বিভিন্ন নামীদামী স্কুলে বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে যুক্তি দাঁড় করিয়ে মতের বিরুদ্ধে ভিন্নমত উপস্থাপনের যোগ্যতা বিশেষ প্রতিভা বলেই স্বীকৃত। বিতার্কিকদের পুরস্কার দেওয়ার রীতিও চালু রয়েছে।মতকে গ্রহনযোগ্য ও সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্যই মূলত এই মত-ভিন্নমত প্রতিযোগিতা।
বিতার্কিকদের মধ্যে একে অপরের বিরুদ্ধে যে যতবেশী যুক্তি ও বিরুদ্ধমত উপস্থাপন করতে পারে বিচারক মন্ডলি তাকেই পুরস্কৃত করে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন।সর্বত্র চলছে মতান্ধ হিংস্রতা। মত প্রতিষ্ঠায় ভিন্নমত চর্চার উপলব্ধির চরম অভাব।রাজনীতিক,জনপ্রতিনিধি, আমলা,ব্যবসায়ী,শিল্পপতি, ধার্মিক,নাস্তিক সকলেই সমালোচনায় ও বিরোধিতায় ক্ষেপে ওঠে।
সমালোচক ও বিরোধিতাকারীর দিকে তেড়ে আসে। সমালোচকের গোষ্ঠীসুদ্ধ উদ্ধার করতে তৎপরতা দেখায় ও তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্চিত করতে প্রয়াসী হয়।যুক্তির বিপরীতে যুক্তি,তথ্যের বিপরীতে তথ্য,লেখার বিপরীতে লেখা,প্রভৃতির প্রগতিবাদী সভ্যতার সহনশীলতা আমাদের সমাজে নেই বললেই চলে।এজন্যই সাংবাদিক,লেখকদের বিরুদ্ধে হামলা ও মামলার ঘটনা ঘটে।ঘটে গ্রেফতার, কারাদন্ড ও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা। দুর্নীতি বিষয়ক কোনো রিপোর্ট করলে, রিপোর্টে কোন অসত্য তথ্য থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সত্য তথ্য তুলে ধরে সংবাদ পত্রে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ দিতে পারে। এটা সংবাদ পত্রের একটা স্বীকৃত রীতিও বটে।এই রীতি মান্যতার সহনশীলতা আজও গড়ে ওঠেনি। সত্য তথ্য উপস্থাপনেও চলছে তেড়ে আসার রেওয়াজ। অসত্য তথ্য উপস্থাপনেও তেড়ে আসার রেওয়াজ।
যা আমাদের অগ্রযাত্রার গতিকে ভীষনভাবে শ্লথ ও কন্টকময় করে দিচ্ছে।যারা বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রধান অতিথি কিংবা বিশেষ অতিথি অথবা বিচারকের আসনে বসে তারাও বাস্তব ক্ষেত্রে ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল নয়।রাজনীতিতে যেমন সরকার দল ও বিরোধী দল অপরিহার্য,চিন্তাজগতেও মত,ভিন্নমত, পক্ষমত ও বিপক্ষমত অপরিহার্য।প্রকৃতির টিকে থাকার প্রয়োজনে যেমন, রোদ, বৃষ্টি, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস প্রয়োজন তেমনই মতের প্রয়োজনেও ভিন্নমত কিংবা বিরুদ্ধ মতের প্রয়োজন।
এই মত প্রকাশের মাধ্যম হল গণমাধ্যম,প্রিন্ট মিডিয়া,অনলাইন মিডিয়া, গ্রন্থ, ফেসবুক, টুইটার প্রভৃতি। ফেসবুকিংয়ের বিপরীতে ফেসবুকিং, টুইটের জবাবে টুইট, কলমের জবাবে কলম, কীবোর্ডের জবাবে কী বোর্ড ব্যবহার না করে শুরু হয় ব্যক্তিগত শত্রুতা প্রকাশের বর্বর অসভ্য প্রক্রিয়া। যা গালাগালি, ধাক্কাধাক্কি ও ধরাধরি হতে শুরু করে আহত কিংবা নিহত করা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ব্লগার কুপানো, লেখক ও সাংবাদিক পেটানো খুবই প্রচলিত বাস্তব ঘটনা। সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়। কেন? মামলার আগে মামলাকারীরা কি সংবাদ পত্রে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ দিতে পারেনা?কোন সংবাদ পত্র প্রতিবাদ ছাপেনা?প্রতিবাদ না ছাপলে মামলা হতে পারে।
ছাপতে রাজী হলে মামলা করার কি যুক্তি? বরং মামলার যে উল্টো ফল হয় ক্রুদ্ধ মামলাকারী তা বুঝে না। সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হলে অথবা সাংবাদিককে শারীরিকভাবে নির্যাতন করলে যে তথ্য দমন করতে চাওয়া হয়। সে তথ্য আরও ছড়িয়ে যায়। সব সংবাদ পত্রে মামলা অথবা শারীরিকভাবে নির্যাতনের ইস্যুর সেই নিউজ ফলাও করে পুনরায় প্রচার হয়। প্রকাশিত নিউজের তথ্য আগে যাদের কাছে পৌঁছোয়নি তখন তাদের কাছেও পৌঁছে যায়। মামলা করে অথবা সাংবাদিক পিটিয়ে কারও কোন রাজনৈতিক ও সামাজিক ফায়দা হয়েছে বলে কারও জানা নেই। বরং এগুলো অধিকতর প্রচারের বিজ্ঞাপন হয়ে কাজ করে।সাংবাদিক, লেখকরা নিরীহ মানুষ।তাদের সহজেই পেটানো যায়। কিন্তু পিটিয়ে কে সিদ্ধি লাভ করেছে?কার রাজনৈতিক উন্নতি হল?
সাংবাদিক টিপু সুলতানকে পিটিয়ে ছিলেন সাংসদ জয়নাল হাজারী। এতে দেশব্যাপী হাজারীর বিরুদ্ধে ধিক্কারই জন্মেছিল। হাজারীর রাজনৈতিক পরিণতি কি তা সবারই জানা। তিনি নিজেও পরবর্তিতে সাংবাদিক হতেই বাধ্য হলেন। দৈনিক হাজারিকা নামের একটি পত্রিকার সম্পাদক তিনি। উত্তেজনার বশে সাংবাদিক পেটানো অথবা সাংবাদিক খুনের পরিণতি কারও বেলাতেই কোথাও ভালো হয়নি। যে মরেছেতো মরেছেই, যারা মেরেছে তাদেরও জীবনের উন্নতিতো হয়ইনি বরং করুণ পরিণতিই ভর করেছে। যাকে পথের কাঁটা ভেবে সরিয়ে দিল। চলার পথে এতে কাঁটার সংখ্যা হ্রাস পায়নি। বরং আরও বেড়েছে। বাংলায় একটা কথা চালু আছে, তা হল, রেগে গেলেনতো হেরে গেলেন। এটার বাস্তবতার নজির ভূরিভূরি থাকা স্বত্তেও কারও শিক্ষাগ্রহন হচ্ছেনা। আর সেজন্যই সাংবাদিক নিপীড়নের ধারাবাহিকতা বহাল তবিয়তে চলছে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







