‘১৯৭১ সালে এদেশের মাটি স্বাধীনতা লাভ করেছে। কিন্তু দেশের মানুষের মুক্তি আসেনি। মানুষের মুক্তি না এলে সেই স্বাধীনতার কোন ভিত্তি নেই। লেখাপড়া শিখে অনেকে বিদেশে চলে যায়। ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য দেশকে বঞ্চিত করা উচিৎ নয়। যে মাটিতে জন্ম, সেই মাটি আর মানুষের উন্নতির জন্য কাজ করতে হবে। তরুণরা দেশপ্রেমে জাগ্রত হতে হবে।’- এই কথাগুলো ‘একাত্তরের জননী’ খ্যাত বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরীর। যিনি আজ সবাইকে ছেড়ে বিদায় নিয়েছেন পৃথিবী থেকে।
চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন রমা চৌধুরী। দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম নারী স্নাতকোত্তর (এমএ) নারী হিসেবে তাকে ধরা হয়ে থাকে। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। এরপরে কক্সবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে পূর্ণাঙ্গ কর্মজীবন শুরু, দীর্ঘ ১৬ বছর তিনি বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময়ে রমা চৌধুরী মুখোমুখি হন জীবনের সময়ের। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর দ্বারা সম্ভ্রম হারানোর সঙ্গে সঙ্গে ভিটেমাটি ও নিজের সাহিত্যকর্ম চোখের সামনে আগুনে পুড়ে যেতে দেখেন তিনি। সব হারিয়ে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়েই কোলের সন্তানদের নিয়ে শুরু হয় সংগ্রাম। কিন্তু চূড়ান্ত বিজয়ের আগে এক সন্তান আর বিজয়ের কিছুদিন পরে আরেক সন্তান অনাদর, অবহেলা ও চিকিৎসার অভাবে মারা যায়। পরে সংসার জীবনে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় আরেক সন্তানও দুঘর্টনায় মারা যায়। তিন সন্তানকেই তিনি মাটিতে সমাহিত করেছেন। যে মাটিতে সন্তানরা শুয়ে আছে সেখানে জুতা পরেন কীভাবে, এই বোধ থেকে জুতো ছাড়াই পথ চলেছেন রমা চৌধুরী।
কর্মজীবনে রমা চৌধুরী ছিলেন স্বনির্ভরচেতা। নিজেদের কাজ করতে হবে, সাহায্যের উপরে নির্ভর করা যাবে না, এরকম শিক্ষা তিনি দিয়ে গেছেন শিক্ষার্থীসহ পরিচিতজনদের। যা তিনি সবাইকে বলেছেন, তা তিনি নিজ ব্যক্তিজীবনেও অনুসরণ করে গেছেন কঠোর আদর্শের সঙ্গে। জীবন সংগ্রামে তিনি নিজের উপার্জন ছাড়া অন্য কারো অর্থ সহায়তা নেয়া থেকে বিরত ছিলেন সচেতনভাবে। রমা চৌধুরী স্বপ্ন দেখতেন, সবাই বিলাসিতা ত্যাগ করে এক স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তুলবে।
রমা চৌধুরী শুধু একজন মানুষের নাম না, নিঃসন্দেহে তিনি বীরত্বপূর্ণ এক জীবন সংগ্রামের নাম। মুক্তিযুদ্ধের আগেপরের প্রেক্ষাপট তার জীবনকে এক অন্যরকম মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। সংসার, সন্তান, সম্ভ্রম হারিয়েও তিনি প্রবল আত্মসম্মান নিয়ে মাথা উঁচু করে সমাজে দাঁড়িয়েছিলেন। লড়াই করে গেছেন সময়ের সাথে। বর্তমান সময়ের মানুষের কাছে তার সংগ্রাম কতটা বোধগম্য হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থাকলেও এই বীর নারী এক আদর্শ হয়ে থাকবেন সবার সামনে। মুক্তিযুদ্ধ ও জীবনযুদ্ধে হার না মানা এই নারীর চেতনা ও আদর্শে স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে উঠুক, এই আমাদের প্রত্যাশা।







