আবারো জ্বললেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। গড়লেন ইতিহাস। বায়ার্নকে কাঁদিয়ে হ্যাট্রটিক করলেন। সঙ্গে প্রথম ফুটবলার হিসেবে গড়লেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগে গোলের সেঞ্চুরি করার দুর্লভ রেকর্ড। তাতে পুড়ল বায়ার্ন মিউনিখের কপাল। সিআর সেভেনের হ্যাটট্রিকে বায়ার্নকে ৪-২ গোলে হারিয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ।
সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে মঙ্গলবার রাতের এই জয়ে ৬-৩ গোলের অগ্রগামীতায় চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালের টিকিট পেয়েছে রিয়াল। প্রথম পর্বে বায়ার্নের মাঠে ২-১ গোলে জিতেছিল জিনেদিন জিদানের দল।
জিততেই হবে। সেটি আবার কমপক্ষে ২-০ ব্যবধানে। এমন সমীকরণ মাথায় নিয়ে আক্রমণাত্নকই খেলেছে বায়ার্ন। বার্নাব্যুতে ম্যাচের ৮ মিনিটে প্রথম পাওয়া সুযোগটি পায়ে মাড়িয়েছেন অতিথি খেলোয়াড়রা। থিয়াগো আলকানতারার শট মার্সেলো কোনমতে গা দিয়ে বাঁচান। ফিরতি শটে আরিয়ান রোবেনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে বল প্রায় বার ঘেঁষে বেরিয়ে যায়।
এরপর আক্রমণে গিয়েছে স্বাগতিকরাও। ম্যাচের ২৫ মিনিটে ডি-বক্সের বাইরে থেকে দানি কারবাহালের শট অনেকটা ঝাঁপিয়ে পড়ে কর্নারের বিনিময়ে ঠেকান গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়্যার।
দুই মিনিট পর সহজ একটি সুযোগ হাতছাড়া করে স্বাগতিকরা। কর্নার থেকে উড়ে আসা বল আলাবা-হামেলসরা বিপদমুক্ত করতে ব্যর্থ হলে সেটি পেয়ে যান সার্জিও রামোস। পরে রামোসের শট গোললাইন থেকে ফেরান অতিথি ডিফেন্ডার জেরোমে বোয়াটেং।
প্রথমার্ধে রিয়ালের তৈরি আরেকটি সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করেছেন রোনালদো। ম্যাচের ৩৬ মিনিটে পাল্টা আক্রমণে টনি ক্রুজের কাছ থেকে বল পান সিআর সেভেন। প্রায় মাঝ মাঠ থেকে বল টেনে নিয়েও গোলরক্ষক নয়্যারকে বোকা বানাতে পারেননি। একাকি দাঁড়িয়ে থাকা করিম বেনজেমাকে পাস না দিয়ে পর্তুগিজ তারকা নিজেই শট নিয়ে নয়্যারের গ্লাভসে আটকা পড়েন।
বিরতির এক মিনিট আগে টনি ক্রজের দূরপাল্লার শটে নয়্যার দেয়াল হয়ে দাঁড়ালে গোল ছাড়াই প্রথমার্ধ শেষ করতে হয় দুদলকে। এইঅর্ধে লেভানডোভস্কি-রোবেনরা আধা ডজন শট নিয়েও কোনোটিই লক্ষ্যে রাখতে পারেননি।
মধ্যবিরতি থেকে ফিরেই কপাল খোলে অতিথিদের। ম্যাচের ৫৩ মিনিটে রোবেনকে বাজেভাবে ট্যাকল করে বায়ার্নকে পেনাল্টি উপহার দেন কাসেমিরো। তা থেকে রিয়ালের জালে বল জড়াতে ভুল করেননি চোটের কারণে প্রথম লেগ খেলতে না পারা রবের্তো লেভানডোভস্কি। পোলিশ স্ট্রাইকারের এবারের চ্যাম্পিয়ন্স লিগে এটি অষ্টম গোল।
ম্যাচ তখন জমে উঠেছে। দুই লেগ মিলিয়ে ২-২ গোলের সমতায়। গোল পেয়ে আরও উজ্জীবিত বায়ার্ন শিবির। এসময় ৫৫ মিনিটে ফ্রাঙ্ক রিবেরির দুর্দান্ত ভলি দক্ষতার সাথে ঠেকিয়ে রিয়ালকে বাঁচান গোলরক্ষক কেইলর নাভাস।
ম্যাচের ৫৭ মিনিটে আর্তুরো ভিদাল আরেকটি সুযোগ পেয়েছিলেন। ব্যবধান দ্বিগুণ করার সেই সুযোগটি ক্রসবারের উপর দিয়ে মাঠের বাইরে পাঠান চিলিয়ান মিডফিল্ডার। এসময় ৬৪ মিনিটে ফ্রেঞ্চম্যান বেনজেমাকে তুলে নিয়ে মার্কো আসেনসিওকে মাঠে পাঠান জিদান।
