১০ নভেম্বর, ২০০০ থেকে ১১ মার্চ, ২০১৩। প্রায় ১৩ বছর সময়। ওই সময়ে ৭৫টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। কিন্তু একটি ডাবল সেঞ্চুরি করতে পারেননি কোন টাইগার ব্যাটসম্যান। অথচ গত তিন বছরে ২০ টেস্টে এসেছে তিনটি ডাবল। একে একে টেস্ট ক্রিকেটের এলিট ক্লাবে নাম উঠিয়েছেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের ত্রিরত্ন– মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল এবং সাকিব আল হাসান।
নিজেকে খুবই সৌভাগ্যবান ভাবি এ কারণে যে তিনটি ডাবল সেঞ্চুরিই মাঠে বসে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে।
#গল#মুশফিকুর রহিম ২০০*
২০১৩ সালের মার্চে শ্রীলংকার বিপক্ষে বাংলাদেশের অ্যাওয়ে সিরিজ। সেটিই দেশের বাইরে আমার প্রথম অ্যাসইনমেন্ট। বাংলাদেশের রথী-মহারথী সব ক্রিকেট জার্নালিস্টের সঙ্গে পরিচায় ওই গলের প্রেসবক্সে। আমার সঙ্গে আরও কয়েকজন স্পোর্টস রিপোর্টারেরও ছিলো প্রথম বিদেশ সফর। খ্যাতিমান ক্রীড়া সাংবাদিক উৎপল শুভ্র আমাদের বলেছিলেন, তোমরা তো অনেক লাকি। ফার্স্ট টাইম এসেই ডাবল সেঞ্চুরি নিয়ে রিপোর্ট করছো।
গল টেস্টে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে ডাবল সেঞ্চুরিয়ানদের এলিট ক্লাবে প্রথম নাম লেখান মুশফিকুর রহিম। অথচ ওই টেস্টেই অমূল্য সুযোগ নষ্ট করেন মোহাম্মদ আশরাফুল। মুশফিকের আগে তিনিই হতে পারতেন আরেকটি ইতিহাস।

টেস্টের তৃতীয় দিন শেষে মোহাম্মদ আশরাফুল অপরাজিত ছিলেন ১৮৯ রানে এবং মুশফিকুর রহিম ১৫২ রান নিয়ে ঘুমোতে যান তাজ সমুদ্র হোটেলে। স্বপ্নময় এক দিনের অপেক্ষায় পুরো বাংলাদেশ। আরও বেশি এক্সাইটমেন্ট নিয়ে সাত সকালেই চলে এলাম প্রেসবক্সে। কিন্তু এসেই সব তালগোল পেকে গেলো। এক রান যোগ করেই রঙ্গনা হেরাথকে উইকেট দিয়ে দিলেন অ্যাশ। পুরো প্রেসবক্স তখন স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ।
অবশ্য দিন শেষে তা পুষিয়ে দিয়েছিলেন মুশফিক। দেশের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে টেস্ট ক্রিকেটে ডাবল সেঞ্চুরি অর্জন করলেন, ২২ চার আর এক ওভার বাউন্ডারিতে ৩২১ বল খেলে পাক্কা ২০০ রান। তার ডাবল, আশরাফুলের ১৯০ এবং নাসির হোসেনের ১০০। সব মিলিয়ে শ্রীলংকার ৫৭০ রানের জবাবে প্রথম ইনিংসে ৬৩৮ রান বাংলাদেশের। এটিই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের হাইয়েস্ট টেস্ট টোটাল। এমন দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে ওই টেস্ট ড্র করে বাংলাদেশ।
#খুলনা#তামিম ইকবাল ২০৬
গল টেস্টের দুই বছর পর ২০১৫ সালের এপ্রিলে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্ট। খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামে মহাকাব্য রচনা করেন দুই বাংলাদেশী ওপেনার ইমরুল কায়েস এবং তামিম ইকবাল। দুজন মিলে ৩১২ রানের ওপেনিং জুটি গড়েন। টেস্টের চতুর্থদিন শেষে তামিম ১৩৮ এবং ইমরুল অপরাজিত থাকলেন ১৩২ রান করে। দুজনেরই ছিলো সমান সম্ভাবনা।

