‘প্রাইভেসি’ শব্দটা ছোট হলেও মানবজীবনে এর গুরুত্ব যে অপরিসীম তা বলাই বাহুল্য। সেই জীবন একাধারে ব্যক্তি জীবন, সামাজিক জীবন ও কর্মজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এই প্রাইভেসি শব্দটা কতটা মানা হয়?
আজ দুই জায়গার নিত্য প্রাইভেসি ভায়োলেন্স নিয়ে বলবো ভাবছি।
১. শপিং করতে গেলে বিশেষ করে মেয়েদের তো নিত্যদিনই এই প্রাইভেসি ভায়োলেন্স এর শিকার হতে হয়। এই ক্ষোভ থেকে আজকাল শপিংয়ে যাওয়া ছেড়েই দিয়েছি। প্রায় তিন চার বছর হবে আগের মতো শপিংয়ে খুব একটা যাই না। গলির দোকান বা অনলাইনেই প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা চলে।
মনে আছে বছর চারেক আগে গাউসিয়ায় শেষবার দোকানদারের সাথে ঝগড়া হয়েছিল। গাউসিয়া চাঁদনীচক-হকার্স মার্কেটের অনেক দোকানদারের সাথেই আমার ঝগড়া হয়েছে। বিষয় ছিল প্রাইভেসি। তখন খুব রগচটা ছিলাম আমি। অল্পতেই মাথাই রক্ত উঠে যেতো। যখন দোকানে কাপড় দেখে পছন্দ করতাম দোকানদারের কমন প্রশ্ন: কাপড় কার জন্যে? আপনার জন্যে? আর এই প্রশ্ন শুনলেই আমার মাথা গরম হয়ে যেতো। মনে হতো, যদি বলি আমার জন্যে– সাথে সাথে লোকটা আমার আপাদমস্তক স্ক্যান করছে আর তার দু’চোখ দিয়ে ধর্ষণ করছে। তাই কখনোই আমি দোকানদারদের এই দুই প্রশ্নের জবাব দিতাম না। বলতাম কার জন্যে সেটা আপনার দরকার কী? আপনার দরকার বিক্রি করা।
একবার এক দোকানে আমার একটা কাপড় পছন্দ হওয়ার পর বললাম, আমাকে ওটা থেকে দেড়গজ কাপড় দেন। দোকানদারের কমন প্রশ্ন কী বানাবেন, কার জন্যে? সোজা জবাব দিলাম, লুঙ্গি বানাবো, আপনার জন্যে। ব্যস পাগল ক্ষেপে আগুন। এ্যাঁ, আপনি এরকম বললেন কেন? আমি ঠাণ্ডা মাথায় বললাম, আপনার দরকার বিক্রি করা। ক্রেতা কী বানাবে, কার জন্যে বানাবে তাতে আপনার এতো ইন্টারেস্ট কেন? তারপর ২০ মিনিট ঝগড়া। তাকে আদবকায়দা শেখানোর চেষ্টা করে বেরিয়ে এলাম। কাপড় আর কেনা হলো না। মেজাজ খারাপ করে চলে আসতে হলো।
কিছুদিন পর হকার্সে একই ঘটনা। রেডিমেড জামা কিনবো। একটা জামা পছন্দ করে জানতে চাইলাম অতো (আমি যে সাইজ ব্যবহার করতাম) সাইজটা হবে কী? বিক্রেতার প্রশ্ন: কার জন্যে ম্যাম, আপনার জন্যে? পাল্টা জবাব দিলাম, না আমার জন্যে না। একটা কিছু কিনতে ইচ্ছে হয়েছে, কিনে ওখানে ডাস্টবিনে ফেলে দেবো। মানে কী? কিনে ফেলে দেবেন মানে? ইয়ার্কি করেন? বললাম: না, ইয়ার্কি না। আমি কী করবো, কার জন্যে কিনবো সেটা আপনার বিবেচ্য বিষয় না। আপনার যদি ওই সাইজের জামাটা থাকে তো দেন। না হলে নাই। কিন্তু বিক্রেতার ইগোতে আমার জবাবটা আঘাত হেনেছে ভালো। তাই কিছুক্ষণ ঝগড়া। অনেক লোক জড়ো হওয়ায়, তারপর না কিনেই ফিরে আসা।
