বাংলাদেশ-আফগানিস্তান দ্বিতীয় ম্যাচ শুরুর আগে মাথায় ওয়ানডে ক্যাপ পরিয়ে দেওয়ার পর মাশরাফিকে জড়িয়ে ধরেন মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত। আর তৃতীয় এবং শেষ ওয়ানডে চলার সময় মাশরাফিকে জড়িয়ে ধরেন আরেক সৈকত, পুরো নাম মেহেদী হাসান। তবে, এবার ঘটনা অন্যরকম।
ম্যাচের তখন ২৯ ওভার। বল করার জন্য দৌড় শুরু করেছেন তাসকিন আহমেদ। কিন্তু হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন আফগান ব্যাটসম্যান রাশিদ খান। দেখা গেলো মাঠে ছুটে আসছেন এক যুবক, লক্ষ্য তার বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি। ক্যাপ্টেন প্রথমে দু’ হাত তুলে তাকে থামতে ইশারা করলেন। কিন্তু, ছেলেটি ভোঁ দৌড়ে মাশরাফিকে জড়িয়ে ধরলেন। ততক্ষণে মাঠের নিরাপত্তাকর্মী এবং পুলিশও পৌঁছে গেছে। তবে, ভক্তকে জড়িয়ে থাকতে দিলেন অধিনায়ক। পরে নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে নিয়ে গেলেও তাদের কোন কিছু বলে দেন তিনি। অনেকে মনে করেন, ছেলেটির বিরুদ্ধে যেন কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হয় মাশরাফি সম্ভবতঃ সে কথাই বলেছেন।
তবে, দায়িত্বের অংশ হিসেবে যুবকটিকে মিরপুর থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তার নাম মেহেদী হাসান সৈকত। ঢাকার সাভারে তার বাড়ি, রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তিনি।
সৈকত স্টেডিয়ামের যে গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডে ছিলেন একমাত্র সেটাই গ্রিল দিয়ে ঘেরা নয়। বাকি সব গ্যালারিতেই গ্রিল থাকায় সেখান থেকে কারো পক্ষে মাঠে চলে যাওয়া সম্ভব নয়।
কিন্তু, বেশি দামের গ্র্যান্ড স্ট্যান্ড থেকে মাঠে চলে যাওয়ার এরকম সুযোগ কিংবা ম্যাচ চলার সময় ওই মাশরাফিভক্তের মাঠে ঢুকে পড়ার ঘটনা কি নিরাপত্তা শংকার কথা জানান দেয় না? নাকি মাঝেমধ্যেই মেসি বা রোনালদোভক্তরা মাঠে ঢুকে যেমন আলোচনার জন্ম দেন এটিও সেরকমই একটি বিষয়? অস্বাভাবিক হলেও সাধারণ এক ঘটনা?
গত রাত ৯টা থেকেই ক্রিকেট ভক্তদের মধ্যে এরকম আলোচনা তুঙ্গে। কেউ কেউ বিষয়টিকে খুব শংকার মনে করলেও অনেকে মনে করছেন, কোন পাগল ভক্তের এমন কাণ্ড-কারখানা হররোজ ঘটে না বা ঘটবে না। তাই এটা নিয়ে খুব চিন্তার কিছু নেই। পুলিশও বলছে, তারা যুবকটির সঙ্গে কথা বলে যেটা বুঝতে পেরেছে সেটা হলো, ছেলেটি তার আবেগ ধরে রাখতে পারেনি।
তারপরও ক্রিকেট ভক্তরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিরাপত্তার বিষয়টি মনে করিয়ে দিয়েছেন। যেমন আলম মেহেদী তার ফেসবুকে পোস্টে লিখেছেন: ভক্তেরা এমনই– পাগলাটে, বেপরোয়া! মাশরাফি এমনই– মনোহর, হৃদয়বান! তাই বলে মাঠের নিরাপত্তা এমনই– ঘুমন্ত আলাভোলা !!!!! সব্বোনাশ……….!
সাংবাদিক শরিফুল হাসান মনে করছেন, বরাবরের মতোই বাংলাদেশের আরেক প্রতিচ্ছবি অসংযত ওই দর্শক। এমন পাগল দর্শকের দরকার কী যে কংক্রিকেটর বিপদ ডাকে! প্লিজ সংযত হন।
ক্রীড়া সাংবাদিক রুহুল মাহফুজ জয় বিষয়টিকে খুবই গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সারা দুনিয়ার ক্রিকেট খেলুড়ে দেশগুলার এখন নিরাপত্তা ইস্যুতে বাংলাদেশের দিকে চোখ। আজকের এই ঘটনা ইতিবাচক কোন বার্তা তাদের দেবে না।
বিশেষ কেরে ইংল্যান্ড দল যখন ঢাকায় তখন এরকম একটি ঘটনা দেশের ক্রিকেটকে বিপদে ফেলে দিতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা অবশ্য বলছেন, ভয়ের কিছু নেই। খেলার সময় কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নিরাপত্তাবেষ্টনী থাকে। মোবাইল ফোন ছাড়া আর কিছু নিয়ে কেউ মাঠে ঢুকতে পারেন না। গ্র্যান্ড স্ট্যান্ড ছাড়া আর কোথাও থেকে মাঠে ঢুকে পড়ার সুযোগও নেই। আর ভক্তরা প্রতিদিনই পাগলামো করবেন না বলেই আশা তাদের।
কিন্তু, গ্র্যান্ড স্ট্যান্ড থেকে নিরাপত্তবেষ্টনী ভেদ করে যুবকটি মাঠে কীভাবে ঢুকে পড়লো সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। যেমনটি বলছেন সাবেক ছাত্রনেতা মুখলেছউদ্দিন শাহীন। তিনি লিখেছেন: স্টেডিয়ামে ঢুকে পড়া সেই ক্রিকেট ভক্তের মুক্তি চাই কারণ এই ক্রিকেট ভক্তদের জন্যই বাংলাদেশের ক্রিকেট আজ এই জায়গায় এসেছে । সঙ্গে তিনি এও বলেছেন, নিরাপত্তায় ত্রুটি থাকার জন্য দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টজনদের শাস্তি চাই ।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে এতো আলোচনার মধ্যেও অবশ্য বারবারই অধিনায়ক মাশরাফির অনন্য গুণের কথা উঠে আসছে সবার মুখে মুখে। তাদের সকলকে প্রতিধ্বনিত করে স্কুল শিক্ষক হাসিম উদ্দিন আহমেদ লিখেছেন: নিরাপত্তার জাল ছিন্ন করে খেলার মাঠে ছুটে যাওয়া ভক্তকে মাশরাফি যেভাবে বুকে আগলে নিয়েছেন, তাতে গতকালকের খেলার অনেক কিছুকে পিছনে ফেলে এই দৃশ্যটাই কোটি দর্শকের মন কেড়ে নেয়। একজন মাশরাফি কেবল মাঠের ক্যাপ্টেন্সিতেই সেরা নন, মানুষ হিসেবে মানুষের ক্যাপ্টেন হিসেবেও তিনি সেরা’র নজির দেখিয়েছেন। স্যালুট ক্যাপ্টেন।








