‘গত চারটা বছর যে কতটা কষ্ট ও দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে বলে বোঝাতে পারবো না। প্রতিদিনই ঘণ্টার পর ঘন্টা যানজট লেগে থাকতো এখানে। একটু বৃষ্টি হলেই সৃষ্টি হত জলবদ্ধতা। সবমিলিয়ে এই এলাকার মানুষ এবং এই এলাকা দিয়ে নিয়মিত চলাচলকারীদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ফ্লাইওভার চালু হওয়ার পর মনে হচ্ছে সে অবস্থার উন্নতি হবে। মনে হচ্ছে দীর্ঘদিন পর শরীর থেকে একটা বিষফোঁড়া অপারেশেন করা হলো!’
বৃহস্পতিবার মগবাজার-মৌচাক-মালিবাগ ফ্লাইওভার যান চলাচলের জন্য পুরোপুরি খুলে যাওয়ার পর এভাবেই চ্যানেল আই অনলাইনকে বলছিলেন মগবাজারের বাসিন্দা সাবের হোসেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৃহস্পতিবার দুপুরে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ফ্লাইওভারের উদ্বোধন করেন। মৌচাক এলাকায় বানানো অনুষ্ঠান মঞ্চে তখন উপস্থিত ছিলেন পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, খাদ্য মন্ত্রী কামরুল ইসলাম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন, স্থানীয় সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরীসহ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। উদ্বোধন ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই তারা উল্লাস প্রকাশ করেন। উদ্বোধনের কিছুক্ষণ পর বেলা ১টার দিকে ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে যান চলাচল শুরু হয়।
মগবাজার মৌচাক এলাকায় নিয়মীত রিক্সা চালান মধ্যবয়সী আসাদুল। এই এলাকার যানজট তার নিত্যসঙ্গী ছিল। এখন আসাদুলের আশা ফ্লাইওভার চালুর পর এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষেপ মারতে পারবেন; করতে পারবেন বাড়তি আয়ও।
মৌচাক মার্কেটের ব্যবসায়ী মোখলেছুর রহমান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: শুধুমাত্র এই এলকার যানজটের কারণে মৌচাক মার্কেটের বেচাকেনা কমে গিয়েছিল বহুগুণ। আশা করছি, এখন যানজট কমার সঙ্গে সঙ্গে এই মার্কেটের বেচাকেনাও আগের অবস্থায় আসবে।
ইস্কাটন রোডের ইস্পাহানী বালিকা বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির দুই ছাত্রী অর্পা ও ফারহানা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: এতদিন স্কুলে আসতে আমাদের অনেক কষ্ট হয়েছে। যানজটের কারণে সময়মত স্কুলে আসতে ও বাসায় ফিরতে দেরি হত। এখন আশা করছি সময়মত স্কুলে আবার ঠিকমত বাসায় ফিরতে পারবো।
ফ্লাইওভার উদ্বোধনের পর ওই এলকা সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, যানবাহনের চাপ আগের যেকোন সময়ের চেয়ে অনেকটাই কম। বাংলামোটর থেকে রিক্সা নিয়ে অনায়াসেই মৌচাক-মালিবাগ-রাজারবাগ শান্তি নগর এলাকায় পৌছানো যাচ্ছে।
মগবাজার মোড়ে কথা হয় গুলিস্তান-গাজীপুর রুটে চলাচলকারী বলাকা বাসের সহকারী সোহেলের সঙ্গে। চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন: শান্তিনগর-মালিবাগ-মৌচাক হয়ে মগবাজার আসতে আজ দেরি হয়নি। অন্যান্য দিন এই রাস্তাটুকু পার হতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত।
রাজধানীতে বসবাস করছেন অথচ মৌচাক-মালিবাগ-মগবাজার-রাজারবাগ-শান্তিনগর এলাকায় যানজট-জলজটের ভোগান্তিতে পড়েননি এমন লোক নেই বললে চলে। ২০১৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধনের পর নির্মান কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে দীর্ঘ যানজটের চরম ভোগান্তি ছিল এই এলাকার নিত্যসঙ্গী। একটু বৃষ্টি নামলে পানি জমে সৃষ্টি হত তীব্র জলজট। ওই এলাকার ভোগান্তি প্রায়ই গণমাধ্যমের শিরোনাম হতে দেখা গেছে। নিচের সড়ক মেরামতসহ উড়াল সড়কের সবগুলো রাস্তা উদ্বোধনের খবরে তাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন ওই এলাকাসহ ওই রাস্তা দিয়ে নিয়মিত চলাচলকারীরা।
২০১১ সালে একনেকে এই ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্প চূড়ান্ত হওয়ার পর ২০১৩ সালে ১৬ ফেব্রুয়ারি এর নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে এ প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৪৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এরপর বেড়ে ৭৭২ কোটি ৭০ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। পরে নকশায় পরিবর্তন আনা হয়। শেষ পর্যন্ত ব্যয় বেড়ে ১ হাজার ২১৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকায় গিয়ে ঠেকে।
এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার অর্থায়ন করেছে ৪৪২ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। ৭৭৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা দিয়েছে সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট (এসএফডি) এবং ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ওএফআইডি)।
চারটি অংশে বিভক্ত প্রকল্পটির তিনটি অংশ আগেই খুলে দেওয়া হয়। এর মধ্যে সাতরাস্তা-মগবাজার-হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল পর্যন্ত অংশটি গত বছরের ৩০ মার্চ যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ওই বছরের বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর খুলে দেওয়া হয় নিউ ইস্কাটন থেকে ওয়ারলেস মোড় পর্যন্ত এক দিকের অংশ। চলতি বছরের ১৭ মে এফডিসি মোড় থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত তৃতীয় অংশ যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়। সর্বশেষ মৌচাক-মালিবাগ-শান্তিনগর-রাজারবাগ-মগবাজার অংশ খুলে দেওয়ার মাধ্যমে চালু হলো পুরো ফ্লাইওভারটি।








