সেই ১৯৭১ সালের খন্ডিত স্মৃতি-কিন্তু ইতিহাস বিশাল। একাত্তরের নয়টি মাস জুড়ে বাঙালি তরুণ-তরুণীরা কে কোথায় অস্ত্র ধরেছেন, কে কোথায় মুক্তিযুদ্ধের দায়িত্ব পালন করেছেন তার সঠিক চিত্র আজও প্রকাশিত হয়নি। পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদেরই হয়নি-নারী মুক্তিযোদ্ধাদের কথা তো অনেক দূরের?
নারীরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এমন কথা বই পুস্তকে কিছু কিছু লিখিত হলেও তা নজরে পড়েছে কম এবং তা আংশিকও বটে। এবারে মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণ-জয়ন্তী উপলক্ষে ঢাকা এবং ৬৩ টি জেলায় নারী মুক্তিযোদ্ধাদের যে সম্মাননা দেওয়া হলো তাতে একটি সুযোগ ঘটেছিল জীবিতদের কাছ থেকে তাদের অবদান জেনে নেওয়ার এবং পরে যে যা বলেন তা অবিকল গৃহীভূত করার। কিন্তু সে সুযোগটি আমরা হারালাম। কোথাও কোন নারী মুক্তিযোদ্ধর কাছ থেকে এমন উদ্যোগ সরকারি বা বেসরকারিভাবে নিতে দেখি নি। জানতে পারা গেল না-নারী মুক্তিযোদ্ধাই কি সব-না কি আরও কেউ কেউ ছিলেন-যাদের নাম আজও সরকারি খাতায় ওঠে নি।
৫১ বছর পরে হলেও নারী মুক্তিযোদ্ধাদের কে সম্মাননা প্রদান খুবই আনন্দের এবং প্রশংসার। কিন্তু সারা দেশের সকল নারী মুক্তিযোদ্ধাদের যদি ঢাকায় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজরিত কোন স্থানে সম্বর্ধনার আয়োজন করা হতো-তা হলে অনেক বেশী সুন্দর হতো। তারা পরস্পর সকলে পরিচিত হওয়ার আনন্দ-বেদনার খবর জানার এবং অপূর্ব সুযোগ পেতেন-যা থেকে তারা বি ত হলেন তেমন কোন কর্মসূচী না হওয়াতে। আর কি কোনদিন তেমন সুযোগ পাওয়া যাবে? যদি তা হয়ও সবাই কি বেঁচে থাকবেন এবং নড়াচড়া করার শক্তি তাদের দেহে থাকবে সেদিন পর্যন্ত? নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, সে সম্ভাবনা ক্ষীন। তবুও সেই উদ্যোগ গ্রহণ করে আগামী ২৬ মার্চ ঢাকায় অথবা মুজিবনগরে তেমন জাতীয় ভিত্তিক নারী মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশের তিনদিন ব্যাপী আয়োজন ও তাদের বক্তব্য রেকর্ড করার প্রস্তাব করছি। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় এই প্রস্তাবটি বিবেচনা করে দেখতে পারেন।
পুরুষ মুক্তিযোদ্ধা
জেলা-ওয়ারী নারী মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা অবশ্যই একটি শুভ প্রচেষ্টা বলে অভিহিত করতে বিন্দুমাত্র সংকোচ রোধ করি না। তবে পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের জেলা তো দূরের কথা-উপজেলা ভিত্তিক সমাবেশ বা সম্মাননা অনুষ্ঠান আজও আয়োজিত হয়নি।
