বহু বছর আগের কথা। সামরিক শাসক এরশাদ তখন দেশের রাষ্ট্রপতি। বিটিভিতে সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছিলো নতুন কুড়ির পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। দর্শক সারিতে বসে রাষ্ট্রপতি কাঁদছেন একজন শিশু শিল্পীর আবেগঘন অভিনয় দেখে। রুমালে চোখ মোছার তার সে দৃশ্যটি সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
কেউ কেউ এরশাদের কোমল মনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেও নিন্দুকের সংখ্যা নেহায়েত কম ছিলোনা সে ঘটনায়। বিষয়টিকে বাকা চোখে যারা দেখছিলেন তাদের সোজা সাপটা কথা, শিশুটির চেয়ে কোন ভাবেই দুর্বল অভিনেতা নন হুসেইন মোহাম্মাদ এরশাদ।
অভিনেতা নাকি নেতা, কে ভালো অভিনয় জানেন? কোন কোন অভিনেতার কাঁদতে গ্লিসারিন লাগাতে হয় চোখে। যারা সুঅভিনেতা ও চরিত্রে ঢুকে যেতে পারেন তাদের ক্ষেত্রে ভিন্ন কথা। তবে নেতা বা রাজনীতিকের কাঁদতে গ্লিসারিন প্রয়োজন হয়না, এরশাদের কান্না দেখা অনেকেই দাবি করতে শুরু করেছিলেন।
এত বছর পর কারো কারো এরশাদের ঘটনা মনে পড়তে পারে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগিরের কান্নার দৃশ্য দেখে। সম্প্রতি ঢাকা রিপোর্টারস ইউনিটিতে এক আলোচনা সভায় তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছেন এমন দৃশ্য টেলিভিশনগুলো দেখিয়েছে। সংবাদপত্রে এসেছে সচিত্র খবর।
হটাৎ করে কাঁদলেন কেন দেশের একটি বড় রাজনৈতিক দলের মহাসচিব? নিজের দলের নেতা কর্মীদের দুর্দশার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলছিলেন, দেশে এখন একনায়কের স্বৈরশাসন চলছে, বিরোধী মতকে দমন করতে রাতের আঁধারে সাদা পোশাকধারীরা ঘর থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে মানুষ। প্রতিনিয়ত খালি হচ্ছে মায়ের বুক, কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না সুবিচার। একপর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি এবং কান্না শুরু করেন বলে প্রায় সবগুলো সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগিরের সারাদেশে উজ্জ্বল ভাবমূর্তি আছে। বিএনপির নেতা কর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষের কাছে ভদ্রলোক ইমেজ আছে তার। এই কান্নার সাথে এরশাদের কান্নার তুলনাও অনেকের কাছে পছন্দনীয় না হতে পারে। তবে বাঁকা চোখে দেখার মত লোকের সংখ্যা একেবারে কম থাকার কথা নয়। আবার সরকারী দলের নেতারা সহ অনেকের কাছেই বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়েছে যে তিনি তার দলের নেতা কর্মীদের বর্তমান দুঃসহ দিনাতিপাত দেখে আপ্লুত হয়েছেন গাঢ় বেদনায়। এবং এতে কোন ভণ্ডামি নেই। যারা এমনটি ভাবছেন, তাদের অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার কোন উদ্দেশ্যেও এ আলোচনার সূত্রপাত নয়।
লক্ষণীয় যে, মির্জা ফখরুলের বক্তব্যের মুল পয়েন্টটি হচ্ছে সারাদেশে তাদের নেতা কর্মীদের বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া নিয়ে। তিনি যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির অবতারনা করে চোখের জল ফেলেছেন ঠিক একই কারনে অসংখ্য মানুষও বছরের পর বছর ধরে এদেশে চোখের জল ফেলেছেন। রাজনৈতিক দলের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিবার ছাড়াও রাজনীতির সাথে একেবারেই সংশ্লিষ্টতা নেই এমন পরিবারের সদস্যরাও স্বজন হারিয়ে কেঁদে কেঁদে চোখের জল শুকিয়েছেন, নজির আছে। স্বজন হারানোর বেদনা কত নির্মম তা অনুভব করতে পারেন কেবল ভূক্তভূগিরাই।
মির্জা ফখরুলের এবারের বক্তব্যটি দেশের নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার হরণ করে সংঘটিত বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে। এর জন্য তিনি প্রশংসার স্রোতে ভেসে যাচ্ছেন। এই আবেগঘন কান্না, অগনিত মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে। আইনের শাসনে বিশ্বাসী মাত্রই মানবাধিকারের পরিপন্থী হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করবেন, স্বাভাবিক। যেমনটি তারা অতীতেও করেছিলেন যখন মির্জা ফখরুলদের শাসনামলে এসব হত্যাকাণ্ডের সূচনালগ্নে। তখন কি মির্জা ফখরুলরা স্বপ্নেও ভেবেছিলেন তাদেরও এমন পরিস্থতির সামনে দাঁড়াতে হবে?
২০০১ সালে বিএনপি- জামাত জোট ক্ষমতায় এসেই ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ নামের অভিযান দিয়ে এদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড শুরু করে গণতন্ত্রের নবযুগে। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের দিয়ে পরিচালিত এই অভিযানে সারাদেশে ব্যাপক আতংক ছড়িয়ে পড়েছিলো।
এই অভিযানে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদেরও সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে হত্যা করা হয় কথিত সন্ত্রাসীদের সাথে এমন অভিযোগ তখনকার বিরোধীদল আওয়ামী লীগ করেছিলো। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুর গল্প সংবাদপত্রের পাতায় স্থান পেয়েছিল প্রতিদিন। মুম্বাই’র রাম গোপাল ভার্মা বা সঞ্জয় গুপ্তার সিনেমার গল্পের মত করে বানানো কাহিনী জনগণ বিশ্বাস করেছিল কি না শাসকগোষ্ঠীর কি ভাববার সময় হয়েছিলো একবারও?
