মানবজাতির সামনে একটি বড় ধাক্কা হিসেবে সম্প্রতি হাজির হয়েছে করোনা ভাইরাস। বিশ্বজুড়ে তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে প্রাণঘাতী এই ভাইরাস। বহু মানুষের প্রাণ কেড়ে নেবার পাশাপাশি এই ভাইরাস প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে নানা ‘শিক্ষা’ দিয়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। সে আলোচনায় সরাসরি যাবার আগে করোনার প্রেক্ষাপটটা একটু বুঝে নেয়া দরকার।
চীনের উহান শহরে একটি সি ফুড মার্কেট থেকে করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি বলে এখন পর্যন্ত বলা হয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় আক্রান্ত ও মৃতরা সবাই ওই বাজারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। গত ১ জানুয়ারি এই বাজারটি বন্ধ করে দেয়া হয়। তবে এরপরে শুধুমাত্র উহান বা চীনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি করোনা ভাইরাস। চীনে ভ্রমণ নয়তো চীন থেকে অন্যদেশে ভ্রমণের মাধ্যমো করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে গেছে বলে দাবি করা হলেও কিছু কিছু দেশে আক্রান্তদের সঙ্গে আগেপিছে চীনের কনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না বলেও জানা গেছে। নানা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব থেকে শুরু করে মানবসৃষ্ট দুর্ঘটনা বলেও অনেক অনুমান ভিত্তিক তথ্য নেটদুনিয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে।
করোনা ভাইরাস এমন একটি সংক্রামক ভাইরাস, যা এর আগে কখনো মানুষের মধ্যে ছড়ায়নি। ভাইরাসটির আরেক নাম ২০১৯ – এনসিওভি বা নভেল করোনা ভাইরাস। এটি এক ধরণের করোনা ভাইরাস। করোনা ভাইরাসের অনেক রকম প্রজাতি আছে, কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ছয়টি মানুষের দেহে সংক্রমিত হতে পারে। তবে নতুন ধরণের ভাইরাসের কারণে সেই সংখ্যা এখন থেকে হবে সাতটি।
২০০২ সাল থেকে চীনে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া সার্স (পুরো নাম সিভিয়ার এ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) নামে যে ভাইরাসের সংক্রমণে পৃথিবীতে ৭৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল আর ৮০৯৮জন সংক্রমিত হয়েছিল। সেটিও ছিল এক ধরণের করোনা ভাইরাস।
কীভাবে ছড়ালো করোনা ভাইরাস?
যে কারণেই হোক, ভাইরাসটি ছড়িয়ে গেছে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ভাইরাসটি কীভাবে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়লো, একনজরে সে তথ্য দেখে নেওয়া যাক।
ডিসেম্বর ৮, ২০১৯: উহানে করোনা ভাইরাসের লক্ষণের প্রথম রোগী দেখা যায়।
ডিসেম্বর ৩১, ২০১৯: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হু’র কাছে ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর তথ্য আসতে শুরু করে।
জানুয়ারি ১, ২০২০: উহানের সামুদ্রিক ও বন্যপ্রাণীর বাজার থেকে ভাইরাসটি ছড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জানুয়ারি ৭, ২০২০: চীনের বিজ্ঞানীর নতুন ভাইরাসটির প্রথম রোগজীবাণু শনাক্ত করতে সক্ষম হন।
জানুয়ারি ৯, ২০২০: করোনা ভাইরাসে প্রথম রোগীর মৃত্যু হয়।
জানুয়ারি ২০, ২০২০: উহানের বাইরে বেইজিং ও শেনজেনে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
জানুয়ারি ২৩, ২০২০: উহানে বিভিন্ন পরিবহন বন্ধ করে দেওয়া হয়। একইসঙ্গে বিভিন্ন শহরে লোকজন প্রবেশ ও বের হওয়া নিয়ন্ত্রণ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। যার ফলে প্রায় ৬ কোটি লোক ‘কার্যত অবরুদ্ধ’ হয়ে পড়েন। এ সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য আসতে শুরু করে। আর বলা হয়, আক্রান্তরা সম্প্রতি উহান ভ্রমণে গিয়েছিলেন। তবে এ সময় পর্যন্ত হু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেনি।
