মানুষ যেখানে প্রতিনিয়ত নির্মমভাবে মারা পড়ছে, সেখানে একটা টিকটিকির জীবন কিইবা মূল্য রাখে! গতকালের তাজিয়া মিছিলের দিনে শোকাগ্রস্থ শেষ সকালে এক দৃশ্য দেখে বিস্ময় জাগল আমার নাগরিক স্বার্থপর মনে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশ পথে ‘মুক্তি ও গণতন্ত্র’র স্লোগানে নির্মিত বিশাল তোরণের নিচে এক সূফী ভাইকে দেখলাম ফুটপাতে হাত লাগিয়ে কি যেন ধরার চেষ্টা করছেন! থমকে দাঁড়িয়ে প্রত্যক্ষ করলাম একটা টিকটিকিকে হাতের তালুয় নেয়ার চেষ্টা করছেন!
উনার পায়ের জুতায় চাপ খেয়ে আহত টিকটিকিকে তিনি তুলে পাশের গাছের নিচে রেখে আসলেন। একটু দূরেই নিউমার্কেটের মোড়ে বুকে মাতম নিয়ে খালি পায়ে চলছে তাজিয়া মিছিল। এই ভাই সেখানেই হয়তো যাচ্ছিলেন। ব্যস্ততা আর স্বার্থপরতার শহর ঢাকায় এই অবিশ্বাস্য ঘটনা মনে সাময়িক সামান্য প্রশান্তি এনে দিলেও প্রতিবেশী রাষ্ট্র (?) মিয়ানমারে নতুন করে শুরু হওয়া অসহায় রোহিঙ্গা নিধনের খবর ও ছবি দেখে মনটা ভরে উঠল বেদনায়।
ছোটবেলায় গ্রামের পুকুরে গোসল করতে গিয়ে কতজনকে দেখেছি ঘাটের পাশে পানিতে পিঁপড়া ভাসতে দেখে সযত্নে হাতের তালুয় নিয়ে নিরাপদে পাড়ে রেখে দিয়েছেন। পোষা প্রাণীও যখন আঘাত প্রাপ্ত হয় কিংবা অসুস্থ হয়, আমাদের মন খারাপ হয়; আমরা প্রাণীর সেবা করি, ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমরা কি এই টিকটিকি, পিঁপড়া কিংবা আমাদের পোষা প্রাণীর চেয়েও মূল্যহীন কোন কিছু? তা না হলে এইভাবে রাষ্ট্র ও ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠরা কীভাবে সেখানে কাঠ দিয়ে, লোহা দিয়ে পিটিয়ে, আগুনে পুড়িয়ে বিনা বাধায় মানুষ মেরে ফেলতে পারে! উপরে ঈশ্বর আছেন; নিচে আছে জাতিসংঘ, মানবাধিকার কমিশন, আন্তর্জাতিক আদালত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আরব লীগ কিংবা ওআইসি। আছে বেহেশতে যাওয়ার প্রবেশপথ সৌদি আরব! আরও আছে বাংলাদেশের ‘হেফাজতে ইসলাম’ কিংবা ‘হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ’।
কেউ কোনো কিছু করে না কেন? কারও মন কি কাঁদে না? গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ‘সোল এজেন্ট’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা শান্তিতে নোবেল জয়ী মায়ানমারের ‘গণতন্ত্রের লিডার’ অং সান সুচি অথবা ‘সামাজিক ব্যবসা’ করে নাম কামানো আমাদের ডক্টর ইউনুস, তারাই বা কী করছেন? যুদ্ধাপরাধী জামাতকে বাঁচানোর জন্য পাকিস্তান আছে, তুরস্ক আছ; হিন্দুদের হয়ে কথা বলার জন্য আছে ভারত, ইহুদিদের জন্য আছে ইসরায়েল তথা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র; কিন্তু মজলুম রোহিঙ্গাদের জন্য বলার কে আছে? আছেন কেউ? থাকলে আওয়াজ দিন। প্রতিবাদ করেন, মিয়ানমারের পিশাচ সরকারকে চাপ প্রয়োগ করেন। থামাতে বলুন এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস।
সব জাতি মুক্তিদাতা লিডার পায় না। আমাদের পূর্ববঙ্গের মানুষের মুক্তির জন্য যেমন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নামের লিডার এসেছিলেন, মায়ানমারের রোহিঙ্গা, মধ্যপ্রাচ্যের ফিলিস্তিনি কিংবা কাশ্মীরের মুজলুম মানুষের জন্য এমন কেউ আসেনি, আসবে কিনা জানি না। কিন্তু এখনতো মানব সমাজ নিজেদের যেকোন সময়ের চাইতে সভ্য বলে দাবি করে। রাজতন্ত্র কিংবা সামন্তবাদের যুগ পেরিয়ে মানব সমাজ এখন নাকি ‘গণতন্ত্র’ এবং ‘মানবাধিকার” এর চর্চা করছে? সাম্যবাদ নাকি মানুষের সমস্ত বৈষাম্য আর নিপীড়নের অবসান ঘটিয়ে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে! তাহলে “সাম্যবাদী” চীনের লাই পেয়ে পাশের দেশ মায়ানমার এতটা অসভ্য ও হৃদয়হীন কীভাবে হল? কী করা যায় রোহিঙ্গা মুসলিমদের জন্য? কিছু কি করা যায়?