অপারেশন ক্লিন হার্ট নামের এই হত্যাযজ্ঞকে জাতীয় সংসদে দায়মোচন দেয় বিএনপি জামাত জোটের সরকার। ৭৫’র পর যেভাবে জাতির জনক ও তার পরিবারের সদস্যদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছিল ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে।
একই সরকার ২০০৩ সালে র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) গঠন করে ১৯৭৯ সালের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অধ্যাদেশ সংশোধন করে। পুলিশ, সেনা, নৌ, বিমান বাহিনীর সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করে চৌকস এ বাহিনী গঠন করার উদ্দেশ্যে বলা হয়েছিল সন্ত্রাসীদের ধরে বিচারের মুখোমুখি করা। জনগণ আশাবাদী হয়েছিল। সন্ত্রাস ও জঙ্গি নির্মূলে র্যাবের সাফল্য যেমন উল্লেখ করার মত তেমনি শুরু থেকেই এই বাহিনীকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করতে পারবেন কি মির্জা ফখরুল বা তার দলের কেউ?
২০০৪ সালে ঢাকার উত্তরায় শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হান্নানকে গ্রেফতারে পরিচালিত প্রথম অভিযানে ক্রস ফায়ারের সূচনা হয়। ঐ অভিযান ও ক্রস ফায়ারের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে শোনা যায়নি, কারণ আশপাশের অধিবাসীরা দু’ পক্ষে প্রচুর গুলি বিনিময়ের শব্দ শুনেছিলেন যা সংবাদপত্রে বলা হয়েছিল। পরবর্তী সকল ক্রস ফায়ার নিয়ে জনমনে সন্দেহ ও অবিশ্বাস বাড়তে থাকে। সচেতন জনগণের কেউই একে ক্রসফায়ার না মেনে এনকাউন্টার বলাকেই যথাযথ মনে করেন। বিএনপির পুরো শাসনকালে র্যাব ও পুলিশের ক্রস ফায়ারের সংখ্যা গুনলে গা শিওড়ে উঠবে যে কোন বিবেকবান মানুষের।
২০০৯ এ আওয়ামীলীগের নির্বাচনী ইস্তেহারে সকল প্রকার বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের অঙ্গীকার ছিল। ক্ষমতা গ্রহণের পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সরকার তা পুরোপুরি বন্ধ করতে সক্ষম না হলেও ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত অনেকটা কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে এনেছিল যা ওই ক’ বছরের সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংখ্যা থেকে ধারণা পাওয়া যায়।
যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ও সাজাপ্রাপ্ত জামাত নেতাদের বিচার ভণ্ডুল করতে সারাদেশে জামায়াত শিবির কর্মীদের সন্ত্রাস, ২০১৪ এর নির্বাচনে বিএনপি জোটের বর্জন ও নির্বাচন ঠেকানোর নামে সারাদেশে সৃষ্ট সন্ত্রাস ও নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে লাগাতার পেট্রোল বোমায় পুড়িয়ে নারী শিশু হত্যার মত ঘটনা এতই ভয়াবহ রূপ ধারন করে, যা দমনে আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী বিএনপি আমলে শিখিয়ে দেয়া পুরনো পথে হাঁটতে শুরু করে। এমন ভয়ংকর পরিস্থিতিতে নিজেদের নিরপত্তা ও বেঁচে থাকার অধিকারের জন্য বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে মানুষ নিরবে গ্রহণ করেছিল বলে অনেকের দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে। যেমনটি বর্তমানে জঙ্গি দমনে পরিচালিতঅভিযান ও এনকাউন্টারকে সারাদেশের মানুষ সাদরে গ্রহণ করেছে। এক্ষেত্রেও মির্জা ফখরুলের দলের ভুল রাজনীতিকে দায়ী করেছেন অনেকে, যার কোন রকম অনুশোচনা তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছেনা এখনো।
সরকার সিদ্ধান্ত নিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ক্রস ফায়ার ছাড়া অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে তেমন বিশ্বাস জনগণের মধ্যে জোরালো হওয়ার কারণ আছে। ২০০৬ সালে জেএমবি’র বিরুদ্ধে পরিচালিত শ্বাসরুদ্ধকর ‘অপারেশন মুক্তাগাছা’ এবং ‘অপারেশন সূর্যদীঘল বাড়ি’ এর উদাহরণ সেই বিশ্বাসকে আরো শক্ত ভিত্তি দেয়। এ দুটি অপারেশনের মাধ্যমে জেএমবির শীর্ষ দুই নেতা শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাইকে গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করে র্যাব। এ দুটি ঘটনা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে বিএনপি জোট আমলের সকল বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে।
ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৩(২) অনুচ্ছেদ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৬১ ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে আইনজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীরা বলে আসছিলেন। বিচারবহির্ভূত এমন হত্যাকাণ্ডের জন্য অনুরূপ অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে তখনো ছিল, রয়েছে এখনো। কিন্তু মির্জা ফখরুলের সরকার কোন কিছুতেই ভ্রুক্ষেপ করেনি। এখন যেমন ভ্রুক্ষেপ না করার অভিযোগ আছে তখনকার ভূক্তভুগি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে, যারা বর্তমানে দেশ শাসন করছে। এভাবেই ক্রিয়ার বিপরীতে প্রতিক্রিয়া কি চলতে থাকবে? এর শেষ কোথায় কেউ কি জানেন?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