বস্তুত: লিঙ্গ-বৈষম্যের কথা বলছি না। মূল কথাটি হলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মুক্তিযোদ্ধার এক মহাসমাবেশ আগামী ২৬ মার্চ বা ১৬ ডিসেম্বরে সপ্তাহবাপী অনুষ্ঠানের আয়োজনই হতে পারে সর্বোত্তম। সময়ের কথা বিবেচনা করে একজন করে নির্দিষ্ট সংখ্যক উপজেলার প্রতিনিধি তার উপজেলার মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ও তাদের প্রত্যেকের অভদান লিখিতভাবে আনবেন ও তা সমাবেশে পড়ে শুনিয়ে সেখানে উপস্থিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী বা সচিবের হাতে তুলে দেবেন। এভাবে ৬ দিনে এই কাজগুলি শেষ করে সপ্তম দিনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সকাল ১০ টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত করলে ৬ দিনের এক ঘেঁয়েমি কাটিয়ে এক চমৎকার অনুভূতি নিয়ে সবাই বাড়ী ফিরতে পারবেন। এভাবে একটি অসাধারণ এবং অভূতপূর্ব আয়োজনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। এতে যে অপূর্ব মিলনমেলা ঘটবে তা দেশ বিদেশের মিডিয়ায় অতিশয় গুরুত্ব পাওয়া ও সম্ভবনা। আর একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসও পরবর্তী বছরে প্রকাশ করা সম্ভব্য। যদি মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় বা সরকার প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন তবে এই শুভ উদ্যোগের সাফল্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল দল ও ব্যক্তিদের সাথে বসে সর্বসম্মতভাবে কর্মসূচী নির্ধারণ করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কোন দল বা ব্যক্তি যাতে উপেক্ষিত না হন-সেদিকটা গুরুত্ব সহকারে লক্ষ্য রাখতে হবে।
সেদিন ১৫ ফেব্রুয়ারি পাবনা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে পাবনা জেলার নারী মুক্তিযোদ্ধা সম্মননা অনুষ্ঠিত হলো। আয়োজক ছিলেন পাবনার নারী শিশু কর্মকর্তা মোসাম্মৎ কাণিজ আইরিন জাহান। পাবনার জেলার সাতজন বীর নারী মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মাননা জানানো হলো।
যাঁরা সম্বর্ধিত হলো তাঁরা বেশীর ভাগই সুদূর গ্রামা থেকে এসেছিলেন। এরা হলেনঃ (এক) সোনা বালা পিতা সাধু মিস্ত্রী, গ্রাম ডাঙ্গাপাড়া পো: খিদিরপুর, উপজেলা আটঘরিয়া, জেলা পাবনা।
(দুই) মায়ারানী, পিতা ভুবন সরকার, গ্রাম বংশী পাড়া, পো: খিদিরপুর, উপজেলা আটঘরিয়া, জেলা পাবনা।
(তিন). মোছাম্মৎ জামেলা খাতুন পিতা-ছোলেমান প্রামানিক, গ্রাম-কন্দনপুর, পো: দেবোত্তর, উপজেলা-আটঘরিয়া, জেলা-পাবনা।
(চার) সুমতি রানী সাহা, পিতা ক্ষিতীশ চজন্দ্র সাহা, সাকিন রাধানগর, পাবনা পৌর এলাকা, পাবনা সদর, পাবনা।
(পাঁচ). গীতা তালুকদার (পূরবী মৈত্র) পিতা সুধীর নাথ তালুকদার, সাকিন দক্ষিণ রাঘবপুর, পাবনা সদর, পাবনা।
(ছয়) শামসুন নাহার, পিতা শফিউদ্দিন, গ্রাম শম্ভুপুর, পোষ্ট অফিস বেড়া, উপজেলা বেড়া, জেলা পাবনা এবং
(সাত) বানুনেছা (ভানুনেছা), পিতা নগেন হালদার, গ্রাম তেঁতুলিয়া, পোষ্ট অফিস নন্দনপুর, উপজেলা সাঁথিয়া, জেলা পাবনা।