এক পারা যায়, মিয়ানমারের সব মুসলিমকে বাংলাদেশে নিয়ে এসে থাকতে দেয়া! কিন্তু এটা না সম্ভব, না উচিত। শুধুমাত্র ধর্মের মিল থাকলেই কারও সাথে থাকা যায় না, কাউকে নিজের ঘরে আনা যায়না। এর বড় প্রমাণ ১৯৭১ সাল। পাকিস্তানীরা কি অবলীলায়, কী পাশবিকতায় না এদেশে মানুষ মেরেছে! ২৪ বছর এদেশের সম্পদ নিয়ে তাদের উন্নয়ন করেছে। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের জন্য পরদেশও নয়। মিয়ানমার তাদের মাতৃভূমি, সেদেশের আলো, বাতাস, পানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যে রোহিঙ্গাদের সমান অধিকার। সাম্প্রদায়িক, মানবিকতাহীন সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের সাথে তাদের একটাই পার্থক্য, রোহিঙ্গাদের নাক চ্যাপ্টা নয় আর শাস্ত্রীয় ধর্ম তাদের ইসলাম। তারা কথাও বলে নিজস্ব ভাষায়। কী করা যায় এদের জন্য?
ভারত যেমন ১৯৭১ সালে আমাদের কে আশ্রয় ও অস্ত্র দিয়ে, যুদ্ধ প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাধীনতা অর্জনে সাহায্য করেছিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন যেমন জাতিসংঘে ভেটো দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহর আটকে দিয়েছিল, পাকিস্তানের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন থাকেলও আমাদের এবং ভারতের মুক্তিযোদ্ধারা মিলে যেমন পাকিস্তানকে পরাজিত করেছিল, এমন কোন কিছু রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে হবেনা, সেটা বলে দেয়া যায়। পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে আমাদের যে জিওগ্রাফিকেল দূরত্ব ছিল সেটাও আমাদের যুদ্ধ জয়ে সহায়তা করেছিল। আমাদের দরকার ছিল স্বাধীনতা, ভারতের দরকার ছিল নিরাপদ প্রতিবেশী। এইরকম দুইয়ে দুইয়ে চার রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে হবেনা। মিয়ানমারের বর্বর সরকারের সবচেয়ে বড় আশ্রয় চীন। চীন এখন বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতি। চীনের সেনাবাহিনী, অস্ত্রকে ভয় পায় না এমন কোন রাষ্ট্র পৃথিবীতে নাই।
ভারতের অনেক জায়গা চীন দখল করে রেখেছে, ভারত কিছুই করতে পারছেনা। যাইহোক, রোহিঙ্গাদের জন্য বাইরে থেকে সামরিক সহায়তা আসবে, এ কথা ভাবা ঠিক হবে না। রোহিঙ্গাদের নিজেদের কোনো বড় লিডারও নেই যে নিজেদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করবেন। যেমনটা বঙ্গবন্ধু আমাদের জন্য করে গেছেন। বঙ্গবন্ধুর সাথে তাজউদ্দীনের মত সহকর্মী ছিলেন, বাঙ্গালীর নিজস্ব ভাষা, গান, কবিতা ছিল; আর ছিল সাত কোটি সাহসী বাঙ্গালী ও কয়েকটি অবাঙ্গালী স্থানীয় জাতিগোষ্ঠী। অন্যদিকে রোহিঙ্গারা খুব গরীব, খুব দুর্বল, অসহায়। এরা সামরিক, সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিকভাবে নিজেরা কিছু করতে পারবেনা।
