সকাল আটটায় আমরা যখন খাগড়াছড়ির সেনানিবাসের গিরি থেবার রিসোর্ট থেকে সাজেকের উদ্দেশ্যে রওনা করি তখন চারপাশে কুয়াশায় ঢাকা। তাপমাত্রাও নেমে গেছে ১৬ ডিগ্রিতে। কয়েক হাত দূরের কিছুও ঝাপসা। সেই অবস্থায়ই গাড়ি করে সোজা সাজেকের উদ্যেশে যাত্রা।
পথে আদিবাসী শিশুদের অভ্যর্থনা। আমরা ভাবলাম হয়ত বড় গাড়ি দেখেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসছে শিশুরা। কিন্তু ঘোরটা কাটলো যখন দেখলাম চাদেঁর গাড়ি দেখেও হাত নাড়ছে শিশুরা। সবুজের মাঝে যান্ত্রিকতা হয়ত ওদের মাঝে বিস্ময় জাগায়।
জেলার দিক থেকে সাজেক রাঙ্গামাটিতে হলেও খাগড়াছড়ির আঁকা বাকা পথ ধরে সাজেক যেতে খানিকটা সুবিধা। মূল শহর থেকে যার দূরত্ব ৭০ কিলোমিটার। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা বাজারটা পার হয়ে উঁচু নিচু পাহাড়ের পথ ধরে এগিয়ে যায় গাড়ি।
দীঘিনালা বাজার আর আনসার ক্যাম্প পার হলেই বোঝা যাবে অনেকটাই এগিয়ে গেলাম। যদিও দীঘিনালা থেকে যেতে হবে আরো ৪৯ কিলোমিটার পথ। ফাঁকে যাত্রা বিরতি, বিরতির জায়গাটা বাঘাইহাট বাজারে। একটু জিরিয়ে নিতেই অবশ্য কুয়াশার ভেদ করে আলো বেরোয়। আবার যাত্রা শুরু। গন্তব্যটা নিশ্চয়ই পাঠকের মনে আছে। সাজেক দেখা। যাত্রায় ক্লান্তি নেই। বাড়তি পাওয়া হিসেবে সবুজ প্রকৃতি দেখা।
বাঘাইহাট বাজারের পর গঙ্গারাম মুখ। দুই দিক থেকে আসা নদী এক হয়েছে এখানেই। উড়োবাজার, গঙ্গারাম মুখ, নন্দরাম এসব পাহাড়ি পাড়া পেরিয়ে মাচালং বাজার। এই এলাকাই মূলত সাজেক ইউনিয়নের প্রধান কেন্দ্র। দূরের পাহাড়িরা এই বাজারে আসে। পাহাড়ের পথ, তাই গাড়ি খুব বেশি গতি পায় না। তবে মাইল স্টোন লক্ষ্য করে আমরা এগিয়ে যাই। অপেক্ষা কখন পৌঁছবো সাজেকে।
সময় গড়াতে থাকে। আমরা পৌঁছে যাই রুইলুই পাড়ায়। রুইলুইকে বলা হয় সাজেক উপত্যকার মূল কেন্দ্র। অনেকে আবার সাজেকের গ্রামও বলে থাকে। বলে রাখা ভালো, ততক্ষণে কিন্তু আমরা সমতল থেকে ১৮০০ ফুট উচ্চতায়। আর এই পাহাড়ে আদিবাসী এক গোষ্ঠীর বাস। যাদের বলা হয় লুসাই। তবে কিছু ত্রিপুরাদের বসবাসও আছে।
রুইলুই পাহাড় থেকে অল্প সময় লাগে সাজেকে পৌঁছাতে। প্রথমেই বিজিবি ক্যাম্প। সাথে লাগোয়া হেলিপ্যাড। বিজিবি ক্যাম্পের সামনের সড়ক দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। চোখে দেখে প্রথমে বিশ্বাস হয় না এই আমার দেশ। খটকা লাগে পরিচ্ছন্ন ইউরোপের কোন সড়কে এসে গেলাম হয়তো। ততক্ষণে চারপাশের প্রকৃতি ক্যামেরাবন্দী করতেই দলের সবাই ব্যস্ত।
