‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন প্রকৃত অর্থেই মানব জীবনকে অতিক্রম করে যাওয়া একজন বড়ো মাপের পণ্ডিত ব্যক্তি’, কানাডায় ভ্যানক্যুভার ট্যাগোর সোসাইটি এবং সেন্টার ফর ইন্ডিয়া এন্ড সাউথ এশিয় রিসার্চ (সিআইএসএআর) এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘এনাদার ট্যাগোর: এ ক্যাম্পেইনার অফ ইমানসিপেশান অফ পিজ্যান্ট্রি ইন বেঙ্গল’ শীর্ষক সেমিনারে একথা বলেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান।
শনিবার কানাডার ভ্যানক্যুভারে ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিটিশ কলাম্বিয়া (ইউবিসি) তে ইনস্টিটিউট অফ এশিয়া রিসার্চ (আইএআর) এর সিএচই ভবনে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সিআইএসএআর এর পরিচালক অধ্যাপক মন্দাক্রান্তা বোস।
বক্তব্যে ড. আতিউর রহমান সমাজ সংস্কারক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা এবং গ্রাম বাংলার কৃষকের মুক্তির জন্য রবীন্দ্রনাথের ভাবনার দিকগুলো বিশেষভাবে তুলে ধরেন।তিনি বলেন, শিল্প-সাহিত্যে তাঁর সৃষ্টিশীল অবদান তাঁকে দিয়েছিল নোবেল পুরস্কারের স্বীকৃতি। এর পাশাপাশি পূর্ব বঙ্গে নিজ পরিবারের জমিদারি তদারকির সময় তাঁর কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে যে একজন মানবিক জমিদার হিসেবেও তিনি ছিলেন অতুলনীয়।
তিনি আরও বলেন, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অত্যন্ত প্রজাদরদী এবং প্রজাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি তাদের আর্থ-সামাজিক মুক্তি নিশ্চিত করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। কৃষকদের মুক্তির প্রশ্নে তাঁর দর্শন ছিলো- কৃষকের আত্ম-উন্নয়নের জন্য কৃষককেই ক্ষমতায়িত করা। কৃষক মুক্তির জন্য তাঁর উদ্যোগের মূল স্তম্ভগুলো ছিলো কৃষকদের তাদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলা, কৃষি খাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও অর্থায়ন, কৃষকদের দলগতভাবে বা সমবায়ের মাধ্যমে কাজ করতে উৎসাহিত করা, কৃষকদের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো সামাজিক সেবা নিশ্চিত করা, এবং লোক শিল্প ও সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে কৃষক সমাজের ভেতরের শক্তিকে জাগ্রত করা। গ্রামীন মানুষকে অবশ্যই মুক্তির জন্য আত্মনির্ভর হতে হবে তাকে সহায়তা করাই তাঁর অন্যতম কাজ। তাঁর জমিদারী এলাকায় তিনি সেই উদ্দেশ্যে ম-লী প্রথা চালু করেছিলেন এবং খাজনা থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি অংশ তিনি কৃষক পরিবারগুলোর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদির জন্য ব্যয় করতেন।
আধুনিক কৃষিতে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রজারাও এই তহবিলে অর্থ প্রদান করতেন। নিজ এলাকায় আধুনিক কৃষির প্রসার ঘটানোর লক্ষ্যে তিনি নিজের ছেলে এবং মেয়ে জামাইকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক কৃষি পদ্ধতি বিষয়ে পড়ালেখা করতে পাঠিয়েছিলেন। কৃষকরা যেন সহজেই আধুুনিক কৃষির সুফল ভোগ করতে পারে সে জন্য তিনি সমবায় সমিতি গড়ে তুলেছিলেন এবং এর আওতায় তাদের অকৃষি আয়ের উদ্যোগও উৎসাহিত করেছিলেন। কৃষকদের ঋণগ্রস্ততার দুষ্টচক্র থেকে মুক্তি দিতে তিনি পতিসর এবং শ্রীনিকেতনে গ্রামীন সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
পল্লী উন্নয়নে কবির অবদান সর্ম্পকে তিনি বলেন, গ্রাম পুনর্গঠন ছিলো তার চূড়ান্ত লক্ষ্য। আর এ লক্ষ্যে তিনি গ্রামবাসীদের সমবায় ভিত্তিতে কাজ করতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন পল্লীর মানুষের স্বশাসনের মাধ্যমেই প্রকৃত পল্লী উন্নয়ন সম্ভব। তার এসব স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক ছিলো গ্রামের মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব। তাই তিনি সবসময় বিভিন্ন উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে গ্রামীণ শিল্প-সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করতে চেয়েছেন, যাতে করে গ্রামবাসীরা নিজেরা নিজেদের ভেতরের শক্তিটুকু অনুভব করতে সক্ষম হয়।
‘নিজ দেশ, নিজস্ব মানবতা, নিজের সৃষ্টিকর্তা’র জন্য রবীন্দ্রনাথ ‘নিজেকে নিজের চেয়ে বড় কিছুর জন্য উৎসর্গ করায়’ বিশ্বাস করতেন। সমকালীন বিশ্ব তাঁর এই গভীরতম আর্থসামাজিক ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে টেকসই উন্নয়নের পথকে প্রশস্ত করতে পারে।
সেমিনারে বিপুল পরিমাণ দর্শক-শ্রোতা উপস্থিত হয়েছিলেন এবং আগ্রহ নিয়ে আলোচনা শোনেন। মূল নিবন্ধ উপস্থাপিত হওয়ার পর ছিলো প্রশ্নোত্তর পর্ব এবং সব শেষে ভ্যানক্যুভার ট্যাগোর সোসাইটির পক্ষ থেকে সঙ্গিত পরিবেশন করেন অর্ণ ও শঙ্খ।