পুরো বিষয়টি বেসামরিক রাজনৈতিক পদ্ধতিতে সমাধান করতে হবে। কিন্তু মিয়ানমারের সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অধিকাংশ এতটাই হৃদয়হীন, অসভ্য যে এদের সাথে কথা বলতে গিয়ে কোন কাজ হবে না। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের লোকজন পর্যন্ত রোহিঙ্গা নিধনে অংশ নেয়, বক্তৃতা করে গণহত্যায় উস্কানি দেয়। ‘জীব হত্যা মহাপাপ’ বলে মহামানব গৌতম বুদ্ধ আমাদের যা প্রেমের তালিম দিয়েছেন, মিয়ানামারের রোহিঙ্গাদের বেলায় তা খাটে না। কয়েকদিন আগে কফি আনান সাহেব এসেছিলেন মিয়ানমারে। উনার কালো মুখ আরও কালো করে ছেড়েছে মিয়ানমারের আর্মি, পুলিশ আর সাম্প্রদায়িক লোকজন। জাতিসংঘ কিছু করতে পারবেনা। জাতিসংঘ কিছু করতে পারলে, আমাদের বঙ্গদেশে লাখ লাখ রোহিঙ্গা এত বছর ধরে থেকে বংশবৃদ্ধি করতে পারত না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ভারতও কিছু করবেনা। যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারে চীনা প্রভাব কমাতে, এই অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে অং সান সুচির মুখ দিয়ে গণতন্ত্রের গান শোনাচ্ছে।
সবাই তার নিজের স্বার্থই দেখবে। ভারত ইসরাইলের সাথে পর্যন্ত সুন্দর সম্পর্ক রেখে চলেছে। আমার মতে একমাত্র চীন এক্ষেত্রে সত্যিকারের কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এখন চীনকে বোঝাবে কে? চীনকে বাধ্য করা যাবেনা। বুঝিয়ে মন জয় করতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের বাংলাদেশ ভাল ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ থেকে উচ্চপর্যায়ের সরকারি-বেসরকারি প্রতিনিধি দল মিয়ানমারে গিয়ে, চীনে গিয়ে, তাদেরকে বাংলাদেশে দাওয়াত দিয়ে এনে নিজেদের উদ্বেগ, মায়ার কথা বলতে পারেন। বিশেষ করে বাংলাদেশে যে বৌদ্ধ ধর্মের লোকজন আছেন তারাও বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। এত নিষ্ঠুরতা সহ্য হয় না। আমাদের ভান্তেদের একটা দল শুধু রোহিঙ্গাদের জন্য কথা বলতে মিয়ানমার এবং চীনে যেতে পারেন। মিয়ানমার মধ্যপ্রাচ্য নয়, আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী। মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের সমস্যা থেকে ইচ্ছে করলেই যে আমরা দূরে থাকতে পারবনা, তার প্রমাণ পার্বত্য চট্টগ্রামে লাখ লাখ রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ এবং ক্যাম্প করে মানবেতর জীবন-যাপন। আর এদেশের ‘ইসলাম’র নামে অপকর্ম করার লোকজন তো আছেই।
চীন কেন আমাদের কথা শুনবে? চীন শুনবে, কারণ বাংলাদেশ কে ঘিরে চীনের বিশাল অর্থনৈতিক, এমনকি রাজনৈতিক স্বার্থ আছে। চীন এদেশে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করছে, করবে এবং দিন দিন বাড়বে চীনের বিনিয়োগ। এ অঞ্চলে মার্কিন আধিপত্য ঠেকাতে হলে বাংলাদেশ কে চীনের চাই। আমরা রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্যের দায়িত্ব নিতে না পারি, তাদের কোনমতে জান নিয়ে বেঁচে থাকার নিমিত্তে কাজতো করতে পারি।
(এ
বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর
সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








