প্রাথমিক ও জুনিয়রে মেধাবৃত্তিসহ গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার একটি স্কুল থেকে মাধ্যমিকে সবগুলো বিষয়ে জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন মো: সাজাহান। আত্মীয় স্বজন, শিক্ষক সবার ইচ্ছা সে ঢাকায় পড়ে নিজেকে আরও যোগ্য করে করে তুলবে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা সঙ্গতিপূর্ণ না হওয়ার পরেও সবার ইচ্ছায় সে ঢাকার নামী কলেজগুলোতে আবেদন করে। ভর্তির সুযোগ পান সরকারি বিজ্ঞান কলেজে।
কিন্তু ক্লাস শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই সাজাহান বুঝতে পারে এ পরিবেশের সঙ্গে সে মানিয়ে উঠতে পারছে না। পড়াশুনাও হচ্ছে না ঠিকমত। সম্পূর্ণ গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা সাজাহানের কাছে নতুন শহরে নিজেকে অচেনা মনে হয়। সহপাঠিদের সঙ্গেও খুব একটা হৃদ্যতা গড়ে ওঠে না।
অবশেষে সে সিদ্ধান্ত নেয় গ্রামেই ফিরে যাবে। বিজ্ঞান কলেজ থেকে টিসি নিয়ে সে ভর্তি হয় তার বাড়ির অদুরে ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানা সদরের কেএম কলেজে। সেখান থেকে সে জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার পর এখন ঢাকার একটি বেসরকারি মেডিকেলে পড়াশুনা করছেন।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সাজাহান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, হঠাৎ নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছিল। তাই গ্রামে ফিরে যাই। সেখানে নিজের মত করে পড়াশুনা করে ভালো ফল করে আবার ঢাকায় ফিরে আসি।
‘ওই দুই বছর (উচ্চ মাধ্যমিকের) পড়াশুনার পাশাপাশি নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার সক্ষমতাও গড়ে তুলি নিজের ভেতরে। এখন আর কোন সমস্যা হয় না।’
সাজাহানের মত এরকম অনেকেই মাধ্যমিক পাশের পর তীব্র প্রতিযোগিতায় হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে পেছনে ফেলে ভর্তির সুযোগ পান ঢাকার কোন কলেজে। কিন্তু থাকা খাওয়ার সমস্যা, একাকীত্ব এবং নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে না পারাসহ নানা সমস্যার কারণে তারা নিজ এলাকার কোন কলেজে ভর্তি হন।
বিজ্ঞান কলেজের ২০০৮-৯ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়া খালিদ হাসান খোকন, মো: হাসান আলী এবং আশরাফুল ইসলাম রাজু নামের তিনজনের সঙ্গে চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে কথা হয় । যারা এখান থেকে টিসি নিয়ে আবার নিজ এলাকার কোন কলেজে ভর্তি হয়েছেন। এ তিন শিক্ষার্থী নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে না পেরে নিজ এলাকায় টাঙ্গাইলের মধুপুর শহীদ স্মৃতি কলেজে গিয়ে ভর্তি হন।
প্রায় একইরকম অবস্থা সাভার ক্যান্টনমেন্ট পাবলিকে ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি ফরিদপুরের আশিক আবদুল্লাহ অপুর। নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে না নিতে পারায় এখান থেকে টিসি নিয়ে সে ভর্তি হয় ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজে। সেখান থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে ভালো ফল করার পর এখন সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করছে।
ঢাকার নামী কলেজগুলোর বেশিরভাগেরই রয়েছে স্কুল শাখা। কলেজে বাইরের কিছু শিক্ষার্থী ভর্তি করা হলে নিজস্ব শিক্ষার্থীরা তাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বহিরাগত বিবেচনা করে তাদের সঙ্গে মিশতে চায় না। যার ফলে অনেক সময় গ্রাম, মফস্বল বা জেলা শহর থেকে আসা শিক্ষার্থীরা অনেক সময় হীনমন্যতায় ভোগে।
২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের ভর্তি হন মীর রায়হান মাসুদ। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত এ শিক্ষার্থী নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, কলেজে অনেকে আমার সঙ্গে কথা বলতো না ঢাকার বাইরে থেকে এসেছি বলে। তবে বিষয়টিকে খুব একটা পাত্তা না দিয়ে নিজের মত এগিয়ে গেছি।

এ ব্যাপারে কথা হয় দেশের শীর্ষস্থানীয় সরকারি ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন মোল্লাহর সঙ্গে।
চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন, রাজধানীতে না আসলে যে ভালো শিক্ষা পাওয়া যাবে না অভিভাবকদের এ ধারণা ঠিক নয়। কারণ জেলা শহরগুলোতেও অনেক ভালো কলেজ রয়েছে। যেমন ধরেন, সরকারি কলেজগুলোর প্রতিটিতেই মানসম্মত শিক্ষক রয়েছেন, কেননা তারা সবাই বিসিএস’র মাধ্যমেই নিয়োগ পান।
‘তবে ঢাকা কলেজ, নটরডেম কলেজসহ ভালো মানের কলেজগুলোতে যদি কেউ ভর্তির সুযোগ পায় তবে ভালো কথা। কিন্তু ঢাকার মানহীন কলেজে পড়ার চেয়ে জেলা শহরের মানসম্পন্ন কলেজে পড়া অনেক ভালো বলে আমি মনে করি।’
তাই ঢাকার যেকোন কলেজে পড়ানোর চেয়ে অভিভাবকদের নিজ এলাকার ভালো কলেজগুলোতে সন্তানদের ভর্তির চেষ্টা করা বেশি ভালো মনে করেন এ অধ্যক্ষ।
মাধ্যমিক পাশ করেই ঢাকার কোন কলেজে ভর্তি হওয়া উচিত কি না এ নিয়ে ভিন্ন মত রয়েছে অভিভাবকদের। তাদের সঙ্গে কথা বললে দুই ধরনের যুক্তিই উঠে আসে।
একপক্ষ মনে করেন এসএসসি পাশ করা ছেলেমেয়েদের সম্পুর্ণ ভিন্ন একটি পরিবেশে গিয়ে মানিয়ে চলার মানসিকতা ১৫-১৬ বছর বয়সে গড়ে ওঠে না। তাই এই সময়ই তাকে ভিন্ন পরিবেশে না পাঠিয়ে এলাকার মানসম্পন্ন কোন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা উচিত। এ সময়টাতে সে মানসিকভাবে পরিপক্ক হবে এবং নতুন পরিবেশে মানিয়ে চলার সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে।
অন্য পক্ষের দাবি, উচ্চ শিক্ষার জন্য যেহেতু ঢাকায় যাওয়া ছাড়া উপায় নেই, তাই একটু কষ্ট হলেও আগেভাগে মানিয়ে নিতে পারলে পরে সে অনেকটা এগিয়ে থাকতে পারে।