এটা আমি সরকারি তালিকা থেকে পেয়ে তা থেকে উদ্বৃত করলাম। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই সাতজন বীর নারীর মায়ের নাম ও স্বামীর নাম কেন দেওয়া হলো না সরকারি গেজেটে। অথচ ঠিকানা যা লেখা হয়েছে তা তাঁদের স্বামীর বা শ্মশুর বাড়ীর ঠিকানা। এই অসঙ্গতি সারা দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের নামের গেজেটেই রয়ে গিয়েছে। সুতরাং অবিলম্বে তার সংশাধন হওয়া প্রয়োজন।
ভানুনেচ্ছা (সাঁথিয়া উপজেলা) বেঁচে নেই। তার সন্তান এসেছিলেন পরলোকগত মায়ের সম্বাননা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। বানু-নেছা নামাংকিত ক্রেষ্টও নিলেন। কিন্তু ফিরে যাওয়ার পর গ্রগামের মানুষেরা অবাক হবেন দেখে যে দুঃসাহসী নারী মুক্তিযোদ্ধা ভানু নেছার নামে কোন ক্রেষ্ট নেই আছে বানু নেছার নামে। ত্রুটিও সংশোধিত হওয়ার দরকার জরুরী ভিত্তিতে। কারণ বানুনেছা নামে ঐ গ্রামে কোন মুক্তিযোদ্ধা নেই।
এই সাত জনের সংক্ষিপ্ত জীবনী ও ছবি আগে থেকে সংগ্রহ করে দিব্যি একটি স্যুভেনির প্রকাশ করা যেত। এ ব্যাপারে যেমন ছিল না জাতীয় উদ্যোগ তেমনই ছিল না স্থানীয় উদ্যোগ। কারণটা আমলাতান্ত্রিক। উপরের হুকুম ছাড়া আমলাদের তো গাছের পাতাও নড়ে না।
চোখে পড়ার মত বৈষম্য যখন পাবনার জেলা প্রশাসনের সভাকক্ষে সম্মাননা অনুষ্ঠান সুরু হলো তখন বিপরীত দিলে বড় ধরণের সাদা পর্দা টাঙ্গানো ছিল। তাতে ঢাকার বীর নারী মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মাননা অনুষ্ঠান দেখানো হলো প্রায় দীর্ঘ দু’ঘন্টার কিছু বেশী সময় ধরে। আর দেখানো হলো ফরিদপুর ও গোপালগঘ্জ জেলার অনুষ্ঠান ৫/৭ মিনিট করে। বাদ বাকী জেলার অনুষ্ঠান গুলি দেখানো হলো না। কেন এমন হলো তা আয়োজকেরাই জানেন। টিভি চ্যানেলগুলিকে বললে তারা সরাসরি দেখাতে পারতো।
দ্বিতীয়ত: টেলিভিশনের কোন কোন চ্যানেলও নাকি ওই তিনটি অনুষ্ঠান একবার দেখানো হয়েছে স্থান পায় নি অন্য কোন জেলার অনুষ্ঠান। এটা কারিগরী কোন ত্রুটির কারণে ঘটেছিল না কি সিদ্ধান্তের অভাবে এমন হলো তাও কর্তৃপক্ষই জানেন।
পাবনাতে যা দেখলাম, জেলা প্রশাসক এসে সভাপতির আসন অলংকৃত করলেন-তার ডান পাশে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা রেজাউল রহিম লাল অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সহ বেশ কজন পুরুষ মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক এবং বাম পাশে অপর দুই পুরুষ মুক্তিযোদ্ধা বেবী ইসলাম ও আমি স্বয়ং। আমার বামে বসলেন মহিলা বিষয়ক উপপরিচালক মোছাঃ কানিজ আইরিন জাহান এবং তাঁর বামে মহিলা মুক্তিযোদ্ধারা। সবাই চুপচাপ। কেউ কোন কথা বললেন না বা কোন আলোচনার সূত্রপাত ও ঘটালেন না। চুপচাপ সবাই ঘাড় বাঁকা করে পর্দার দিকে তাকিয়ে ঢাকা। ফরিদপুর ও রেগাপালগঞ্জের অনুষ্ঠান দেখে দেখে প্যাকেট নিয়ে চুপচাপ ফিরে আসতে হলো।
