কাজ করতে পারেন না তিনি। বলেন, আমার ছেলে নিজে থেকে হাঁটতে বা বসতে বা খেতে পারে না, তাই সবসময় তার পাশে থাকতে হয়। ভিক্ষা করে আমি কিছু অর্থ পেয়েছিলাম। এই টাকা শেষ হয়ে গেলে কিভাবে বাঁচবো জানি না।
শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়া হাজার হাজার পরিবারের জীবনের গল্প এমনই, বলেন হেলেনিয়াস।
এখন আমাদের কিছুই নেই
৪ মাস আগে বালুখালি অস্থায়ী ক্যাম্পে আসেন রাবেয়া (২৫)। আক্রমণের শিকার হয়ে স্বামী-সন্তান নিয়ে পালিয়ে আসেন তিনি। নির্যাতনের সেই দুঃসহ স্মৃতির কথা উল্লেখ করে বলেন, তীব্র ব্যথায় আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আমার প্রতিবেশীরা আমাকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে টেনে জঙ্গলে নিয়ে যায়। আমার প্রচুর রক্তপাত হচ্ছিলো। পরনের কাপড় ছিলো পুরো ছেড়া।

পরবর্তীতে তার গর্ভপাত হয় বলেও জানান তিনি। তার মা ও বোনকে হত্যা করা হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন, এমনটিও জানান।
“আমাদের স্বচ্ছল এবং সুখী জীবন ছিলো। এখন আমাদের কিছুই নেই। আমাদের এখন বেঁচে থাকা নিয়েই দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। খাবারের জন্য পর্যাপ্ত অর্থও আমাদের নেই।”
বাংলাদেশে আসা শরণার্থীদের বক্তব্য সিএনএন স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি, যেহেতু রাখাইন রাজ্যে গণমাধ্যমের প্রবেশ কঠোরভাবে সংরক্ষিত। মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু কি অবশ্য বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘জাতিগত নির্মূলের’ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

আইএফআরসির আলোকচিত্রী মির্ভা হেলেনিয়াস গত সপ্তাহে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন। বেশ কয়েকটি ছবি তুলেন তিনি এবং কয়েকটি পরিবারের সাথে কথা বলেন। সিএনএন’কে তিনি জানান, “এদের পর্যাপ্ত খাবার, পানি নেই। এরা কোন প্রকার সাধারণ মানবিক অবস্থান বা সেবা ছাড়াই থাকছে।”

আইএফআরসি জানায়, ৯ অক্টোবরের আগেই রাখাইন রাজ্যের ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ মানবিক সহায়তা পেয়ে আসছিলো। এই সাহায্য সংস্থা এখন জরুরি ভিত্তিতে ৩২ লাখ ইউএস ডলার সাহায্যের আবেদন করেছে। আগামী ৯ মাসে বাংলাদেশের ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া সবচেয়ে অরক্ষিত ২৫ হাজার রোহিঙ্গাদের সাহায্যার্থে এই আবেদন।
বিশ্লেষকরা জানান, মিয়ানমারের উত্তরাংশের রাখাইন রাজ্যে ১০ লাখ মুসলিম রোহিঙ্গা বাস করে। বৌদ্ধ প্রধান দেশটিতে জাতিগত সংখ্যালঘু রোহিঙ্গারা রাষ্ট্রহীন, নির্যাতনের শিকার।

রাখাইন রাজ্যে ব্যাপক হত্যা এবং ধর্ষণের উল্লেখ করে ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। মার্চেও জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল ঘোষণা করে, মানবাধিকার লঙ্ঘণের ঘটনা অনুসন্ধানে জরুরিভিত্তিতে একটি দল মিয়ানমারে পাঠানো হবে।
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসাদের জন্য ফিরে আসা ‘নিরাপদ’ এবং ‘তাদের এখানে স্বাগত জানানো হবে’ বলে সম্প্রতি জানান অং সান সু কি। কিন্তু তার এই কথায় আশ্বাস পাচ্ছেন না পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা। বাংলাদেশে তাদের ভবিষ্যত অনিশ্চিয়তাও বেড়েই চলেছে।
“আমার পরিবারের নিরাপত্তাই আমার কাছে প্রধান”, বলেন রাবেয়া। “যদি আমার বাসায় শান্তি আসে, সেখানে যাওয়া যদি আমাদের জন্য নিরাপদ হয়, তবে আমরা ফিরে যেতে চাই। কিন্তু যদি তা না হয়, আমরা এখানেই বা কিভাবে বাঁচবো?”