ওহ, বলতে তো ভুলেই গেছি। যাত্রাপথে মোবাইল ফোনে নেটওয়ার্ক না থাকলেও হেলিপ্যাডে আসার পর পাওয়া যাবে নেটওয়ার্ক। চাইলে কারো খোঁজ নিয়ে নিতে পারেন এখান থেকেই।
মসৃণ প্রশস্ত পথ ছেড়ে আবার ধুলোর ভাঙ্গা পথ ধরি। নিজেদের দলের ছয় জনের বাইরে পরিচয় হয় স্থানীয় থানা লুসাই নামের এক আদিবাসীর সাথে। থানা লুসাইয়ের দেখানো পথ ধরেই এগিয়ে যাই। সে ঘুরিয়ে দেখায় তার কমলার বাগান আর পর্যটকদের জন্য তৈরি কাঠের দুই তলা কটেজ।
উঁচু নিচু ভাঙ্গা পাহাড় ধরে হেঁটে এগিয়ে যাই সাজেকের সর্বশেষ গ্রাম কংলাক পাহাড়। লাঠি হাতে খাদ কাটা সিঁড়ি ভেঙ্গে পাহাড়ে উঠতেই যত ক্লান্তি। কিন্তু পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছাতেই সব ক্লান্তি যেন নিমেষেই শেষ। এত বিস্তৃত সবুজ প্রকৃতি, একপাশে কর্ণফুলির জলরাশি। আর মেঘের হাতছানি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এই পাহাড়ের উচ্চতা ৩ হাজার ফুট। এই পাহাড়েই প্রায় পঞ্চাশ ঘর আদিবাসীর বাস। তবে কখনো কখনো নিরাপত্তার কারণে এই পাহাড়ে ওঠায় নিষেধাজ্ঞা দেয় বিজিবি।
থাকার ব্যবস্থা
থাকার জন্য রয়েছে বিজিবি পরিচালিত রূনময় রির্সোট। আর সেনাবাহিনী পরিচালিত সাজেক রির্সোট রয়েছে। সাজেক রির্সোটে আছে চারটি রুম। এক রাতের জন্য ভাড়া গুনতে হবে যথাক্রমে ১০ হাজার, ৯ হাজার, ৮ হাজার ও ৭ হাজার টাকা। রূনময়ে পাঁচটি কক্ষ। কিছুটা কম হলে ভাড়া গুনতে হবে পাঁচ ও সাড়ে চার হাজার টাকা করে।
অনেকে স্থানীয়দের লজিংও থাকেন। তাতেও গুনতে হবে প্রতি রাতে অন্তত দুই হাজার টাকা করে।
তবে সাজেক আর রূনময়ে থাকতে হলে আগেই যোগাযোগ করতে হবে।
সাজেক যাবার গাড়ি আর খরচ
ঢাকা থেকে শ্যামলী পরিবহন, ঈগল পরিবহন, এস আলম পরিবহন কিংবা সেন্টমার্টিন পরিবহনে করে খাগড়াছড়ি। খাগড়াছড়ি শহর থেকে গাড়ি ভাড়া করে আড়াই ঘন্টায় সাজেক পৌঁছানো যায়। কিংবা জিপগাড়িতে (স্থানীয় নাম চান্দের গাড়ি) সাজেক পৌঁছানো যায়। ভাড়া ৫-৬ হাজার টাকা। একটা গাড়ীতে অন্তত ১২ জন বসার ব্যবস্থা রয়েছে। অনেকে আবার দীঘিনালায় এসে সাজেক যেতে মোটর সাইকেলে চাপেন। জনপ্রতি খরচ হয় ১০০ টাকা করে।







