হাওর বললে প্রথমেই মনে পড়ে হাছন রাজা, রাধারমণ, আবদুল করিম, দুরবিন শাহদের কথা। হাওর মানে দিগস্তবিস্তৃত জলরাশি, ঢেউয়ের তালে যেখানে দুলে উঠে সুর। অথচ সেই হাওর এখন কৃষকের কান্নায় ভারি। প্রবল অকালবর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলে তলিয়ে গেছে সোনালি ফসল। মরেছে হাওরের মাছ, খামারের হাঁস, গবাদিপশু।
হাওরাঞ্চলের এই দারুণ দুর্বিপাকে সরকার কিংবা বড় প্রতিষ্ঠানের বাইরে ব্যক্তি উদ্যোগে ফলপ্রসূ কিছু করা সম্ভব কী না আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। অপরাপর দুর্যোগের সঙ্গে হাওরের এই পরিস্থিতির কিছু তফাৎ আছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের সাথে ঢলে হাওর তলিয়ে যাওয়াকে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। ওসব দুর্যোগের পর মানুষের জরুরি খাবার, কাপড়চোপড়, আশ্রয় ও চিকিৎসা সেবার প্রয়োজন হয়। রান্নার ব্যবস্থা থাকে না ফলে শুকনো বা রেডিমেড খাবার, বিশুদ্ধ খাবার পানি এগুলোই হয়ে দাঁড়ায় বেঁচে থাকার জন্য আশু প্রয়োজনীয়।
হাওরে এই মুহূর্তে কাপড় বা মাথাগোঁজার ঠাঁইয়ের হঠাৎ-সংকট নেই। কিছু পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছে তবে তা উদ্বেগজনক হারের নয়। কিছু এলাকায় তাৎক্ষণিক খাবার সংকট আছে, সেটিও সমাধানযোগ্য। হাওরের দুর্যোগটি তাহলে কোথায়?
হাওরের এই দুর্যোগ আসলে দীর্ঘমেয়াদী। হাওরাঞ্চলের প্রায় পুরোটাই একফসলী জমি, এখানে বছরে একবারই বোরো ধানের চাষ হয়। বছরের বেশিরভাগ সময়জুড়ে জলমগ্ন থাকে বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল। বৈশাখে উঠে ধান, যার স্থানীয় নাম ‘বৈশাখী’। চৈত্রমাস হাওর জনপদের কষ্টের সময়। গোলায় তখন ধান থাকে না, নি-ধান’এর এইসময়ের নাম নিদান। এবার যেহেতু কৃষকের গোলায় ধান উঠেনি নিদান চলবে বছরজুড়েই। কাজেই কিছু চিড়া মুড়ি গুড়ে এই নিদানের উপশম হবে না।
আরেকটি ব্যাপার হলো হাওরবাসী মানুষের আমিষের মূল উৎস মাছ ও হাঁস। আগের সেই প্রাচুর্য হয়তো এখন নেই তবু ভরা পানির সময়ে হাওরবাসীরা এখনো মাছেভাতেই থাকেন। জলমগ্ন হওয়ায় বর্ষাকালে এ তল্লাটে শাকসবজির আকাল থাকে বরাবরই, পাতে তাই বড় জায়গাজুড়ে থাকে হাওরের মাছ। এবার যেহেতু পঁচা পানিতে মাছ মরে গেছে, হাওরে মাছেরও আকাল হবে। হাঁসও মরেছে, খামারিদের মতো মাথায় হাত পড়েছে আটপৌরে গেরস্থেরও। এই হাঁসগুলোর মাংস ও ডিম মৌসুমজুড়ে এদের আমিষের চাহিদা মেটায়।
কাজেই দুর্যোগপরিস্থিতি আপাতদৃষ্টিতে যা মনে হচ্ছে বাস্তবে তার চেয়ে বহুগুণ ভয়াবহ। এর প্রভাব থাকবে অন্তত কয়েক মৌসুমজুড়ে। দুর্যোগের এই দীর্ঘস্থায়ীত্ব ও বিপুলতা বিবেচনা করেই শুরুতে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলাম ব্যক্তিউদ্যোগে ত্রাণকার্যক্রম ঠিক কতটুকু ফলপ্রসূ হবে। সরকারকে তো অবশ্যই দায়িত্ব নিতে হবে। বেসরকারি বড় প্রতিষ্ঠানগুলোরও উচিত এই মানবিক বিপর্যয়ে এগিয়ে আসা। যারা এরমধ্যেই কাজ শুরু করেছেন তারা ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।
এই মুহুর্তে আমাদের করণীয় সম্ভবত বিষয়টিকে আলোচনায় রাখা। অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, এই দেশে নিত্যদিন ইস্যু বদলায় এবং আমরা বরাবরই অভাবী মানুষের প্রয়োজন বিবেচনায় না নিয়ে মধ্যবিত্ত আবেগ-অনুভূতি নিয়ে ব্যস্ত থাকি। নিশ্চিত করেই বলা যায় হাওরাঞ্চলের মানুষের কথা যেদিন মূলধারার গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে হারিয়ে যাবে, সরকারও হাঁফ ছেড়ে অন্য দিকে মন দেবে।
হাওরের মানুষদের বছরজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিনাসুদে ঋণপ্রদান, জরুরিভিত্তিতে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাসহ যেসব দাবি সচেতন বিভিন্ন মহলে উঠেছে সেগুলো বাস্তবায়নের পাশাপাশি অত্যন্ত জরুরি এই দুর্যোগের কারণ খুঁজে বের করা। গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন খবরে জানা গেছে এই দুর্যোগের পেছনে প্রকৃতির মতো হাত ছিল মানুষেরও। আরও নির্দিষ্ট করে বললে সরকারি দলের নেতা ও আমলাদের।
পাউবোর গাফিলতি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ব্যর্থতার সাথে যুক্ত হয়েছিল ঠিকাদারদের লুটপাট। (অনুমিতভাবেই এই ঠিকাদাররা সরকারিদলের রাজনীতির সাথে জড়িত, কাজেই আমরা ধরে নিতে পারি তাদের কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় আসতে হবে না)। যথারীতি দু-তিনটি তদন্ত কমিটি হয়েছে, অবশ্য আমরা এখন জানি তদন্ত কমিটি গঠিত হয় মূলত সময়ক্ষেপণ করে যেকোনো ইস্যুকে গুরুত্বহীন করে ফেলার উদ্দেশ্যে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে কী আসবে সেটি আলাদা বিবেচ্য। তবে প্রতিটি হাওরবাসী মানুষই জানে ফসলরক্ষা বাঁধের টাকার হরিলুট না হলে তাদের দুর্গতি অনেকখানি কম হতো। এই লুটপাটকারিদের বিচারের দাবিও আমাদের তুলতে হবে নয়তো সরকারের প্রচ্ছন্ন মদদে লুটপাটের অভয়ারণ্যে পরিণত হওয়া এই জনপদে নিয়মিতই কৃষকের কান্না শোনা যাবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)










