চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত ছাত্রনেতা। তার বিরুদ্ধে অপকর্মের ফিরিস্তি বিস্তর লম্বা। আবার তার পক্ষে বলার যুক্তিরও কমতি নেই। রনিকে আপনি ঘৃণা করতে পারেন, রনিকে আপনি ভালোবাসতে পারবেন; কিন্তু তাকে উপেক্ষা করা কঠিন।
এক কোচিং সেন্টারের মালিককে ১৩টি থাপ্পর মারার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর দল থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। একই সময়ে দলও তাকে বহিস্কার করে। এর আগে চট্টগ্রাম বিজ্ঞান কলেজের অধ্যক্ষকে চর-থাপ্পর মারার ভিডিও ভাইরাল হয়। এর আগে এক নির্বাচনী কেন্দ্রের কাছ থেকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়ে ৫৮ দিন জেল খেটেছেন। বিজ্ঞান কলেজের অধ্যক্ষের দায়ের করা মামলায় রনি হাইকোর্ট থেকে চার সপ্তাহের আগাম জামিন পেয়েছিলেন। হাইকোর্টের নির্দেশ মেনে চার সপ্তাহ পর চট্টগ্রামের আদালতে হাজির হলে আদালত তার জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
রনি কারাগারে যাওয়ার পর থেকে তার অনুসারীরা তার মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন, মিছিল-সমাবেশ করছে। এর আগে মামলা দায়েরের পরও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রনির পক্ষে রাস্তায় নেমেছিল। আপনি যত ভালোই বাসুন, সুনির্দিষ্ট মামলায় কারাগারে যাওয়া কারো নিঃশর্ত মুক্তি চাইতে পারেন না। ব্যক্তি যেই হোক, যে দলই করুক; আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। আরো অনেকের মতো আমিও রনিকে পছন্দ করি। চাই সব ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে রনি আবার রাজনীতিতে ফিরে আসুক। কিন্তু আমি কোনোভাবেই রনির নিঃশর্ত মুক্তি চাই না। আমি চাই তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো আদালতে নিষ্পত্তি হোক। চাই আদালত নির্ধারিত সাজা ভোগ করেই রনি পরিচ্ছন্ন হয়ে রাজনীতিতে ফিরে আসুক।
সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্র রাজনীতিকেই লক্ষভ্রষ্ট মনে হচ্ছিল। বিরোধী সংগঠনগুলো নিষ্ক্রিয়। সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ব্যস্ত মূল দলের লেজুরবৃত্তি আর টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজিতে। তখন নুরুল আজিম রনি আসেন উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হয়ে। দল ক্ষমতায় থাকলেও যে ছাত্রনেতারা ছাত্রদের পাশে দাঁড়াতে পারেন, রনিকে না দেখলে; সেটা বিশ্বাস করাই কঠিন। চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকার নির্ধারিত ফি’র অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের হৃদয়ে ঠাঁই করে নেন রনি। শিক্ষার্থীদের জন্য বাসে হাফ ভাড়া আদায়ে আন্দোলন করেছেন রনি। চট্টগ্রামের অন্তত দুটি কলেজকে শিবিরের দখলমুক্ত করে ২৮ বছর পর সেখানে বঙ্গবন্ধুর ছবি ঝুলিয়েছেন। খেলার মাঠ রক্ষার আন্দোলনেও সামনের কাতারেই রনি।
এইসব শিক্ষার্থীবান্ধব আন্দোলনের কারণেই রনি চট্টগ্রামের ছাত্র আন্দোলনে জনপ্রিয়তায় নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। কিন্তু যত ভালো কাজই করুন, আর যত জনপ্রিয়ই হোন; আইন হাতে তুলে নেয়ার অধিকার কারো নেই। তাই চট্টগ্রাম বিজ্ঞান কলেজের অধ্যক্ষ এবং একটি কোচিং সেন্টারের মালিককে থাপ্পর মারার অপরাধে অবশ্যই তার বিচার হতে হবে।
তবে মজাটা হলো, রনি করেছেন এক অপরাধ, আর মামলা হয়েছে অন্য অপরাধে। ছাত্রদের কাছ থেকে বাড়তি ফি আদায় করায় বিজ্ঞান কলেজের অধ্যক্ষ মার খেয়েছেন। আর পাওনা টাকা না দেয়ায় মার খেয়েছেন কোচিং সেন্টারের মালিক। কিন্তু দুজনই রনির বিরুদ্ধে করেছেন চাঁদাবাজির মামলা। প্রচলিত আইন ও বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা আছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ায় অবশ্যই রনির বিচার চাই। কিন্তু যারা তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মিথ্যা মামলা করেছে, তাদেরও বিচার চাই।
আইনের প্রতি, বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা আছে। কিন্তু চট্টগ্রামে একই সময়ে দুটি ঘটনায় কিছু প্রশ্নও উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হুমকি দেয়ার অভিযোগে মামলা হয়েছিল গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে। তিনি স্বাধীনতা বিরোধী পরিবারের সদস্য। তার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী একাত্তরে স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তার ভাই সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী এখন যেখানে থাকেন, চট্টগ্রামের গুডস হিলের সেই বাসা একাত্তরে ছিল টর্চার সেল।
সেই গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী জামিন পেয়েছেন। আর উচ্চ আদালতের নির্দেশ মেনে আদালতে হাজির হওয়া স্বাধীনতার পক্ষের সৈনিক নুরুল আজিম রনির জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তারপরও আইনের নিজস্ব গতির প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







