মাও সেতুং বলতেন, বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস। আরও বলতেন, গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও করো। জামায়াত জঙ্গিরা রাজপথের লড়াইয়ের যোগ্যতা হারিয়ে যেনো মাও সেতুংয়ের সেই বলপ্রয়োগের থিওরিটিকেই অনুসরণ করে চলছে। রাজপথে ও লোকালয়ে বোমা মেরে জানমালের ক্ষতির লাইন বাদ দিয়ে তারা এখন আত্মঘাতী গুপ্ত হামলার লাইনে অগ্রসর হচ্ছে।
কোন দলের ভেতরে জঙ্গি আছে, কোন প্রশাসনের ভিতরে জঙ্গি আছে তা এখন আর বোঝারই সুযোগ নেই। পরিবারই জানতে পারছে না যে তার পরিবারে জঙ্গি আছে। গুলশান হামলার সাথে জড়িতদের মাঝে আওয়ামী লীগ নেতার সন্তানও রয়েছে।
জন্মের পর হতে যে শিশুটি যে মা বাবার আদর স্নেহে বেড়ে ওঠে, ঘুমায় মায়ের কোলে, ঘুম ভেঙ্গে দেখে বাবার মুখ। যার খাবার খেয়ে সে বেড়ে ওঠে। যার কেনা প্যান্ট শার্ট পরে বাইরে বেরোয়। যার টাকায় কেনা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে বন্ধুদের সাথে কথা বলে। অসুখ হলে যার টাকায় তার ওষুধ ও পথ্য কিনে। এক ঘর, এক খাটে ঘুমায়, এক বাথরুমে শৌচ কর্ম করে। তবু ছেলে এতবড় জঙ্গি হয়ে যায় অথচ বাবা মা কিছুই টের পায় না। এটা বিশ্বাস হওয়া খুবই দুঃখজনক।

কারা তাকে এত বড় জঙ্গি হওয়ার মন্ত্র শেখালো। ছেলের এই জঙ্গি সাহচর্য সম্পর্কে জানতে পরিবার ছাড়া গুরুত্বপূর্ন তথ্য ও তত্ত্বপ্রাপ্তির সোর্স আর কি হতে পারে? আমরা জানি অধিকাংশ শিশুরাই বাবা মার রাজনৈতিক মতাদর্শ অনুসরণ করে। বাবা আওয়ামী লীগ হলে সন্তান আওয়ামী লীগ হবে, বাবা বিএনপি হলে সন্তান বিএনপি হবে, বাবা জামায়াত হলে সন্তান জামায়াত হবে এমনটিইতো হওয়ার কথা।
যেমন একটা মানব শিশু যদি জন্মচিৎকারের পর হতে বন মানবীর কাছে লালিত পালিত হয়; তাহলে মানব শিশুটির মধ্যে বন মানব কিংবা বনমানবীর বৈশিষ্ট্যই ফুটে উঠবে। কিন্তু এদেশে কী হচ্ছে! বাবা আওয়ামী লীগ ছেলে জঙ্গি। এ ব্যর্থতার দায় কি বাবার নয়?
আজো গ্রামদেশে জ্বীন ভূত ছাড়াতে কবিরাজেরা সরিষার তেল ব্যবহার করে। আশ্রিত মানব অথবা মানবীর চোখে মুখে সরিষার তেল ছিটিয়ে দেয় তারা। কিন্তু ছিটানো সরিষার তেলের শিশিতেই যদি কোন জ্বীন ভূত থাকে তাহলে আর কি করতে পারবে কবিরাজ।
জঙ্গিবাদ একটি অপ্রকাশ্য অপশক্তি হিসেবে বাংলাদেশের সর্বশ্রেণীতে মিশে যাচ্ছে। দল, প্রশাসন, এনজিও ব্যাংক, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, শহর, বন্দর, গাঁয়ে সর্বত্রই তারা নানান ছদ্মবেশে বিরাজমান। আগে জানতাম মাদ্রাসাগুলো জঙ্গি তৈরীর কারখানা এখন দেখছি শুধু তা-ই নয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও তা বিরাজমান।
গুলশান হামলার কয়েকদিন পরই কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া মসজিদে ঈদের জামাতের পাশে বোমা হামলা হল। মারা গেল নিরীহ নারী, পুরুষ ও পুলিশ। খবরে জানা গেছে আরও অনেক জঙ্গি পরিবার হতে নিখোঁজ রয়েছে। তারা এখন কোথায় থাকতে পারে সেটা তার পরিবারের লোকদের চেয়ে আর কারা বেশি জানতে পারে। 
বঙ্গবন্ধু হত্যার আগেও খুনোখুনি, দুর্ভিক্ষ, বাসন্তির শাড়ি, আওয়ামী লীগ নেতাদের লুটপাট প্রভৃতির মাধ্যমে দেশকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল। এতে বঙ্গবন্ধুর দলের লোকেরাও ছিল। আর বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত লোকদের দূরে সরিয়ে দিয়ে অবিশ্বস্তদের কাছে ভেড়ানো হয়েছিল।
নইলে খুনী মোশতাক তার মন্ত্রিসভা গঠন করল কিভাবে? পিতাকে মারবে আর সন্তানরা চুপসে গিয়ে কেবল নিজেদের জান বাঁচাতে নিজ নিজ সুবিধা অনুযায়ী আত্মগোপন করবে ও পিতৃঘাতকের সাথে মিলে হাসবে, এ কেমন সন্তান? জননেত্রী শেখ হাসিনার বেলাতেও দেখি ’৭৫ পূর্ব অবস্থাই বিরাজমান। তিনি সংসদ নেতা ও দলীয় প্রধান বটে কিন্তু তার সাংসদ ও দলের কী ভূমিকা।
কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় বোমা হামলা হয় আর একই জেলার অষ্টগ্রামে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপে রক্তাক্ত সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের ছেলে রেজওয়ান আহমেদ তৌফিক ওই এলাকার এমপি। তার পক্ষের লোক দলীয় নমিনেশন না পাওয়ায় এখানে কাউকে নৌকা মার্কাই নিতে দিলেন না তিনি। এতবড় অগঠনতান্ত্রিক ও দলীয় শৃংখলা ভঙ্গের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হল?
