২০১৯ সালটা ফিলিপে কৌতিনহোর উপভোগ করা উচিত। কারণ বার্সেলোনার হয়ে সর্বশেষ চার-পাঁচটি ম্যাচের প্রতিটিতেই শুরুর একাদশে থেকে খেলেছেন। দল কোপা ডেল রে’র কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে, সেই সঙ্গে লা লিগায়ও পাঁচ পয়েন্ট এগিয়ে থেকে সবার উপরে।
ব্রাজিলিয়ান তারকা নিজে গোল করেছেন এবং গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন। যার কারণে সম্প্রতি সেরা একাদশে সুযোগ পাচ্ছিলেন না সেই উসমান ডেম্বেলে দুই সপ্তাহের জন্য মাঠের বাইরে। কোচ আর্নেস্টো ভালভার্দের সামনে এখন একটা সুযোগ এসেছে। কৌতিনহোর কাঁধে হাত দিয়ে তিনি বলতে পারেন, তোমার জন্য ‘বড় সুযোগ, বাছা’।
এর বিপরীতেও কিন্তু নগ্ন পরিসংখ্যান এবং কম খুশির ছবিও আছে।
বার্সেলোনার ইতিহাসে ট্রান্সফার ফি’র রেকর্ড গড়ে আসার এক বছর পর কৌতিনহোর শারীরিক ভাষা দেখলে মনে হয়, তিনি হয় নিজের গাড়ির চাবি হারিয়েছেন, না হয় রেস্টুরেন্টে বসে খারাপ ঝিনুক খাচ্ছেন। সতীর্থরা যখন গোল করছেন তখন তার উদযাপনে নীরবতা দেখা যাচ্ছে, যদিও তিনি উৎসবে সামিল থাকছেন। কৌতিনহোর এই ছবিতে হতাশা নয়, দ্বন্দ্বের ছায়া দেখা যাচ্ছে।
গত জানুয়ারিতে তিনি বার্সায় যোগ দিয়ে ‘স্বপ্ন সত্যি হয়েছে’ বলে যে অভিব্যক্তি করেছিলেন এই ছবি তা থেকে ১৮০ ডিগ্রি উল্টো। প্রাকৃতিক হাসিতে যেমন পুরনো মুক্তাও সাদা দেখায় এবং তা একই সঙ্গে সুখ বা পরিপূর্ণতারও সুপারিশ করে। কিন্তু এখন কৌতিনহোর মুখ দেখলে সাম্প্রতিক স্মৃতিটাও অনেক দূরের বলে মনে হয়।
গত সপ্তাহে লেগানেসের বিপক্ষে তাকে উঠিয়ে যখন মাঠে নামানো হয় লা মাসিয়ার ছাত্র কার্লস অ্যালেনকে, তখন ক্যাম্প ন্যুর ভিড় থেকে কিছু (যদিও তাৎক্ষণিক) অসন্তুষ্টি ছিল। অনেকে আবার ভালভার্দের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাচ্ছিলেন। এটা অপ্রাসঙ্গিক নয়; স্থানীয়রা তাদের নিজস্ব খেলোয়াড়দের উত্থান, মানিয়ে নেয়া এবং সফলতা দেখতে অত্যন্ত আগ্রহী। অ্যালেনকে সে ম্যাচে বেশ ধারাল এবং আকর্ষণীয় লাগছিল।
সম্ভবত ওই মুহূর্তে কৌতিনহোর উপর পূর্ণ রায় দেয়ার মতো তেমন কিছু ছিল না। কিন্তু তার মূল্য, খ্যাতি, সেট পিচের দক্ষতা এবং লিভারপুল থেকে যোগ দেয়ার পর তার প্রথম পাঁচ মাস সময় যে প্রভাব পড়েছিল তার বিপরীত ছিল এটি। এমনকি এখন কৌতিনহোকে অব্যাহতভাবে প্রত্যাখ্যান এবং অ্যালেনকে তার জায়গায় দেয়া হলে অনেক লোকই হয়তো ভ্রু কুঁচকাবে না।
বার্সেলোনা অনেক ভালো খেলছে, শিরোপা জিতছে (চ্যাম্পিয়ন্স লিগ বাদে) । কিন্তু পেপ গার্দিওলার দলের সঙ্গে যেন যাচ্ছে না। আর্নেস্টো ভালভার্দের বার্সেলোনা হাইব্রিড। ইয়োহান ক্রইফ, ফ্রাঙ্ক রাইকার্ড, পেপ গার্দিওলা ও ভালভার্দের আইডিয়া মিলে লুইস এনরিকের অধীনের হাইব্রিড বার্সার চেয়ে এই দল আরও শক্তিশালী, দ্রুততর এবং বেশি সারিবদ্ধ হয়ে খেলছে।
গার্দিওলার বার্সেলোনা একটি যন্ত্র ছিল। সূক্ষ্মভাবে তার টিউন ধরতে পেরেছিল, উচ্চতর কার্যকারিতার সঙ্গে একটি বিশেষ অবয়ব তৈরি করেছিল যা বেশ সমন্বিত ছিল এবং তারা একটি সাধারণ নিয়ম মেনে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সঠিক কাজ করেছিল।
