গত ৬ জুলাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বলেছে জাতিসংঘের বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা-ইউনেস্কো রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অবস্থান বিষয়ে তাদের আপত্তি প্রত্যাহার করেছে। কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎপ্রকল্পে ব্যবহৃত হবে আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি এবং খুবই উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে স্বল্প মাত্রায় কার্বন নি:সরণের জন্য।
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সুন্দরবনের মূল অংশ থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। অার ইউনেস্কো ঘোষিত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে রামপাল।
পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘ ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটি সুন্দরবনের প্রান্তসীমায় রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে তাদের আগের আপত্তি তুলে নিয়েছে। সেই সঙ্গে সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের (ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ) মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা প্রাকৃতিক নিদর্শনগুলোর তালিকায় যুক্ত করার পদক্ষেপ থেকেও ইউনেস্কো সরে এসেছে। গত সপ্তাহের বুধবার পোল্যান্ডে চলমান ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির ৪১তম অধিবেশনে সুন্দরবনের পাশে নির্মাণাধীন রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে শুনানির পর ওই ঘোষণা আসে। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় কোন কোন প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন থাকবে, কোনটি বাদ যাবে এবং কোন নিদর্শন ঝুঁকিতে রয়েছে- সেসব বিষয়ে ২১ সদস্যের এই হেরিটেজ কমিটিই সিদ্ধান্ত নেয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জ্বালানী উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহি চৌধুরির নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল ইউনেস্কোর ওই অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তারা রামপাল বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন।’
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটি বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ প্রকল্প। বিপিডিবি বাংলাদেশ এবং এনটিপিসি ইন্ডিয়া এই দুই কোম্পানীর ৫০ শতাংশ করে সমান মালিকানা থাকবে বাংলাদেশ ভারত মৈত্রী কয়লা বিদ্যুৎ কোম্পানীতে। বাংলাদেশ সরকার বাগেরহাটের রামপালে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জায়গা নির্ধারণ করেছে যেটা সুন্দরবনের পেরিফেরি বা মূল অংশ থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে। বাংলাদেশের পরিবেশ আইনে ১০ কিলোমিটার এলকার মধ্যে এমন কোন স্থাপনা বসানো নিষেধ রয়েছে। রামপালের বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐহিত্যের যে অংশ সুন্দরবনের মধ্যে অবস্থিত তা থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। 
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য যে জায়গা নির্বাচন করা হয়েছে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে পতিত, অনুর্বর এবং মূলত চিংড়ি চাষের জন্য ব্যবহৃত হতো। খুব অল্প পরিমাণে জমির মালিক ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং যে পরিমাণ মানুষকে পুর্নবাসন করতে হবে তার পরিমাণও খুব কম। প্রকল্পটি পশুর নদীর তীরে অবস্থিত হওয়াতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা। কৃষি জমির ক্ষতি না করে, অধিক মানুষের পুর্নবাসন করা লাগবে না। তদুপরি নদীর ধারে প্রকল্পটির অবস্থান হওয়াতে প্রকৌশল দৃষ্টিভঙ্গিতে সবচেয়ে উত্তম জায়গাতেই এই কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ হচ্ছে। রামপালকে আর একটা কারণে নির্বাচন করা হয়েছে যে পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ শেষ হলে এবং মংলা পোর্টকে কেন্দ্র করে ওই অঞ্চলে বিশেষ রপ্তানী প্রক্রিয়া অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা হবে যাতে করে বিপুল পরিমাণ মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়।
রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নকশার সময় থেকেই উচ্চ তাপ নিয়ন্ত্রণকে মাথায় রাখা হয়েছে। স্বল্প মাত্রার সালফার এবং কয়লার ছাই ব্যবহার করা হবে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে। যে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে তাতে কয়লা থেকে ৯৮ শতাংশ সালফার শোষণ করবে। একইভাবে, ইলেকট্রনিক প্রিসিপাইটরি পারদ এবং কয়লার ছাইকে সরিয়ে ফেলবে। পানির তাপমাত্রা কমানোর জন্য অত্যাধুনিক কুলিং টাওয়ারের মাধ্যমে কোল্ড ওয়াটার রিসাইকেল সিস্টেম ব্যবহার করা হবে। অর্থাৎ একই পানি ঠান্ডা করে পুনরায় বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার করা হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে গরম পানি কোনভাবেই পশুর নদীতে ফেলা হবে না। রামপাল থেকে পশুর নদীতে যে পরিমাণ পানি যাবে তার পরিমাণ শূন্য দশমিক শূন্য ৫ ভাগ।
রামপালে যে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে তার জন্য কার্বন নি:স্বরণ কম হবে এবং পরিবেশের উপর কোন ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে না। বিদ্যুৎকেন্দ্রের ধোঁয়া বের করার জন্য ২৭৫ মিটার উঁচু চিমনি থাকবে যাতে করে পরিবেশ ও প্রতিবেশের উপর কোন প্রভাব না পড়ে। রামপাল থেকে সুন্দরবনের দিকে বাতাসও কম থাকে, বছরের সর্বোচ্চ ৯০-১০০ দিনের মত বাতাস সেই দিকে প্রবাহিত হয়।
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য অস্ট্রেলিয়া অথবা ইন্দোনেশিয়া থেকে খুবই উন্নতমানের কয়লা আমদানি করা হবে। প্যানামেক্স জাহাজে করে (যার প্রতিটির ধারন ক্ষমতা ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ টন ) কয়লা পরিবহন করা হবে। জাহাজগুলো বিশেষভাবে ঢাকা থাকবে যাতে করে কয়লার ছাই বাইরে না আসে। সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত পশুর নদী দিয়ে মাত্র এ রকম দুইটি জাহাজে করে কয়লা নেয়া হবে রামপালে। যদিও প্রতিদিন কমপক্ষে ২০০ জাহাজ চলে সেই জলপথ দিয়ে। তার পরেও শব্দহীন এই দুটি জাহাজ হয়তো কোন বড় কোন ইস্যু না। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র তিন মাসের কয়লা সংরক্ষণ করে রাখতে পারবে।
রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশেই দুই শতাধিক অভিজ্ঞ প্রকৌশলী থাকবেন সব সময়। অভিজ্ঞ প্রকৌশলীরা যদি কোন আপত্তি না করেন তবে কেন এই বিষয়ে যারা বিশেষজ্ঞ নন তারা বার বার আপত্তি তুলছেন তা বোধগম্য নয়। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সুন্দরবন থেকে যথেষ্ট নিরাপদ দূরত্বেই অবস্থান করছে। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো যে দেশের গণমাধ্যমে জ্বালানী বিশেষজ্ঞ হিসেবে তাদেরকেই বিবেচনা করা হয় যাদের এই বিষয়ে নূন্যতম কোন ধারণাই নেই।
রামপাল নিয়ে শিক্ষাবিদ, সুশীল সমাজ এবং জ্বালানী বিশেষজ্ঞ নয় এমন ব্যক্তিদের আপত্তির জবাবে অনেকবার বিশেষজ্ঞদের দিয়ে তাদের আপত্তির সঠিক সদুত্তর দেয়া হয়েছে। রামপাল বিরোধীরা আন্তর্জাতিক কয়লা বিদ্যুৎ বিরোধী এনজিও’র অর্থায়নে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং দেশের মূল ধারার গণমাধ্যমে অপপ্রচার চালাচ্ছে। ইউনেস্কোও তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়েছিল। ২০১৬ সালের প্রথম দিকে ইউনেস্কো থেকে একটি পর্যবেক্ষক দল আসে যারা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে সুন্দরবনের জন্য তাদের উদ্বেগ জানিয়েছিল। দু:খজনক হলেও সত্যি যে ওই পর্যবেক্ষক দলের প্রতিবেদন প্রকাশ না হলেও বিদ্যুৎ, বন্দর রক্ষার জাতীয় কমিটি নিজেদের মত করে সুন্দরবন ইস্যুতে তাদের নিজস্ব ভাষ্য প্রচার করতে শুরু করে সরকারের কোন কথা না শুনেই। ইউনেস্কোর পর্যবেক্ষণও এখন পাওয়া গেল।
ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির ৪১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সুন্দরবন ও প্রাকৃতিক বিশ্ব ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য কি ধরণের সুরক্ষা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় কোন কোন প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন থাকবে, কোনটি বাদ যাবে এবং কোন নিদর্শন ঝুঁকিতে রয়েছে – সেসব বিষয়ে ২১ সদস্যের এই হেরিটেজ কমিটিই সিদ্ধান্ত নেয়।
দীর্ঘ বিতর্কের পর ইউনেস্কোর হেরিটেজ কমিটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে। সুন্দরবনের ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ প্রোপার্টি সংরক্ষণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশ কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের স্বাগত জানিয়েছে ওই কমিটি। হেরিটেজ কমিটির অনুরোধে বাংলাদেশ সুন্দরবনসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের একটি কৌশলগত পরিবেশগত মূল্যায়ন (এসইএ) গ্রহণের জন্য সম্মত হয়েছে।
ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির অধিবেশন শেষে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কমিটির সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। দুর্ভাগ্যবশত ১৯ মে ২০১৭ তারিখে সভার কার্যবিবরণীর উদ্ধৃতি দিয়ে কিছু গণমাধ্যমে এখনও মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফ্রান্সের প্যারিসে গত ১৯ মের আলোচনার সিদ্ধান্ত কোন মতেই ৪ জুলাইয়ের বৈঠকের সিদ্ধান্ত বলে বিবেচিত হতে পারে না। মিথ্যা তথ্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার কোন কারণ আছে বলে আমার মনে হয় না।
ভারতের এক্সিম ব্যাংক ঋণ ছাড়ের পর রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ খুব সুন্দরভাবে এগিয়ে চলেছে। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান আগামী ৪৮ মাসের মধ্যে কাজ শেষ করবে এবং ২০২১ সালের কোন এক সময়ে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। 
যারা মনে করে কয়লাভিত্তিক জ্বালানীর দিন শেষ তাদের উদ্দেশ্য বলছি সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার সরকার কর্তৃক বিশেষজ্ঞ কমিটির এক গবেষণা পরিচালিত হয়েছে যে আধুনিক কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নবায়নযোগ্য শক্তি যেমন- সৌর শক্তি বা বায়ু শিক্তর থেকেও কম খরচে উৎপাদন করা যায়। অস্ট্রেলিয়া সরকার পুরাতন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলি সংস্কারের মাধ্যমে নতুন ধরনের এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দিকে যাচ্ছে। সামনের দিনেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিই প্রধান ভরসা হয়ে থাকবে।
আমরা সর্বদা আস্থাশীল যে, ইউনেস্কো বা কোনও আন্তর্জাতিক সংস্থা সরকারি প্রতিনিধির কাছ থেকে সমস্ত তথ্য ও নথিপত্র পেলে তারাও রামপাল নিয়ে তাদের অবস্থান পরিস্কার করতে পারবে। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে, সরেজমিনে পরিদর্শন করে যা জানা গেছে পরিকল্পিত নকশা এবং অবকাঠামোর কারণে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের কোন ক্ষতি হবে না। আমরা আশা করি তাত্ত্বিক ও আন্দোলনকারীরা অগ্রাধিকার ভিত্তিক জাতীয় এই প্রকল্প সম্পর্কে আরও বিতর্ক তৈরি থেকে বিরত থাকবেন।
এ সময়ে আমরা আশা করবো বিশেষজ্ঞদের দ্বারা তৈরী একটি কমিটি দিয়ে সরকার সব সময় পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি তদারকি করবে। এই প্রকল্পে বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞের পাশাপাশি ভারতীয় বিশেষজ্ঞদেরকেও দরকার হবে। যদিও এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র ব্যবহার করে আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের তেমন কোন দক্ষতা নেই।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