তারা যদি নিজেদের মধ্যে বিবাদ না করে জঙ্গিবাদ বিরোধী প্রচারনায় নামত তাহলে কি পরিস্থিতি অন্যরকম হতো না? দেশজুড়ে অধিকাংশ এমপিই এখন রাজনীতি ও দেশ নিয়ে ভাবছে না। তারা আছে তাদের স্বেচ্ছাচারিতা ও আধিপত্য নিয়ে। তারা ব্যস্ত, টিআর, কাবিখা, দখল ও লুটপাট নিয়ে।
দলীয় সভাপতির নিষেধ সত্ত্বেও ১৪ দল ও আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকার সময় যাদের দ্বারা অত্যাচারিত হয়েছে, যারা অসংখ্য নেতাকর্মির প্রাণ হরণের কারণ হয়েছে সেইসব জামাত বিএনপির নেতাদের দলে ভিড়িয়েছে তাদেরে আধিপত্যবাদের পেশি শক্তি বাড়াতে। এভাবেই তারা সরিষার তেলে ভূত প্রবেশের সুযোগ করে দিচ্ছে।
কবিরাজের ভূমিকায় একা শেখ হাসিনা কী করতে পারবেন? তার দলীয় শিশিতেইতো ভূত। কিছুদিন পর পর এমপিদের কীর্তিকলাপ পত্রিকার শিরোনাম হচ্ছে। শিক্ষককে কানধরে ওঠবস করানো, মহিলা চেয়ারম্যানকে চড় মারা, দলীয় নেতাকে দিগম্বর করা, ইয়াবা ব্যবসা, শিশু হত্যা, অস্বাভাবিক আচরণ আরও কত কী। এপিএস ও চাটুকার পরিবেষ্ঠিত অধিকাংশ সাংসদ নীতি নৈতিকতা অমান্য, তদবির, নিয়োগ বাণিজ্য, ভূমি দখল ও দলীয় গঠনতন্ত্রবিরোধী কর্মকান্ড পরিচালনা ছাড়া রাজনীতি চর্চার নূন্যতম কাজও করছেন না।
সাংসদের এপিএসরা মাঝেমধ্যে এলাকায় এলে প্রশাসন ও সুবিধাভোগীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তারা দেশ ও রাজনীতি নিয়ে মোটেই ভাবেনা। বর্তমান প্রেক্ষিতে তাদের ভাবতে বাধ্য করা উচিত। এপিএসদের দিয়ে এলাকায় জঙ্গিবাদ বিরোধী প্রচারনা ও গণসংযোগ চালানোর ব্যবস্থা করা দরকার।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে আপনাকেই উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এমপি জঙ্গিবাদ বিরোধী প্রচারনায় এলাকায় গেলে তাদের এপিএসরাও যাবে, দলীয় প্রতীক নিয়ে পাশ করা ইউপি চেয়ারম্যান, সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী ও পুলিশ ও দল সকলই তৎপর হবে।
সংসদ অধিবেশন ছাড়া বাকি সময় সাংসদদের এলাকায় থাকার নির্দেশ দিন। সাংসদরা এলাকায় অবস্থান করলে বিদ্যুতের লোডশেডিং পর্যন্ত কমে যায়। সুতরাং তারা যদি জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ বিরোধী প্রচারণায় নামে তারও সুফল আসবেই।
এছাড়াও প্রতি জেলা, উপজেলায় নেতাকর্মিদের রাজনৈতিক জীবন বৃত্তান্তের শুরু হতে বর্তমান পর্যন্ত জানতে তথ্য ফরম ছাড়ুন। কে কত সাল হতে আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত, কত তারিখে সদস্য পদ পেল এর আগে অন্যকোন রাজনৈতিক দল করতো কিনা তাও তথ্য ফরমে উল্লেখ করা হোক। রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধার পুত্র কন্যা কিনা তাও উল্লেখ করা হোক।
তৃণমূল, কেন্দ্র কোথাও গঠনতন্ত্রের অনুশীলন নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দলীয় কর্তৃত্ব আপনার হাতে না রেখে গঠনতন্ত্রের হাতে ছেড়ে দিন। আপনি কেন্দ্রে একটি গঠনতন্ত্র অনুশীলনের বিশেষ টিম গঠন করে দিন। তারাও গঠনতন্ত্রের আলোকে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ বিরোধী প্রচারনায় নামুক।
সভা, সমাবেশ, সেমিনার পদযাত্রা ও পথসভায় বাংলাদেশ জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ বিরোধী প্রচারনায় মেতে উঠলে শান্তির সুবাতাস বইবেই বইবে। কেঁপে উঠবে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের গোপন আস্তানা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, প্লিজ দেরি করবেন না। দ্রুত নির্দেশ দিন। শুধু ১৪ দলীয় বৈঠক নয় জঙ্গিবাদ ইস্যুতে সংসদীয় সভা ডাকুন ও এমপিদের এলাকায় যেতে বলুন।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল
আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