জানুয়ারি ২৮, ২০২০: মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে করোনা ভাইরাসে শতাধিক রোগীর মৃত্যু হয়। আর ভাইরাসে শুধুমাত্র চীনের মূল ভূখণ্ডে আক্রান্তের সংখ্যা ২০০৩ সালের সিভিয়ার অ্যাকচু রেসপিরেটরি সিনড্রোম বা সার্স রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়ে যায়।
জানুয়ারি ৩০, ২০২০: এ পর্যায়ে বিশ্বব্যাপী জরুরি স্বাস্থ্য ঘোষণা করে হু।
ঘটনাপ্রবাহে এরপর থেকেই হু হু করে বাড়তে থাকে করোনা আক্রান্তের ঘটনা ও মৃত্যু হয় বহু মানুষের। এখন পর্যন্ত (১০ মার্চ) করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে ১১৩টি দেশ ও অঞ্চল। আর ১ লাখ ১৪ হাজার ৪১৬ জন এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছে ৪ হাজার ২৬ জন।
শুধুমাত্র চীনের মূল ভূখণ্ডেই করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৮০ হাজার ৭৫৪ এবং মৃত্যু হয়েছে ৩ হাজার ১৩৬ জনের। চীনের বাইরে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ইতালিতে। দেশটিতে এই ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৯ হাজার ১৭২ এবং মৃত্যু হয়েছে ৪৬৩ জনের। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে ৭ হাজার ৫১৩ জন। আর মৃত্যু হয়েছে ৫৪ জনের। এমন পরিস্থিতিতে জরুরি অবস্থা জারি করেছে দেশটির সরকার। আর ইরানে এখন পর্যন্ত ৭ হাজার ১৬১ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে এবং মারা গেছে ২৩৭ জন।
করোনার প্রভাব ব্যবসা-বাণিজ্যে ও বিভিন্ন খাতে
করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে ধস, ট্যুরিজম-এভিয়েশন খাতে স্মরণকালের আকস্মিক আর্থিক ক্ষতি ডেকে এনেছে ওই ভাইরাস। চীনসহ বিশ্বের অনেক দেশ কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে আছে। করোনা আতঙ্কে বহু মানুষ তাদের বৈশ্বিক সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে আক্রান্ত দেশগুলোর সাথে। উৎপাদন ভিত্তিক বিভিন্ন শিল্প-কারখানা বেশ মন্দাভাবের দিকে যাচ্ছে বলে সাবধান করে নানা প্রতিবেদন-গবেষণা প্রকাশ হতে শুরু করেছে গণমাধ্যমে। সব মিলিয়ে এক বড় ধরণের নেতিবাচক লক্ষ্যের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে পুরো বিশ্ব।

করোনাতে কীভাবে মারা যায় মানুষ?
করোনা ভাইরাস সাধারণ মানুষকে ঠান্ডাজনিত রোগে ভোগায়। তবে করোনা ভাইরাসের মধ্যে শ্বাসকষ্টজনিত সিভিয়ার অ্যাকুয়েট রেসপিরেটরি সিনড্রোম (সার্স) ভাইরাস মৃত্যুর কারণও ঘটায়।
ভাইরাসের ব্যাপারে সতর্ক করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘অরক্ষিত’ অবস্থায় প্রাণীদের সরাসরি সংস্পর্শে না যেতে পরামর্শ দিয়েছে। আর মাংস ও ডিম ভালোভাবে রান্না করে খেতে বলেছে। পাশাপাশি ঠান্ডা বা জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তির খুব কাছাকাছি না যেতেও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভাইরাসটিতে সংক্রমণের লক্ষণ হচ্ছে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা, জ্বর, কাশি, ঘন ঘন নিশ্বাস নেওয়া ও নিশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া।
জ্বর দিয়ে ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়, এরপরে শুকনো কাশি দেখা দিতে পারে। প্রায় এক সপ্তাহ পরে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যায়। অনেক রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দিতে হয়। আক্রান্ত হওয়া মানেই মৃত্যুবরণ নয়, আগে থেকেই নানা স্বাস্থ্য সমস্যা ও বেশি বয়সীদের ঝুঁকি একটু বেশি থাকলেও চীনসহ সারাবিশ্ব আক্রান্তদের বেশির ভাগই সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরে গেছেন। কাজেই হতাশ হবার বা আতঙ্কিত হবার কিছু নেই বলে চিকিৎসকরা ধৈর্য্য ধরে চিকিৎসা নেবার পরামর্শ দিয়েছেন। আবার আক্রান্তের অনুপাতে কম মৃত্যু বলেও নিশ্চিন্ত থাকার কোনো কারণ নেই। আপাতত চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে চলা উচিত সবার। অনেক দেশের বিজ্ঞানীরা এই ভাইরাসের প্রতিষেধক তৈরি দ্বারপ্রান্তে বলেও আশার বাণী শুনিয়েছেন।
পরিত্রাণ কী, কী শিক্ষা দিচ্ছে করোনা ভাইরাস?
