অবশেষে চিকিৎসকসহ সবার চেষ্টা ব্যর্থ করে চলে গেলো সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কামারবায়সা গ্রামের ছোট্ট মেয়ে মুক্তামনি। ডান হাতে হেমানজিওমা নামের বিরল এক রোগে আক্রান্ত হয়ে দেশব্যাপী পরিচিত হয়ে উঠেছিল দরিদ্র পরিবারের ১২ বছরের মিষ্টি মেয়েটি। তার রোগাক্রান্ত হাত দেখে শিউরে উঠেছিল দেশবাসী। সবাই তাই কায়মনোবাক্যে চেয়েছিলেন মুক্তামনি সুস্থ হয়ে ফিরে আসুক পরিবারে। ফিরে পাক তার আনন্দময় শৈশব। ঢাকায় চিকিৎসার আগে মুক্তামনিরও আকুতি ছিল- ‘আমি সুস্থ হয়ে স্কুলে যেতে চাই, খেলতে চাই।’
কিন্তু মুক্তামনি সবাইকে কাঁদিয়ে চিরবিদায় নিয়ে চলে গেল। তার বিদায় শত-সহস্রজনকে অশ্রুসিক্ত না করে পারেনি। আত্মীয় বা পরামাত্মীয় না হলেও অনেকেই তার বিদায়ে যেনো প্রিয় স্বজন হারানোর বেদনাই অনুভব করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে গত কয়েক মাস ধরে তাকে বাঁচানোর নিরন্তর চেষ্টা করেছিলেন চিকিৎসকরা। অনেক আশা-ভরসাও সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু ২৩ মে সকালে মুক্তামনির জীবনপ্রদীপ নিভে যায়।
মুক্তামনির মৃত্যু সংবাদ টিভি স্ক্রলে ভেসে উঠতেই সবার মন তাই ভীষণ বিষন্ন হয়ে উঠে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দ্রুতই খবরটি ছড়িয়ে পড়ে দেশ থেকে দেশান্তরে। মায়াবী মুক্তামনির ছবি শেয়ার করে অসংখ্য চেনা-অচেনা মানুষ তাদের হ্নদয়ের গভীর বেদনা প্রকাশ করতে থাকেন। অনেকেই লেখেন- ‘মুক্তামনিকে কখনই দেখিনি, কথা হয়নি, কিন্তু তার চলে যাওয়ার সংবাদ হৃদয়ে এক ক্ষত তৈরি করে গেল। পরপারে ভালো থাকুক মুক্তামনি।’
গত বছর মুক্তামনি দেশবাসীর কাছে পরিচিত হয়ে উঠে গণমাধ্যমে তার অসুস্থ কষ্টকর জীবনের করুণ কাহিনী ছাপা হওয়ার পর। নিভৃত পল্লীর এই শিশু দেড় বছর বয়সে বিরল হেমানজিওমা রোগে আক্রান্ত হলে সুচিকিৎসার অভাবে তার ডান হাত কোল বালিশের মতো ফুলে উঠে। সেই হাত বয়ে বেড়াতে তার ভীষণ কষ্ট হতো। সে স্কুলে যেতে পারতো না, কারো সাথে খেলতে পারতো না। শুধু তাই নয়, হাত থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়ার কারণে মুখ লুকিয়ে রাখতে হতো। কেউ বাড়িতে এলে রোগাক্রান্ত হাতটি সবসময় ঢেকে রাখতে হতো।
এ খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরে আসে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ দেন- মুক্তামনিকে দ্রুত ঢাকায় এনে সুচিকিৎসা দেওয়া হোক।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গত বছরের ১২ জুলাই মুক্তামনিকে প্রধানমন্ত্রী অফিসের তত্ত্বাবধানে সাতক্ষীরা থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় ঢাকায় আনা হয় এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন এন্ড প্লাষ্টিক সার্জারি ইউনিটে দেশের প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. সামন্ত লাল সেনের অধীনে ভর্তি করা হয়।
চিকিৎসকরা তখন জানান, মুক্তামনির রক্তনালীতে টিউমার হওয়ার কারণেই এমনটি হয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে রোগটির নাম হেমানজিওমা। এটি এক বিরল রোগ। তবে সুুচিকিৎসা না পাওয়ার কারণেই মুক্তামনির হাতের এরকম অবস্থা হয়েছে। হাতের সাথে সাথে তার অন্যান্য অঙ্গও আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মুক্তামনির বিরল এই রোগ আর তার পাশে প্রধানমন্ত্রী দাঁড়ানোর কারণে গণমাধ্যমে মুক্তামনিকে নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই সংবাদ প্রচার ও প্রকাশ হতে থাকে। মায়াবী চেহারার মুক্তামনি দ্রুতই সবার মনোযোগ আকর্ষণ করে। সবাই মুক্তামনির সুস্থতা কামনা করতে থাকেন। ডা. সামন্ত লাল গণমাধ্যমকে একাধিকবার বলেন, মুক্তামনিকে বাঁচাতে তারা সর্বাত্বক চেষ্টা করবেন।
