ভোটারদের কেন্দ্রে না আসার দায় কার?

Cityscape of Dhaka with logos of Dhaka North and South City Corporations at the top. Channel i News – চ্যানেল আই নিউজ
দেশে আগের তুলনায় জনসংখ্যা বেড়েছে, ভোটার বেড়েছে, নির্বাচনী পোস্টার বাড়লো, নির্বাচনী ব্যয় বাড়লো কিন্তু নির্বাচনে ভোটের শতাংশ বাড়েনি। এর প্রমাণ পাওয়া গেছে সদ্য সমাপ্ত ঢাকা সিটি নির্বাচনে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট পড়লো শতকরা ২৯.০২ ভাগ ও উত্তর সিটিতে শতকরা ২৫.৩ ভাগ৷ আওয়ামী লীগ, বিএনপি, বামদলসহ সব প্রার্থীদের এত প্রচার প্রচারণাতেও কেন ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গেলো না?
এই ভোটারদের না যাওয়া নিয়ে আত্মসমালোচনার বদলে নানা কথা বলাবলি হচ্ছে৷ কেউ বলছেন, ইয়াং জেনারেশন দেরিতে ঘুম থেকে ওঠায় ভোটার কম। অনাস্থার কারণে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যায়নি বিষয়টা এমন নয় তাও বলা হচ্ছে৷ নির্বাচন কমিশনের রিটার্নিং কর্মকর্তার বক্তব্য: ‘অনাস্থার কারণে ভোটাররা ভোটে যাননি, এটা আমার কাছে মনে হয়নি। অনাস্থার কারণে যদি ভোটে না যেতেন, তাহলে যারা সরকারি দল তাদের তো অন্তত ভোটে অনাস্থা নাই। যারা সরকারকে সমর্থন করেন, তাদের সব ভোটারও ভোট দিতে যাননি।’ এরকম নানা কথা সংবাদপত্রে উঠে আসছে৷ ছুটি ভোগ করেছে, ফেসবুক নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে, শুক্রবারের ছুটির দিনের পরের দিনে ভোট ইত্যাদি৷ কেন সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনটিতেও ভোটাররা ভোট দিতে গেল না? দায়টা কি ভোটারদের না প্রার্থীদের না রাজনৈতিক দলগুলোর, নাকি নির্বাচন কমিশনের?
বিএনপি নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে হরতাল দিল। কিন্তু তারা কি বলবেন তাদের ভোটাররা কেন ভোটকেন্দ্রে গেলো না? তাদের কত পার্সেন্ট ভোটার ভোটকেন্দ্রে গিয়েছে আর কত পার্সেন্ট যায়নি? কেউ কেউ বলছেন ৫০ শতাংশের নিচে ভোট পড়লে আবার নির্বাচন দিতে হবে৷ বিএনপি সাংসদরা সংসদে বলছেন, বর্তমান সরকারের অধীনে এই নির্বাচন কমিশনের সময় ছাড়া অতীতে কোন স্থানীয় সরকার নির্বাচন,জাতীয় সরকার নির্বাচনের ৫০ ভাগের কম ভোটের নজীর নেই৷ এই কারণে তিনি সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে টোটালী ব্যর্থ বলে উল্লেখ করলেন৷ কিন্তু এক্ষেত্রে বিএনপির কি কোন ব্যর্থতা নেই? সরকার ও নির্বাচন কমিশন কি বিএনপিপন্থী ভোটারদের যেতে নিষেধ করেছে? আর বিএনপি কেন নির্বাচনে প্রার্থী দিলো কিন্তু ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে উদ্বুদ্ধ করলো না? সুতরাং ব্যর্থতার দায় কেবল সরকার ও নির্বাচন কমিশনের নয় বিএনপিরও রয়েছে৷ কেন মানুষ আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে ভোট দিতে গেল না। কেন মানুষ বিএনপি প্রার্থীকে ভোট দিতে গেলো না? এ নিয়ে ভাবতে হবে।
একসময় মানুষ ভোটকে মহাউৎসব মনে করতো৷ স্নান খাওয়া ভুলে গিয়ে নির্বাচনী ওয়ার্কে লিপ্ত থাকতো তারা৷ পিতাপুত্র নিজ নিজ পছন্দের প্রার্থীকে নিয়ে ঘরে বাইরে বিতর্ক করতো৷ ঝগড়া করতো৷ সেই মহাউৎসব মুখর দিনটি কেন এমন নিরুত্তাপ হয়ে গেলো৷ ভোটকেন্দ্রগুলো খাঁ খাঁ করে ভোট শূন্যতায়৷ সাংবাদিকরা ক্যামেরা নিয়ে গিয়ে ভোটারদের লাইন পায় না৷ এমন একটি দিনে ইয়ং জেনারেশন কেন দেরিতে ঘুম থেকে উঠবে? কেন ছুটি ভোগ করবে ও কেন ফেসবুক নিয়ে ব্যস্ত থাকবে? প্রচার প্রচারণায় তো আওয়ামী লীগ বিএনপি কেউই পিছিয়ে ছিল না৷ প্রচারণাতে ছিল অন্য প্রার্থীরাও৷ তাদের প্রচারণার পোষ্টারের বর্জ্য সরাতেই নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে৷
শুধু যে বিএনপি বা বিরোধী দলীয় ভোটাররা কেন্দ্রে যায়নি, তা নয়। সরকারপন্থী দল ও জোটের ভোটাররাও ভোট দিতে যায়নি৷ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটটিতে ১৪টি দল রয়েছে৷ সব দলই জোটের প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছে৷ বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটেও ২০টি দল রয়েছে৷ এসব দলের ঢাকার বাইরে লোক না থাকলেও ঢাকায় কমবেশী লোক রয়েছেই৷ তাদের অনুসারীরা কেন এই দিনে ‘দেরিতে ঘুম থেকে উঠল, ছুটি কাটালো ও বাসায় বসে বসে ফেসবুক চালালো’?
