বিচারকরাই রায়ে বলল,ভিআইপি কেবল রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী৷ আবার ব্যক্তিগত সফরে গ্রামের বাড়িতে যেতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকার খুলনার জেলা প্রশাসকের কাছে ভিআইপি প্রোটোকল চাইলেন! সুপ্রিম কোর্টের ডেপুটি রেজিস্ট্রার (প্রটোকল) মো. আব্দুছ সালাম খুলনার ডিসিকে চিঠি দিয়ে এ প্রটোকল চেয়েছেন।
ভিআইপি প্রটোকলের জন্য দেরিতে ফেরি ছাড়ায় শিশুমৃত্যুর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের ‘রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী ছাড়া আর কেউ ভিআইপি নয়’ হাইকোর্টের এমন আদেশের পর খোদ বিচারপতি কর্তৃক এই ভিআইপি প্রটোকল চাওয়া হলো।বিচারপতি ভিআইপি কিনা এ রায় কে দেবে?
কবি শেলী বলতেন,কবিরা হচ্ছে আইন ভঙ্গকারী আইনজ্ঞ৷ অর্থাৎ তারা আইন বানাবে কিন্তু নিজেরা আইন মানবেনা৷ বাংলাদেশে কি সবাই তাহলে আইনভঙ্গকারী আইনজ্ঞ হতে চলল? হাইকোর্টের নির্দেশনায় বলা হল বাংলাদেশের ভিআইপি কেবল রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী৷ ভিআইপি প্রটোকলে তিতাস ঘোষের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জাতির সামনে এমন নির্দেশনা দৃশ্যমান হল৷ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্পের যুগ্ম সচিব আব্দুস সবুর মন্ডলকে ভিআইপি প্রটোকল দিতে গিয়ে তিতাসকে নিয়ে যাওয়া এ্যমবুলেন্সটিকে যেতে দেয়া হল না৷
আব্দুস সবুর মন্ডলকে যদি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা হিসাবে ভিআইপি প্রটোকল দিতে হয় তাহলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মোট কর্মকর্তা কর্মচারী কতজন?রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে মোট কর্মকর্তা কর্মচারী কতজন?সবাই কি কোন এলাকায় গেলে এমনই ভিআইপি প্রটোকল পেয়ে থাকেন?সূর্যের আলোয় যেমন চাঁদ আলোকিত হয় ঠিক তেমনই ভিআইপির আলোয় কি তারাও আলোকিত ভিআইপি?এই ভিআইপি কালচারের বিড়ম্বনায় হয়ত অন্যত্র তিতাসের মতো কারও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি৷কিন্তু বিড়ম্বনা কি সর্বত্রই চলমান নয়?ভিআইপি কার্যালয়ের কর্মকর্তা কর্মচারীদের এমন প্রটোকল কি সারাদেশেই চলছেনা?
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কেউ ভিআইপি নন, হাই কোর্টের এমন আদেশের পরও সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি শশাংক শেখর সরকার ভিআইপি প্রটোকল চেয়ে কিভাবে চিঠি দিলেন?এক্ষেত্রে সরকারি ব্যাখ্যা কি?হাইকোর্টের নির্দেশনার সাথে সরকারের সহমত না দ্বিমত?শশাংক শেখর সরকারের এই চিঠি কি বিধিসম্মত না বিধিবহির্ভূত?
কারা ভিআইপি ও কারা ভিআইপি নয় এটা পরিষ্কার করতে হবে৷ বাংলাদেশের মত এমন ভিআইপি প্রটোকল কি বিদেশেও রয়েছে?সুইডেনের জন প্রতিনিধিদেরকে ভালো অংকের হাতখরচ কিংবা বাড়তি কোন সুযোগ সুবিধাও দেয়া হয়না, বরং জনগণের করের অর্থ ব্যয়ের ব্যাপারেও সুইডেনে দারুন কড়াকড়ি রয়েছে পার্লামেন্ট সদস্যদের ওপরে৷
এ বিষয়ে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির পার্লামেন্ট সদস্য প্রি-অর্নে হাকানসন বলেন, আমরা হচ্ছি দেশের সাধারণ নাগরিক। এমপির জন্য অতিরিক্ত সুবিধা পাবার বিষয়টি কোনভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়, কারণ আমাদের কাজ হচ্ছে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা, তারা যে অবস্থায় বা যেভাবে বসবাস করছেন, সেটাকেই তুলে ধরা।সুইডেনে রাজনীতিবিদ হিসাবে শুধুমাত্র দেশটির প্রধানমন্ত্রী সরকারি গাড়ি পান। পার্লামেন্ট সদস্যরা পাবলিক পরিবহনে বিনামূল্যে যাতায়াত করতে পারেন। অন্য অনেক দেশের মতো তারা নিজের জন্য কোন গাড়ি বা চালক পান না।অথচ আমাদের দেশে মন্ত্রী এমপিদের সহকারিরাই পাবলিক পরিবহনে চলেনা৷ তারা নিজস্ব গাড়ি হাঁকিয়ে চলে৷
কোন এলাকায় গেলে তাদের প্রটোকল দিতেই হুড়োহুড়ি লেগে যায়৷ সুতরাং কে ভিআইপি কে ভিআইপি নয় এগুলোকে অস্পষ্টতার ধূম্রজালে না রেখে স্পষ্ট করা উচিত৷ কার জন্য ফেরী অপেক্ষায় থাকবে? খেয়াঘাট ও বিমান বন্দরে কারা ভিআইপি সুবিধা পাবেন? রাস্তায় যানবাহন চলাচল কার জন্য বন্ধ থাকবে? রেল, বিমানসহ বিভিন্ন স্থানে কারা ভি আই পি সুবিধা পাবেন? সরকারের উচিত সেই তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ করা৷
