রাজধানীতে শিশু-কিশোররাও এখন ছিনতাইকারীদের টার্গেট হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এমন ঘটনা অনেক। তবে সন্তান ছিনতাইয়ের শিকার হলেও অভিভাবকরা পুলিশের কাছে যাচ্ছেন না। কারণ তারা মনে করেন, থানায় অভিযোগ করলে নানা তথ্য জানতে পুলিশ কথা বলতে চাইলে সেটা আবার সন্তানের মানসিক অশান্তির কারণ হতে পারে।
বুধবার বিকেলে বনশ্রীতে নিজের স্কুল কোচিংয়ে যাওয়ার সময় ছিনতাইয়ের শিকার হয় অষ্টম শ্রেণীর এক ছাত্র। মা-বাবা দু’জনই চাকুরিজীবী তাই সার্বক্ষণিক যোগাযোগের জন্য তার কাছে থাকা মোবাইল ফোনটি নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। সঙ্গে স্কুলের ইফতার পার্টির চাঁদা দেওয়ার জন্য অল্প কিছু টাকাও।
এক অভিভাবক জানিয়েছেন, তার নটরডেম কলেজে পড়ুয়া ছেলে গত মাসে শেখেরটেক এলাকায় দুইবার ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছে। ছিনতাইকারীরা একবার তার ল্যাপটপ নিয়ে গেছে, আরেকবার মোবাইল ফোন।
এর আগে শেখেরটেকর কাছাকাছি তাজমহল রোড এলাকায় এক সাংবাদিকের ছেলের সাইকেল নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। ছেলেটি মায়ের জন্মদিনের কেক কিনে সাইকেল চালিয়ে বাসায় ফিরছিল। ছিনতাইকারীরা তার পথ আটকে সাইকেলটি রেখে চলে যেতে বলে।
একইভাবে বনশ্রীতে নিজের বাসার সামনে সাইকেল চালানোর সময় ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে তার নতুন সাইকেল ছিনিয়ে নিয়ে গেছে কয়েকজন।
সব ক্ষেত্রেই মা-বাবা এই ভেবে সান্ত্বনা খুঁজছেন যে তাদের সন্তানের শারীরিক কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে, দরকারি মনে করলেও সন্তান একা চলাফেরা করার সময় মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপ দিতে আর সাহস পাচ্ছেন না। যে ছেলেদের সাইকেল ছিনতাই হয়েছিল তাদের সাইকেল চালানোই বন্ধ করে দিয়েছেন মা-বাবা।
মোবাইল-ল্যাপটপ-সাইকেল থাকাই কারণ?
তাহলে কি সঙ্গে মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপ কিংবা সাইকেল রাখার জন্যই তারা ছিনতাইকারীদের টার্গেট হচ্ছে? এ বিষয়ে পুলিশ এবং অপরাধবিজ্ঞানীরা কী বলছেন?
গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)’র জয়েন্ট কমিশনার আব্দুল বাতেন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, এটা শুধু শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রেই না, সবার কাছেই মূল্যবান কিছু থাকলে ছিনতাইয়ের শিকার হওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়্যারম্যান ড. জিয়া রহমান বলেন, এসব ছিনতাইকারী আসলে দেখছে যে ওদের হাতে যে ল্যাপটপ বা ফোন রয়েছে সেটা কিছুটা মূল্যবান। তাছাড়া শিশু-কিশোরদের সহজে ভয় পাওয়ানো যায় ভেবেও অনেকে সেটাকে সুযোগ হিসেবে নিচ্ছে। তাদের দমিয়ে রেখে তাদের কাছে থাকা জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। 
তাহলে কি ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী একটি শিশু বা কিশোর প্রয়োজন হলেও ল্যাপটপ বা মোবাইল ফোন সঙ্গে রাখতে পারবে না? শখের সাইকেলও চালাতে পারবে না? এ মহানগরী কি তাদের সেই নিশ্চয়তা দিতে পারছে না?
ডিবির জয়েন্ট কমিশনার আব্দুল বাতেন বলেন, নির্দিষ্ট বয়সীদের কাছ থেকে ছিনতাইয়ের কিছু কিছু ঘটনার খবর আমরা পেয়েছি। কিন্তু, খুব বেশি না। সব ধরনের ছিনতাই রোধেই আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি।
‘তবে এই বয়সী শিশু-কিশোরদের বাবা-মা তাদেরকে কত দামী জিনিস দেবেন সেটা নির্ভর করবে তাদের পরিবারের উপর,’ উল্লেখ করে তিনি বলেন: খুব ছোটদের হাতে এসব জিনিস না দেওয়াটাই তো সচেতনতা। ‘অবশ্য খুব বেশি দরকার হলে সেসবতো সন্তানকে দিতেই হবে,’ বলে মনে করেন এ গোয়েন্দা কর্মকর্তা।
বিচ্ছিন্নতা আরেক কারণ?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়্যারম্যান জিয়া রহমান বলেন, এই জায়গায় দাঁড়িয়ে বলতে হয়, আমাদের আরো একটু সচেতন হতে হবে। বাবা-মাদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। অনেকে অপরাধের শিকার হলেও অভিযোগ করতে যান না। নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে নয়, বরং সবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ গড়তে হবে।
বাস্তবতা হচ্ছে ছিনতাইয়ের শিকার সন্তানদের মা-বাবা দরকার মনে করলেও আরেকটি মোবাইল কিংবা ল্যাপটপ তুলে দিতে ভয় পাচ্ছেন কিংবা শখের সাইকেল। এরকম খবর জেনে অন্য অনেক মা-বাবাও তেমনটাই করছেন।
শিশু-কিশোরদের মনে এটা কী ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে?
জিয়া রহমান বলেন, এখনকার বাবা-মা সন্তানদের অনেক বেশি দেখাশোনা করে। আগের মধ্যবিত্ত শিশুরা যতটা সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে বড় হতো এখনকার সন্তানরা তার কোনোটাই করতে পারে না। ফলে তারা অল্পতেই ভেঙে পড়ে। সেই পরিস্থিতিতে এমন ঘটনা তার মনে নেতিবাচক প্রভাব আনবে নিশ্চয়ই।
এরকম ঘটনা বন্ধে পুলিশ কি বিশেষ কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে? জয়েন্ট কমিশনার আব্দুল বাতেন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, শিশু বা কিশোরদের ছিনতাইরোধে সেভাবে আলাদা কোনো উদ্যোগ নেই। সবধরনের ছিনতাই ও সবধরনের অপরাধের বিরুদ্ধেই আমরা কাজ করছি। এসব ক্ষেত্রে আমাদের কাছে রেকর্ডেড কোনো অভিযোগ না থাকলে আমরা সেটার তদন্তে নামতে পারি না।
‘তাই আমরা বলতে চাই, যেকোন ঘটনায় আপনারা প্রথমেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানান।’