শুরুতে সম্মাননার ক্রোটতুলে দিলেন প্রশাসক বীর মহিলা মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। আর মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের পক্ষে আগত সবাইকে প্রথমে ব্রেকফাস্ট প্যাকেট ও পরে লা প্যাকেট বিতরণ করা হয়। কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনও ছিল না। এমন নির্বাক অনুষ্ঠান যেমন কোনদিন দেখিনি-তেমনি আবার পর্দায় এত লম্বা বক্তৃতাও (এক মহিলা প্রতিমন্ত্রীর কণ্ঠে) কদাপি শুনি নি। সত্য বলতে, চরম একঘেঁয়ে লাগছিল পর্দায় প্রচারিত অনুষ্ঠান।
সাম্প্রদায়িক বৈষম্য
বীর মুক্তিযোদ্ধারা হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ-খৃষ্টান-নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকল ধর্মীয় আপরাপর বিভেদ ভুলে গিয়ে এক সাথে যুদ্ধ করেছেন এক সাথে জীবন দিয়েছেন, একসাথে স্বজন হারিয়েছেন। অত:পর দীর্ঘদিন পরে হলেও বীর মুক্তি যোদ্ধাদের সকলের নামই বৈষশ্যহীনভাবে গেজেটে প্রকাশও করা হয়েছে। আবার সরকার সকল মুক্তিযোদ্ধার জন্যই মাসিক ২০,০০০ টাকা মাসিক ভাতার ব্যবস্থাও করেছেন। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন বৃদ্ধির ফলে মাসিক ভাতা বাড়িয়ে ৩০,০০০ টাকায় উন্নীত করার সুপারিশ জানাচ্ছি।
কিন্তু ভাতার ক্ষেত্রে পীড়াদায়ক ধর্মীয় বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। যেমন স্বাধীনতা বিজয় দিবস বাংলা নববর্ষের ও প্রতিমাসে সকলকেই সমপরিমাণ ভাতা দেওয়া হয়-ধর্মীয় উৎসবে কিন্তু তা করা হয় না। দুই ঈদে বাংলা নববর্ষে ও প্রতিমাসে সকলকেই সমপরিমাণ ভাতা দেওয়া হয়-ধর্মীয় উৎসবে কিন্তু তা করা হয় না। দুই ঈদে, বাংলা নববর্ষে, স্বআধীনতা ও বিজয় দিবসে যেমন ধর্ম বর্ণ লিঙ্গ নির্বিশেষে সবাইকে দেওয়া হয়, দুর্গোৎসব, জন্মাষ্টমী, বৌদ্ধ পূর্ণিমা ও বড়দিন উপলক্ষ্যে কেন আদৌ কোন ভাতা দেওয়া হয় না তা অজ্ঞাত। এতে নিশ্চিতভাবেই ধর্মীয় বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে।
সকলের জন্য একই ধরণের কবর?
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হক বহুবার বলেছেন-মৃত্যুর পর সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাকে যেখানে সেখানে কবরস্থ করা হয়েছে-সেখানে সেখানে একই ডিজাইনের কবর গেঁথে তোলা হবে।
তা হলে হিন্দু বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর তাঁদের জন্যও কি কবর গাঁথা হবে? তাঁরা তো সমাধিস্থ হন না। এই মরনোত্তর বৈষম্যও খুবই পীড়াদায়ক।
ধর্ম যার যার অনুষ্ঠান সবার এই নীতির ভিত্তিতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু মুক্তিযোদ্ধাদের ধর্মীয় উৎসবে সবার জন্য বিশেষ ভাতা ও হিন্দু মুক্তিযোদ্ধাদের মরণোত্তর স্মৃতি রক্ষার পৃথক ব্যবস্থা করাও বাঞ্ছনীয়।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