তামিমের চেয়ে বেশি ক্ল্যাসিকাল মনে হচ্ছিলো ইমরুলকেই। কিন্তু শেষ দিনে ইমরুল ১৫০ করে জুলফিকার বাবরকে উইকেট দিলেও অসাধারণ ব্যাটিংয়ে নিজের প্রথম এবং দেশের দ্বিতীয় ডাবল সেঞ্চুরিয়ান হন তামিম ইকবাল। গতকালের আগ পর্যন্ত তার ২০৬ রানই ছিলো বাংলাদেশের হয়ে সেরা ব্যাক্তিগত টেস্ট ইনিংস।
#ওয়েলিংটন#সাকিব আল হাসান ২১৭
ওয়ানডে এবং টি-টুয়েন্টি সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হওয়ার পর টেস্ট নিয়ে আরও বেশি আশংকা পেয়ে বসেছিলো বাংলাদেশ দলকে। ভক্ত-সমর্থক-গণমাধ্যম সবকিছু মিলিয়ে এক ধরণের অদৃশ্য চাপেই ছিলো টাইগাররা। কিন্তু হয়তো সাকিব-মুশফিকরা ভেবেছিলেন অন্য কিছু। ভেবেছিলেন তাদের নিজেদের মতো করে।
ওয়েলিংটনের সবুজ ক্যানভাসে সাউদি-বোল্টদেরকে ইচ্ছেমতো পিটিয়ে বেসিন রিজার্ভের আধিপত্য দখল করলেন। কন্ডিশন, আবহাওয়া এসব একপাশে রেখে দিনভন অপূর্ব ব্যাটিং প্রদর্শনী দেখালেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই সময়ের সবচে অভিজ্ঞ দুই ক্রিকেটার– মুশফিকুর রহিম এবং সাকিব আল হাসান।

পুরো নিউজিল্যান্ড সিরিজে এই প্রথম যেনো মানসিক শক্তি পেলাম ১৩ জানুয়ারি সারাটা দিন। দুজন মিলে গড়লেন ৩৫৯ রানের রেকর্ড পার্টনারশিপ। এই পথেই সাকিব আল হাসান পেয়ে গেলেন নিজের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি। প্রেসমিটে এক সঙ্গে বসে কথা বলার সময় কত কথা, কত হাসাহাসি সাকিব-মুশফিকের।
একটা ভালো ইনিংস এবং একটা ভালো দিন আসলেই সবকিছু পাল্টে দেয়।
সাকিব বলছিলেন, এই রেকর্ড ভাংছে, ওই রেকর্ড ভাংছে এসব শুনছিলাম আর ব্যাটিং করছিলাম। খুবই ভালো লাগছিলো মোমেন্টটা। আমরা দুজনই চাইছিলাম জুটিটা বড় করতে। প্রেসমিটে মুশফিক বলছিলেন পরের দিনের পরিকল্পনার কথা। ফটোসেশন এবং সেলফি সেশনও চলেছে আফটার প্রেসমিটে।

নিউজিল্যান্ডের অতিভদ্র গণমাধ্যমের সব সহকর্মী বারবার যে যার মতো পারছিলেন আমাদের কাছ থেকে সাকিব এবং মুশফিকের রেকর্ড, তথ্য এসব ভালো করে জেনে নিচ্ছিলেন।
সাকিব-মুশফিকের পর বারবার তারা অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন আমাদেরও। কেউ কেউ একটু এগিয়ে বলেই দিলো তোমরা টেস্টে জিততে যাচ্ছি। হোয়াট অ্যা টিম ইউ হ্যাভ! রাতে ঘুমোতে গিয়ে বারবার কানে ভেসে এসেছে বেসিন রিজার্ভের গর্বের হাত তালিগুলো, অনেকটা শন্তির ঘুমও মনে হয় হলো অনেক দিন পর।
শুভ সকাল টিম-বাংলাদেশ।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








