২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ১১ মার্চ। বিশ দিন। এই বিশ দিন সাহিত্যে স্বাধীনতা পুরস্কার অর্জনের গৌরব ধারণ করেছিলেন এস এম রইজউদ্দিন। ১১ মার্চ থেকে সেটি আর তার নেই। তার কাছে স্বাধীনতা পুরস্কার বিশ দিনের অদ্ভুত এক স্বপ্নের মতো। আমাদের দেশের মানুষ অনেক বেশি সংবেদনশীল। তাই রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পুরস্কারের মেডেল, সার্টিফিকেট আনুষ্ঠানিক হাতে পাওয়ার আগে এভাবে পুরস্কারটি বাতিলের সরকারি ঘোষণা অনেকেরই মনের গহীন কোণে চিনচিনে এক কষ্টের অবতারণা করেছে। অনেকেই দাবি করেছেন, পুরস্কারটি কীভাবে কোন প্রক্রিয়ায় ঘোষিত হলো তা যথাদ্রুতসম্ভব বের করা হোক। কেউ কেউ আবিস্কার করার চেষ্টা করেছেন বীর মুুক্তিযোদ্ধা এস এম রইজ উদ্দিন আহমেদ একজন সরলপ্রাণ মানুষ। তিনি চাইলেই এত বড় পুরস্কার বাগিয়ে নিতে পারেন না। একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে তার নাম-বিবরণ সর্বোচ্চ জুরিবোর্ডে পাস হতে হয়েছে। বিষয় যাই থাক বেরিয়ে আসবে। তখন হয়তো, এ খাতের ভূতটি আবিস্কার করা যাবে।
শুনেছি পৃথিবীতে কোনোকিছুই আত্মোপলব্ধি ছাড়া কিছু নয়। ধরা যাক আমার এক কোটি টাকা আছে। আমি তো এই টাকার বোঝার নীচে শুয়ে থাকতে পারবো না। এই টাকা সব সময় বহনও করতে পারবো না। টাকাটি থাকবে ব্যাংকে। আমার শুধু জানা থাকবে, আমার এত টাকা আছে। এই তৃপ্তি আর নিজের মতো করে তা খরচ করার শান্তি নিয়ে আরো টাকার মালিক হবার বাসনা পুষে বেড়াবো। এই তো। আবার ধরা যাক, আমার বাসাটি ভাড়া বাসা নয়। এটি টাকা দিয়ে কেনা। তাহলে তো সারাদিন বাসার ছাদে বসে পা দোলাতে পারবো না। আমার সব যন্ত্রণাপঞ্জি যথারীতি আমার ভেতর সুর তুলবে। আমি আমার মতোই থাকবো। শুধু মাঝে মাঝে মনে হবে আমার একটি বাড়ি আছে। এস এম রইজউদ্দিনের বিশ দিনের সর্বোচ্চ পুরস্কার প্রাপ্তির আত্মোপলব্ধি নিয়ে আমার ভাবতে ভালোই লাগছে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে এই ভদ্রলোককে চিনিনা। তার কোনো লেখাও পড়িনি। পত্রপত্রিকা তার কবিতা ও অন্যান্য লেখা প্রকাশ করে যেসব তথ্য দিয়েছে সবকিছু আমি বিশ্বাস করিনি। এত বেশি ভুল বানানে, বাক্যে একজন যুগ্ম সচিব কবিতা লিখবেন, এ বিশ্বাস আমার কোনোদিনও হবে না। যা হোক, হয়তো তার সাহিত্যবোধ রয়েছে। এমন কিছু ক্যারিশমা রয়েছে যা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়নি। হয়তো এই ম্যাজিক তিনি দেখাতেও চান না। দেখালে তো এদেশে মানুষের মাঝে পরিচিতি অর্জন করে নিতেন। মানুষের মাঝে পরিচিতি অর্জনের নানা পথ রয়েছে। এগুলোও তার জানা থাকার কথা।
স্বাধীনতা পুরস্কার ঘোষণার প্রক্রিয়া সম্পর্কে যতদূর জানি মন্ত্রী পরিষদ সচিবালয় থেকে পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিকে একটি ফোন করা হয়। সব পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিই ওই ফোন পান। সেখানে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আপনার কৃতিত্বপূর্ণ ও গৌরবজনক অবদানের জন্য আপনাকে এ বছরের স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচার ও আদবকেতা সহকারে এর সঙ্গে কারো দুয়েকটি বাক্য বলা হয়। যা পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তির জন্য অসাধারণ এক অর্জনের বিষয়। একজীবনে রাষ্ট্রীয় এতবড় সম্মান পেলে সে জীবনকে সার্থক ও সম্মানের সুষমায় মণ্ডিত জীবনই বলতে হয়। যদিও আমাদের দেশে এতবড় সম্মান অর্জনের পর সেই সম্মানের জন্য সারাটি বছর সেই ব্যক্তি কী কী সুবিধা পান তা আমার জানা নেই। যতদূর শুনেছি, পুরস্কারের সম্মান আর গৌরবটি বুকে করেই থাকতে হয়। এর চেয়ে বেশি আর কিছু আশা করার সুযোগ থাকে না।
মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ থেকে এমন একটি ফোনবার্তা পেয়ে যে অনুভূতি হয়, সে অনুভূতির দাম কত। সেই উপলব্ধির ওজন কত। আহা। পৃথিবীতে জন্মে একবারের বেশি এমন ফোনবার্তা পাওয়া যায় না। এরকমেরই আরো অনেক ফোনবার্তা পাওয়া যায় হয়তো, কিন্তু এইটি আর পাওয়া যায় না। ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সরকারের মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের এই ফোনবার্তা এস এম রইজ উদ্দিন আহমেদ পেয়েছিলেন। তিনি নিশ্চয়ই আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন। নিকটতম পরিচিত আত্মীয় স্বজন, একসময়ের সহকর্মী থেকে শুরু করে বহু মানুষ তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। তার পুরস্কারের জন্য যারা কাজ করেছিলেন, তারা সাফল্যের আনন্দে আত্মহারা হয়ে ফুল ও মিষ্টি বিনিময় বা বিতরণ করেছিলেন। এই অর্জনকে মহিমান্বিত করার জন্য নানা আয়োজনের পরিকল্পনা চলছিল। ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে যারা পুরস্কার আনতে যাবেন তার একটি তালিকা হয়তো তৈরি করা হচ্ছিল। সেই তালিকায় এস এম রইজ উদ্দিন আহমেদের পরিবারের নিকট সদস্যবৃ্ন্দসহ কাছের দুয়েকজন মানুষ ঠাঁই পাওয়ার কথা ছিল। এমনই তো হয়!
পুরস্কার ঘোষিত হওয়ার পর এস এম রইজ উদ্দিন আহমেদকে সংবর্ধনা দেয়ার জন্যও নিশ্চয়ই ভেবেছিলেন কেউ কেউ। সেখানে অসাধারণ ভাষানৈপুণ্যে একটি প্রশংসাসূচক মানপত্র পঠিত হবে। সেই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সবার দেয়া বক্তৃতা একত্র করে একটি সংকলন করা হবে। সেটি সাহিত্যে স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্তির এক স্মারকগ্রন্থ হিসেবে থেকে যাবে। পাঠক, এর সঙ্গে কল্পনার একটি মালা আপনিও গাঁথতে পারেন। ইচ্ছেমতো।
এর কিছুই হলো না। সরকার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। সরকারই ঘোষণা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এ বছর সাহিত্য পুরস্কারের ক্যাটাগরিই বাদ দিয়ে দেয়া হয়েছে। কেউই সাহিত্যক্ষেত্রে অবদানের জন্য এবার স্বাধীনতা পদকের সোনার মেডেল ও সার্টিফিকেট পাচ্ছেন না। কিন্তু এস এম রইজ উদ্দিন আহমেদ পেয়ে গেলেন সবচেয়ে বড় পুরস্কারটি। পুরস্কারের ফোনবার্তা ও ঘোষণা। দেশের সবকটি টেলিভিশন স্ক্রলে ঘুরলো তার নাম। পত্রিকায় প্রকাশ হলো বারবার করে। তারপর একে একে সাহস করে এই পুরস্কারে তার নামটি নিয়ে আপত্তি তুলতে তুলতে নানাকথার অবতারণা করলো। এসব পড়ে আমারও মনে হয়েছিল, বাংলাদেশে সাহিত্য সংস্কৃতির ধারার সঙ্গে রাষ্ট্রযন্ত্র ও সরকারের বিরাট দূরত্ব তৈরি হলো। এতে এক রকমের ভালোই হলো, প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানবিরোধী দুটি ধারা স্পষ্ট হয়ে গেল। প্রতিষ্ঠানবিরোধী ধারাটি হয়ে গেল বিশাল, আর প্রতিষ্ঠান হয়ে গেল ছোট; ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র। যে ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে কখনো ঘটবে এমন স্বপ্নও ছিল না কারোর।
আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, স্বাধীনতা পুরস্কার যারা পান তাদের সবার নাম ও কৃতিত্বের কথা একসময় আর সবার মনে থাকে না। কিন্তু এস এম রইজউদ্দিনের নামটি মনে থাকবে। মানুষ মনে রাখবে। সাহিত্য সংস্কৃতির লোকজন তো মনে রাখবেনই। তার নামটি নেতিবাচক অর্থে মনে রাখার চেয়ে ইতিবাচক অর্থেই মনে রাখা উচিৎ। কারণ পুরস্কারের জন্য তার নিজের কোনো হম্বিতম্বি আমরা দেখিনি। পুরস্কারটি বাতিল হবার পর তার হাস্যোজ্জ্বল ও সাধারণ যে ছবিটি আমরা দেখছি, সেটি দেখে তার প্রতি কোনো বিদ্বেষ তৈরি হবার কোনো কারণ নেই। বরং আমার বারবারই মনে হচ্ছে, তিনি সেই সৌভাগ্যবানদের একজন, যিনি রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ দপ্তর থেকে ফোনবার্তায় শুনেছেন, এ বছর সাহিত্যে “আপনি সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ এ ভূষিত হচ্ছেন।”
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