কয়েকদশক ধরে কার্যত উন্মাদের মতো ছুটে চলেছে পৃথিবীর মানুষের জীবন আর কর্মযজ্ঞ। নিজেদের প্রয়োজনে আমরা, এই মানুষেরা প্রকৃতি-পরিবেশ ও জীবনাচারের ঠিক-বেঠিক প্রায় ভুলতেই বসেছি। চাই শুধু উন্নতি-অগ্রগতি আর নিজেদের হিসেবে ‘যা ভাল মরে করি, তাই’। মানুষের ভাবখানা এমন, পৃথিবীর যেনো ক্লান্তি নেই, বিশ্রাম নেই। প্রকৃতির কোনো চাহিদা নেই, পরিবেশের কোনো নিরবতা প্রয়োজন নেই। যুদ্ধ-বিগ্রহের পাশাপাশি নানা সামাজিক-মানবিক বিপর্যয় নেতিবাচক দিকে টেনে নিয়ে গেছে অধিকাংশ মানব জাতিকে।
লেখার শিরোনাম দেখে হয়তো অনেক পাঠকের কৌতুহল বেড়ে গেছে, আসলেই কি করোনা কোনো শিক্ষা দিচ্ছে মানবজাতিকে? এই প্রশ্নের জবাব সরাসরি হয়তো কারো কাছে নেই, তবে অনুমান ভিত্তিক কিছু বললে কারো বিশ্বাস হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। তবে যদি বলার জন্য বলা হয়, তাহলে মানব জাতিকে ‘শিক্ষা’ দেবার বিষয়ে পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাটপ অনুসারে আমরা কিছু পয়েন্ট খুঁজে পাওয়া যাবে।
১. করোনা আমাদের পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে শেখাচ্ছে। ব্যক্তিগত থেকে শুরু করে গোষ্ঠিগত পরিচ্ছন্নতা খুবই জরুরি তা সবাই বুঝতে পারছি। ‘আমি ভাল থাকলেই সবঠিক’, এইরকম ভাবনা ভুল প্রমাণিত করছে।
২. বিশ্বের সব দেশগুলোর সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট একে অন্যের সাথে জড়িত এটা প্রমাণ করে দিচ্ছে করোনা ভাইরাস। চীন-যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ ভাল থাকলেই পুরো বিশ্বই ভাল থাকবে না, আফ্রিকা-এশিয়ার ক্ষুদ্র দেশগুলোকেও ভাল থাকতে/রাখতে হবে এবং তাদের পছন্দ/চাহিদার উপরে উন্নত দেশগুলোর উন্নত থাকার প্রক্রিয়াও জড়িত। আমরা এই পৃথিবীতে একে অন্যের সাথে কতোটা জড়িত, এই বৈশ্বিক ইকো-সিস্টেম চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে করোনা ভাইরাস।
৩. পরিবেশ-প্রতিবেশ ও প্রাণীকূলের ভারসাম্যের বিষয়টি সামনে চলে এসেছে এই করোনা ভাইরাসকে কেন্দ্র করে। চীনাদের খাদ্যাভাস ও বিলুপ্ত হতে বসা বিভিন্ন প্রাণীদের নাম জানতে শুরু করেছে পুরো বিশ্ব। প্রকৃতি নিজ নিয়মে তার প্রতিশোধ নিয়ে যাচ্ছে বলে অনেকে মন্তব্য করতেও শুরু করেছেন। এই বিষয়টিও শিক্ষনীয়।
৪. শেষের পয়েন্টটি একান্তই নিজস্ব ভাবনা। ধরলাম, আমার একটি গাড়ি আছে যা আমি দিনে ১০/১২ ঘন্টা ধরে ৭দিন ব্যবহার করি। একটা নির্দিষ্টসময়ে ওই গাড়ির কিছু যন্ত্রাংশ বিকল হবে, নয়তো তা সার্ভিসিং চাহিদা তৈরি হবে। বাধ্যহয়ে আমাকে যন্ত্রাংশ বদলাতে হবে, নয়তো সার্ভিসিংয়ের জন্য গ্যারেজে পাঠাতে হবে। গ্যারেজে থাকাকালীন সময়ে গাড়িকে কেন্দ্র করে আমার টাকা খরচ হবে, আমার ও পরিবারের সবার স্বাভাবিক রুটিন ব্যাহত হবে। আমাদের মানবজাতির একমাত্র বাসযোগ্য গ্রহ হচ্ছে এই পৃথিবী, যা আসলে আমার ওই গাড়ির মতো বহুল ব্যবহার-অপব্যবহারে কিছুটা বিগড়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। তাই হয়তো করোনা ভাইরাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাধ্যমে পৃথিবী নিজে থেকেই কিছুটা সার্ভিসিং/বিরতি চেয়ে নিয়েছে/নিচ্ছে অনেকটা বিরক্ত-ক্লান্ত হয়ে। মানবজাতির সামনে এসব প্রাকৃতিক আপদকে বড় শিক্ষা বললে খুব একটা ভুল হবে না!
বর্তমান পরিস্থিতিতে সাবধান হওয়া ও ‘সবকিছুরই শেষ আছে’ ধরে নিয়ে আশাবাদী হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে চিকিৎসক-বিজ্ঞানীরা হয়তো খুব দ্রুতই কিছু একটা বের করে ফেলবেন, তবে একমাত্র বাসযোগ্য পৃথিবীকে সুন্দর-নিরাপদ রাখতে আমাদেরও যে অনেক কিছু করণীয় আছে তা মনে রাখতে হবে আমৃত্যু। হোক তা নিজের জন্য, প্রজন্মের জন্য ও মানবজাতির জন্য।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