ভোট নিয়ে কত যুক্তি!, কেউ বলছে দেশের উন্নয়ন হয়েছে তাই মানুষ ভোটদানে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে৷ উন্নয়নের বিপরীতে ভোটের দিন ভোটারের অনুপস্থিতি কি যৌক্তিক? মানুষ পোস্টার লাগাতে গেছে, ফেসবুকে ভোট চেয়েছে ও সেল্ফিবাজী করেছে কিন্তু ভোট দিতে যায় নাই৷ আওয়ামী লীগ, বিএনপি দুই দলের শোডাউনই তো মানুষের পথ চলাচলের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ তবু কেন ভোটারদের এমন নিম্ন পার্সেন্টেজের উপস্থিতি?
ঢাকা উত্তরের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন মোট ভোটারের ১৪ দশমিক ৮৪ শতাংশের সমর্থন নিয়ে। ঢাকার দক্ষিণের মেয়র মোট ভোটারের ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশের সমর্থন নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। অথচ পুরো নির্বাচনটি ছিল বিনা বাধায়৷ নির্বাচন কমিশনে দুই পক্ষেরই অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ গেলেও শেষ মুহূর্তের প্রচারণা অবাধ ছিল। মেয়র প্রার্থীদের পাশাপাশি কাউন্সিলর প্রার্থীরাও ছিল ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। তবু কেন ভোটাররা ভোট দিতে গেল না? ভোটের পার্সেন্টেজ এমন একটা নিম্নপর্যায়ে নেমে এলে যদি তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয় তবে ফলাফলে এমন কিছু কেন নয়? জামানতের মত ফলাফলেও এমন একটা লিমিট থাকা উচিত৷
ভোটার কেন ভোটকেন্দ্রে আসে না এই প্রশ্নটাই আজ সবার কাছে৷ অন্যদিকে ১৪.৮৪ ও ১৭.৩০ শতাংশ ভোটারের সমর্থন নিয়ে জয়ের আনন্দে উল্লসিত বিজয়ী মেয়ররা৷ তারা কি বলবেন তাদের মোট ভোটার কত পার্সেন্ট? আর কত পার্সেন্ট ভোটদানে বিরত রয়েছে? এই বিরত থাকারা গোটা নির্বাচন ব্যবস্থা, নির্বাচনে অংশগ্রহনকারী রাজনৈতিক দল, নির্বাচনে অংশগ্রহনকারী মেয়র ও কাউন্সিলরদের প্রতি কি অনাস্থা প্রদর্শন করলো না? এক্ষেত্রে ঢাকার উত্তরে ৮৫.১৬ ও দক্ষিণে ৮২.৭০ ভাগ ভোটারের সমর্থন তো তারা নিতে পারলেন না৷ এই বিপুল জনগোষ্ঠী আসলে কী চায়? সেটা খুঁজে বের করা জরুরি৷ এত কম ভোট পেলে যদি জয়ের ফলাফলে কোন অসুবিধা না হয় তবে পরাজয়ের ভোটে অসুবিধা কেন? কেন কম ভোটের জন্য প্রার্থীদের জামানত বাজেয়াপ্ত করা হবে?
চাকরি প্রার্থী ও ছাত্রদের ফলাফলেও একটা নম্বরের লিমিট থাকে৷ কোন চাকরী প্রার্থীকে পরীক্ষায় ৭০, কোনটায় ৬০ ও ৫০ পেতে হয়৷ ছাত্রদের একাডেমিক পরীক্ষাতেও পাশ করতে হলে ৩৩ নম্বর পেতে হয়৷ রাজনৈতিক দল ও জাতীয় সংসদেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার লিমিট থাকে৷ নির্বাচনেও এমন একটি লিমিট থাকা উচিত বলে অনেকেই মন্তব্য করছেন। বিষয়টা সত্যিই ভাববার৷ এ বিষয়ে সরকার, সকল রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন কমিশনের যৌক্তিক বোধোদয় হোক৷
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