এরপরই ম্যাচের ৭৬ মিনিটে স্বাগতিকদের আনন্দে ভাসান প্রথম লেগে জোড়া গোল করা রোনালদো। কাসেমিরোর বুদ্ধিদীপ্ত ক্রসে মাথা ছুঁয়ে নয়্যারকে বোকা বানিয়ে জাল খুঁজে নেন সিআর সেভেন। এই সাফল্যে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ৯৮ গোল হয়ে যায় পর্তুগিজ অধিনায়কের।
কিন্তু আনন্দকে বিষাদে রূপান্তর করতে দেড় মিনিটও সময় নেয়নি রিয়াল। শেষ মুহূর্তে গোল করে দলকে বাঁচানোর জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠা বহু জয়ের সারথি লস ব্লাঙ্কোস অধিনায়ক সার্জিও রামোস নিজেই তখন খলনায়ক। নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝিতে নিজেরই জালে বল জড়িয়ে বায়ার্নকে সুযোগ করে দেন ম্যাচে ফেরার। দুই লেগ মিলিয়ে ৩-৩ গোলে সমতায় তখন নড়েচড়ে খেলতে শুরু করে বাভারিয়ানরা।
তবে ৮৪ মিনিটে বড় একটি ধাক্কা খায় বায়ার্ন। মার্কো আসেনসিওকে বাজেভাবে ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ডে আর্তুরো ভিদাল মাঠ ছাড়তে বাধ্য হলে দশ জনের দলে পরিণত হয় ফিলিপে লামের দল। তখনও আনচেলত্তির শিষ্যদের চেপে ধরে নির্ধারিত সময়ে আর গোল পায়নি রিয়াল। ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
অতিরিক্ত সময়ের ৮ মিনিটে গোলরক্ষককে একা পেয়েও ডগলাস কস্তা পোস্টের বাইরে দিয়ে বল পাঠান। পরের মিনিটে পাল্টা আক্রমণে আসেনসিওর নীচু শটে দেয়াল হয়ে কর্নারের বিনিময়ে ঠেকান নয়্যার।
কিছুপরেই নিজেদের জালে বল জড়ানোর প্রায়শ্চিত্ত করেন রামোস। তার পাসেই জোড়া গোল পূর্ণ করেন রোনালদো। ১০৪ মিনিটে বুক দিয়ে বল নামিয়ে নীচু হাফ-ভলিতে দর্শনীয়ভাবে জাল খুঁজে নেন রোনালদো। যদিও রিপ্লেতে দেখা গেছে পরিষ্কার অফসাইডে ছিলেন তিনি। কিন্তু বায়ার্ন খেলোয়াড়দের আবেদনে কান দেননি রেফারি।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগে গোলের শতক হতে তখন রোনালদোর চাই আর মাত্র একটি গোল। ১০৯ মিনিটে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটিও। সিআর সেভেনকে একশতম গোল করিয়ে ছাড়েন মার্সেলো। বায়ার্ন খেলোয়াড়দের বোকা বানিয়ে নিজে গোলে শট না নিয়ে রোনালদোর দিকে ঠেলে দেন এই ব্রাজিলিয়ান লেফটব্যাক। তাতে হ্যাটট্রিক পূর্ণ হয় সিআর সেভেনের।
যেটি এবারের আসরে রোনালদোর সপ্তম চ্যাম্পিয়ন্স লিগ গোল। প্রতিযোগিতাটির ইতিহাসে তার ১০০তম গোল। আর ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় ১০৩তম সাফল্য।
সেখান থেকে আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি বায়ার্ন। এই সুযোগে অতিথিদের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন বদলি খেলোয়াড় আসেনসিও। বক্সের মধ্যে থেকে নীচু শটে লক্ষ্যভেদ করেন এই স্প্যানিশ মিডফিল্ডার। খেলার তখন বাকি আর মাত্র ৮ মিনিট। রিয়ালের কাছে সেটি উল্লাসে মাতার ৮ মিনিট অপেক্ষা মাত্র। সব শেষে প্রথম দল হিসেবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্নের আরো কাছে তারা।
রাতের অন্য ম্যাচে লেস্টার সিটির মাঠে ১-১ গোলে ড্র করে সেমির টিকিট কেটেছে আরেক স্প্যানিশ জায়ান্ট অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদও। দুই লেগ মিলিয়ে অ্যাটলেটিকোর জয়টি ২-১ গোলের। মঙ্গলবার ম্যাচের ২৬ মিনিটে সাউলের গোলে এগিয়ে যায় অ্যাটলেটিকো। পরে ম্যাচের ৬১ মিনিটে সমতা ফিরিয়েছেন স্বাগতিক তারকা জেমি ভার্ডি। লাভ হয়নি আর গোলের দেখা না পাওয়ায়। এতে গত চার মৌসুমে তৃতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিতে পা রাখে ডিয়েগো সিমিওনের দল।