এইভাবে এক সময় ধীরে ধীরে আমার শপিংয়ে যাবার আগ্রহ কমে গেলো। কিন্তু তাতে কী! মেয়ে তুমি আপদ ছাড়লেও আপদ কি আর তোমাকে ছাড়ে? ভুলে যাস কেন তুই জন্মেছিস মেয়ে হয়ে।
২. এবার বলি করপোরেট জগতের কথা। এখানে তো মেয়েদের প্রতিনিয়তই প্রাইভেসি ভায়োলেন্সের শিকার হতে হয়। তবে পার্থক্য হলো এখানে প্রাইভেসির ভায়োলেন্স হয় শিক্ষিত লোকদের দ্বারা, শুদ্ধ উচ্চারণে।
কোনো মেয়ের অফিস শেষ হওয়ার পর যখন সে তার ডিপার্টমেন্টের চিফকে বলতে যায় যে, সে বের হবে– তখন তাকে শুনতে হয় বাসা গিয়ে কী করবে? আর সে মেয়ে যদি হয় সিঙ্গেল আর বস যদি হয় পুরুষ তাহলে তো কথাই নেই। ৯০% গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায় যে এই প্রশ্ন অবধারিত। শুনতেই হবে ওই মেয়েদের। প্রশ্নকর্তারা একবারও চিন্তা করেন না যে তিনি তার কলিগকে হ্যারাস করছেন বা তার প্রাইভেসিতে আঘাত হানছেন। ভাবখানা এমন হয় যেন এটা এক ধরণের রোমান্টিকতার বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে ছেলেদের কখনোই এসব প্রশ্ন শুনতে হয় না। অন্তত আমি শুনিনি আমার ২৪ বছরের চাকুরির জীবনে। তবে অনেক মেয়েকে যে একথা শুনতে হয়েছে তা নিজেই দেখেছি এবং শুনেছিও।
কোনো কোনো মেয়েতো ভয়ে ছুটির কথা বলেও না। ছুটি চাইতে গেলেই ডিপার্টমেন্টের বসের প্রশ্ন: একা মানুষ ছুটি নিয়ে কী করবেন? কোথায় যাবেন? বছরের পর বছর এই প্রশ্নগুলো শুনতে কী পরিমাণ যে ঘেন্না জন্মায় এটা তারা একবারও ভাবেন না। তারাতো বলেই মজা পান। আহা কী যে আনন্দ এই প্রশ্নে। এক ঢিলে দুই পাখি শিকার। দুই পাখি বলেছি কারণ এখানে প্রথম পাখি হলো: ওই মেয়ে কলিগকে সূক্ষ্মভাবে মানসিক নির্যাতন, দ্বিতীয় কথা: ওই মেয়ে একা এটা তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে পরোক্ষভাবে নিজেকে দিয়ে দোসর বানানোর প্রপোজাল। কতোটা অসভ্য মানসিকতার হলে এভাবে পুরুষ কলিগরা নিত্য মেয়ে কলিগদের প্রাইভেসিতে আঘাত হানতে পারেন। অথচ তারা একেকজন নিজেদের সভ্য ও প্রগতিশীল ধ্যান ধারণার পুরুষ বলেই দাবি করেন।
আরেকটা মজার বিষয় আছে এখানে। সেটা হলো, কোনো মেয়ে যদি স্বামী বা বাচ্চার সাথে জড়িয়ে কোনো প্ল্যান শো করতে পারে তাহলে তার ছুটি তাৎক্ষণিক মঞ্জুর। নারী সিঙ্গেল হলে তার আবার অবকাশ কী? অবাক করার মতো বিষয় হলো এখানে পুরুষতন্ত্রের একটা ভয়ংকর প্রভাব রয়েছে। মেয়েটা লাগাতার অফিস করে ক্লান্ত হচ্ছে, কিন্তু সে তার নিজের একদণ্ড বিশ্রামের অনুমতি পায় না। ছুটি পায় স্বামী বা বাচ্চার জন্যে। জয় হোক এ সভ্যতার।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