লা লিগার নেতা এবং বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা এখন তেমন কিছু নয়। খেলোয়াড়রা চলে গেছেন, মান পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু মূল ধারণা অভিন্ন রয়ে গেছে: বল ধর, সেটা ধরে রাখো, প্রতিপক্ষকে জায়গা দিয়ে মাঠ প্রসারিত কর, দ্রুত এবং সঠিকভাবে পাস কর, লিঙ্ক-আপগুলোকে কাজে লাগাও, দ্রুত এবং মৌলিকভাবে এক টাচে ফুটবলটাকে পূর্ণতা দাও।
এসবকিছু প্রাকৃতিকভাবেই কৌতিনহোর মধ্যে আছে। তার টেকনিক্যাল গুণ এবং সহজাত যে প্রবৃত্তি তা মিলিয়ে তিনি সফলভাবে লিওনেল মেসি এবং সুয়ারেজ সঙ্গে এক হয়ে দারুণ কিছু করতে পারেন।
কিন্তু বার্সেলোনার যখন ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত খেলা চালিয়ে নিতে হয়, যখন ভালভার্দের দলের প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত না করা পর্যন্ত বল পাস দিতে হয় এবং যখন ফুটবলটাকে পিনবলের চেয়ে বেশি রক্তের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করতে হয়, তখনই কৌতিনহোকে সংগ্রাম করতে হয়।
বার্সায় এখন দুটি বিপরীতমুখী কেসস্টাডি আছে। দলে দুজন ব্রাজিলিয়ান খেলছেন। কাতালান ক্লাবে উভয়েই অনেক স্বপ্ন নিয়ে খেলছেন। একজন কৌতিনহো নিজে এবং অন্যজন তার জাতীয় দলের সতীর্থ আর্থার (আরও একজন আছে ম্যালকম) । এদের কেউই বার্সার একাডেমিতে বেড়ে ওঠেননি, তারা ক্রইফ বা গার্দিওলার শিক্ষাও পাননি।
কোনো রকম সমস্যা ছাড়াই কৌতিনহো তার ক্যারিয়ার লিভারপুল থেকে স্পেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন একেবারে মনেপ্রাণে, যেখানে কাতালুনিয়ার রাজধানী তাকে তার ক্যারিয়ার নতুন করে সাজানোর প্রস্তাব করেছিল: ট্রফি, অ্যাডুলেশন এবং মেসির পাশাপাশি খেলার সময় কাটানোর সুযোগ দিয়ে।
সিনিয়র স্বদেশির মতো আর্থারও তার ক্যারিবয়ার বার্সায় স্থির করেন। প্রথমদিকে মেসির কাছে কুণ্ঠিত এরপর নিজেকে সন্তুষ্ট করার জন্য নিজেকেই চুমু দিতে হয়েছিল এই কারণে যে, পুরো ব্যাপারটা কেবল তার কিছু স্বপ্ন ছিল না, অনেক বড় স্বপ্ন ছিল। যেমনটা কৌতিনহো বার্সায় যোগ দিয়ে বলেছিলেন। দুজনের প্রত্যেকেই এখন এই বড় পরীক্ষার জন্য অধ্যয়নরত।

কৌতিনহোর আগে থেকেই একটা অভ্যাস আছে। সেটা সতীর্থের মতো করে খেলা। লিভারপুলে থাকতে তিনি স্থির করেছিলেন স্টিভেন জেরার্ডকে। ইংলিশ লিজেন্ড কীভাবে খেলেন সেটা তিনি নিজের মধ্যে নিয়েছিলেন। কৌতিনহোর নিজস্ব একটা দর্শন আছে, সেটা তিনি যতটা সম্ভব তার সতীর্থের কাছ থেকে নেয়া। তিনি মনে করেন, এর ফলে তার নিজের ক্যারিয়ার আরও এগিয়েছে।
বার্সেলোনায় যোগ দেয়ার পর, কৌতিনহো বলেছিলেন যে, ক্যাম্প ন্যুতে তিনি আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার শেষ কয়েক মাসের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি করবেন। অভিজ্ঞতাটা হল- তথ্য অনেক, সেখান থেকে যতটা সম্ভব শেখা এবং অনেক উন্নতি করা।
অন্যদিকে, আর্থার। যার দুই বছর আগে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক। তিনি এর আগে ফুটবল জীবনের পুরোটা সময়ই কাটিয়েছেন ব্রাজিলে। কৌতিনহোর মতো ইতালি, ইংল্যান্ড বা স্পেনের সময় দেননি।