গণমাধ্যমে মুক্তামনির উপর ধারাবাহিক রিপোর্ট প্রচার হতে থাকে। ১২ আগস্ট মুক্তামনির হাতে প্রথম অপারেশন করা হয়। ডা. সামন্ত লাল সেনের নেতৃত্বে অপারেশনে অংশ নেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ, অধ্যাপক সাজ্জাদ খোন্দকার, অধ্যাপক রায়হানা আওয়ালসহ অন্যরা। মুক্তামনির রোগাক্রান্ত হাত না কেটে তিন কেজি মাংস অপসারণ করেন চিকিৎসকরা। প্রথম অপারেশন শেষে মুক্তামনির সার্বিক অবস্থার বেশ উন্নতি হয়। চিকিৎকরাও আশাবাদী হয়ে উঠেন।
এরপর মুক্তামনির শরীরে আরও কয়েকটি অপারেশন করা হয়। একসময় মুক্তামনিকে সিঙ্গাপুরে পাঠানোর উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকরা সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করলে তার চিকিৎসা ঢাকা মেডিকেল কলেজেই চলতে থাকে। চিকিৎসা শুরু হওয়ার পর যেনো নতুন আশার আলো উদিত হয়। মনে আছে প্রথম দীর্ঘ অপারেশন শেষে চিকিৎসকরা বলেছিলেন, প্রথম দফায় তারা সফল হয়েছেন। ধাপে ধাপে তাদের আরও অনেক অপারেশন করতে হবে।
শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে গত ডিসেম্বরে মুক্তামনিকে এক মাসের জন্যে হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়া হয়। মেয়ে মুক্তামনিকে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান বাবা ইব্রাহীম। কিন্তু গ্রামের বাড়ি থেকে আর ঢাকায় আসতে চায়নি সে। কয়েকদিন আগে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে তাকে ঢাকায় আনার জন্যে অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো হয়। কিন্তু মুক্তামনি বাড়িতেই থাকে। খুব সম্ভবত আর কোনো কষ্ট সে বহন করতে চাইছিল না। এত ছোট্ট বয়সে কষ্ট বহন করতে করতে সে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। হয়ত মায়ের কোলেই সে মৃত্যু কামনা করেছিল।
২৩ মে সকালে আটটায় মুক্তামনির শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। মুক্তামনির মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার পর তার চিকিৎসক ডা. সামন্ত লাল সেনও ভীষণরকম বিষন্ন হন। চিকিৎসক জীবনে এরকম সংবাদ তার হৃদয়কেও চূর্ণ করে। কিন্তু নিয়তি বলে কথা।
মুক্তামনি চলে গেলেও তাকে বাঁচানোর যে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা আর মানুষের নিরন্তর ভালোবাসা-এ সমাজের কাছে বহুকাল ধরেই অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা, ডাক্তার, নার্স সবাই আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছেন তার জন্য। গণমাধ্যমের কর্মীরাও এই মেয়েটিকে বাঁচাতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন। ভালো খবর পরিবেশন করে মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছেন। এসবই অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকলো এই সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে।
মুক্তামনি আর ফিরে আসবে না, এটি চিরসত্য। কিন্তু তার কোমল ক্লান্ত মায়াবী মুখ এ দেশের মানুষের হৃদয় জুড়ে থাকবে অনেক অনেকদিন। মৃত্যু চিরসত্য হলেও সবার ভালোবাসায় সিক্ত মুক্তামনি আমাদের হৃদয়ে একখণ্ড দুঃখ হয়েই থাকলো। ভালো থেক মুক্তামনি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