ইনিয়েস্তা ক্লাব ছেড়ে চলে যাওয়ার পর মিডফিল্ডে তিনজনকে ব্যবহার করায় ডিফেন্সে বেশ সমস্যা হয়েছে বার্সার। শুরুতে নিজেকে মানিয়ে নিতে একটু কষ্ট হয়েছে আর্থারের। তবে ধীরে ধীরে নিজের কাজটা ঠিকঠাক মতো করে সব গুছিয়ে নিয়েছেন তিনি। এখন তার খেলা দেখলে মনে হয়, ফুটবল জীবনের পুরোটাই যেন ন্যু ক্যাম্পে কাটিয়েছেন।
কৌতিনহো এবং আর্থার ব্যক্তিগতভাবে কোন পজিসনে ভালো বা খারাপ সেটা এখন আর মামুলি প্রশ্ন নয়।

তরুণ আর্থার এমনভাবে ফুটবলটা খেলছেন যাতে বুদ্ধিমত্তা, স্মার্টনেস, সতীর্থের সঙ্গে সমন্বয়টা সহজেই চোখে পড়ছে এবং তিনি ধারাবাহিকভাবে উন্নতি করতে চান বলে মনে হয়। বলের ওপর তার নজরটাও অসাধারণ। ওয়ার্ক লোড, খেলার গতি, পাসের রিদম, বল পজিশনিং সমস্ত কিছুই তার পছন্দ করার মতো এবং কোন পরিস্থিতিতে কী প্রয়োজন তা বোঝার ক্ষমতাও অসাধারণ তার। সবমিলিয়ে আর্থার ফিট।
কৌতিনহো হয়তো নিয়মিত গোল পাচ্ছেন না, কিন্তু যেসব ম্যাচে খেলছেন সেসব খেলায় নেয়া তার শটগুলো দর্শনীয়। তার স্কিল নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই, গড গিফ্টেট। কিন্তু তিনি যদি ইনিয়েস্তাকেই অনুসরণ করে থাকেন, তাহলে তার প্রমাণ কোথায়?
কৌতিনহো যা করছেন তা তার নিজের এবং দলের উভয়ের জন্যেই ক্ষতিকর। এই যেমন- যেসব বল সতীর্থদের কাছে তিনি সহজেই দিতে পারেন সেগুলো না দিয়ে ভুল এবং খারাপভাবে ড্রিবল করছেন। পাসিং অপশন থাকা সত্ত্বেও তিনি যেন চোখ বন্ধ করে দৌড়াচ্ছেন।
ব্যাখ্যা করে বললে এটা বলা যায় যে, কৌতিনহো তার সাফল্যের পথ প্রতিষ্ঠিত করতে এবং ফুটবল যাদু তৈরি করতে মেসির মতো কিছু করার চেষ্টা করছেন। এর পেছনে শক্তিশালী প্রমাণও আছে।
কৌতিনহো তখনই বেশি খেলছেন, যখন মেসি বিশ্রামে থাকছেন। এই কারণে তার মনের কোনায় একটি ছবি ভাসে, ‘আমাকে তার (মেসির) পর্যায়ে পৌঁছাতে হবে এবং মেসির খেলার নাটকীয়তা মঞ্চস্থ করতে হবে।’
নিজের জায়গায় যাওয়ার জন্য দ্রুত বল অন্যকে দিয়ে দিতে হয়। যেটা অহরহ করে থাকেন মেসি। কিন্তু এই কাজটা প্রায়শই উপেক্ষা করেন কৌতিনহো, যাতে প্রতিদ্বন্দ্বীকে খেলার সুযোগ দেন তিনি।

মনে হচ্ছে মেসি, জাভি এবং ইনিয়েস্তার ব্যাপারে তাদের সতীর্থরা সবসময় কী বলছেন তা উপেক্ষা করছেন কৌতিনহো। মেসির ব্যাপারে বলা হয়, তার মতো আর কেউই নেই।’ জাভি এবং ইনিংয়েস্তা? তারা যে কাজটি করেছিলেন, তা হল-ফুটবলের জটিলসব কাজগুলো সরল করেছিলেন।’
ক্লাবের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে ব্যক্তিগত এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী খুব চালাক ম্যানেজার ভালভার্দে। পাউলিনহোকে দলে নেয়ার কথা ভাবুন বা গত মৌসুমে হাঁটুতে অস্ত্রোপচার না করার ব্যাপারে সুয়ারেজের পছন্দকে কীভাবে মেনে নিয়েছিলেন বা কীভাবে ডেম্বেলের ছেলেমানুষী অবাধ্যতা মোকাবেলা করেছেন, শুরুতে সুযোগ না পাওয়ায় আর্তুরো ভিদাল যে অখুশি ছিলেন সেটা শান্ত করেছেন এবং নেইমারের ক্লাব ছেড়ে যাওয়ার কঠিন এবং বড় ঘটনা বেশ ভালোভাবে সামাল দিয়েছেন।
ভালভার্দে অনেকগুলো জটিল কাজ সহজভাবে সমাধান করেছেন। কৌতিনহোর বিষয়টা কোথায় এবং কীভাবে করবেন সেটা হয়তো তিনিই ভালো জানেন। তবে এই সমস্যা সমাধানের উপর নির্ভর করছে বার্সার চলতি আসরের ট্রেবল জয়, যেটা তারা অনেকদিন ধরে চাইছে।
ইএসপিএন এফসি অবলম্বনে