মাদারীপুর জেলার শিবচরের কাঁঠালবাড়ি ঘাটে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্পের যুগ্ম সচিব আবদুস সবুরের জন্য ফেরি ছাড়তে দেরি হওয়ার কারণে অ্যাম্বুলেন্স যাত্রী স্কুলছাত্র তিতাস ঘোষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে৷ কাঁঠাল বাড়ির ১নং ফেরিঘাটটিতে ফেরির জন্য অপেক্ষা করছিল সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত স্কুলছাত্র তিতাসকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি। তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর রাত ১১টার দিকে ফেরিতে ওঠে অ্যাম্বুলেন্সটি। কিন্তু ততক্ষণে মস্তিষ্কে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়ে অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যায় তিতাস৷
মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলামের নির্দেশেই এম্বুলেন্সটি আটকে রাখা হয়৷ এখন নির্দেশদাতা সেই জেলা প্রশাসকই অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. শহিদুল হক পাটোয়ারীকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিলেন!তদন্ত কমিটি তিতাসের মৃত্যুর কারন বের করবেন!কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান, এএসপি (সার্কেল) আবির হোসেন ও বিআইডব্লিউটিসির এজিএম (মেরিন) একেএম শাজাহান। কমিটিকে সাতদিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
কি প্রতিবেদন জমা দেবে এই তদন্ত কমিটি?পারবে কি সত্য কথা বলতে? ‘ভিআইপি যাবে’ বলে ফেরিঘাটের ব্যবস্থাপক সালামকে বার্তা পাঠান জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম। মূলত তার অনুরোধ রাখতেই ওই দিন দেরিতে ফেরি ছাড়া হয়। ফলে মস্তিষ্কে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়ে অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যায় স্কুলছাত্র তিতাস৷ তদন্ত কমিটি পারবে কি তাদের প্রতিবেদনে এই কথাটি বলতে?
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ভিআইপি৷ তাদের কার্যালয়ের সকলেই ভিআইপি কিনা এগুলো স্পষ্ট করতে হবে৷ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী কি তাদের কার্যালয়ের সকলকেই তাদের প্রতিনিধিত্ব করার অনুমতি দিয়েছেন?নইলে তাদের আগমনকে ঘিরে এত প্রশাসনিক তৎপরতা দেখা যায় কেন?ভিআইপির প্রতিনিধি ভিআইপি ব্যাপারটা কি তা-ই?মন্ত্রী এমপিরা ভিআইপি নয় কিন্তু বাস্তবতা কি?তাদের পিএস,এপিএস এলাকায় গেলেই প্রশাসনের দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে যায়৷
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা না হয় ভিআইপির প্রতিনিধিত্ব করে ভিআইপি তারা তাহলে কি?এসব ভিআইপি প্রটোকলের বিড়ম্বনায় অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ৷ তিতাস ঘোষের মৃত্যু হওয়াতে সবুর মন্ডলের বিষয়টা আলোচনায় এলো৷ অন্যগুলো আলোচনায় না থাকলেও জনভোগান্তি ও জন অসন্তোষ সৃষ্টিতে ঠিকই ভূৃমিকা রেখে চলেছে৷সর্বত্রই চলছে বাঁশের চেয়ে কঞ্চি মোটা ঔদ্যত্বের হিড়িক৷ আর বাঁশরাও কঞ্চিদের এসব বিষয় নিয়ে নির্বিকার থাকে৷
সচিবরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী৷ তারা মন্ত্রীকে মন্ত্রনালয় পরিচালয় সহায়তা করবে এর বাইরে তাদের এত গণসম্পৃক্ততার নামে এমন প্রটোকল বাজী কি যৌক্তিক? আরেকটা চমৎকার বিষয় হল কোন উপসচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব যখন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কেউ অথবা কোন মন্ত্রীর একান্ত সচিব হয়ে যায় তখন যেন তারাও ভিআইপি হয়ে যায়৷ কোন এলাকায় গেলে পুলিশ প্রশাসন ব্যস্ত হয়ে ওঠে তাদের ভিআইপি প্রটোকল দিতে৷ কিন্তু এক্ষেত্রে ভিআইপিদের কি বক্তব্য?কারণ তারা যে চাঁদের মত সূর্যের আলোয় আলোকিত৷ রাষ্ট্রপতি,প্রধান মন্ত্রী ও মন্ত্রীর ঘনিষ্টজন এই ইস্যুতে কি তারাও তবে ভিআইপি হয়ে যেতে পারে?আর প্রধানমন্ত্রী ভিআইপি তাই তার মন্ত্রীরাও ভিআইপি, বিষয়টা কি তা-ই?
টিআইবি বলেছে,ভিআইপি’র বিশেষ সুবিধা অসাংবিধানিক, অবৈধ ও বৈষম্যমূলক৷ বাংলাদেশে ভিআইপিদের বিশেষ সুবিধা অর্জনের বিষয়টিকে সুস্পষ্টভাবে ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ বলে উল্লেখ্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড.ইফতেখারুজ্জামান৷ বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “ফেরিঘাটে ছাত্র মারা যাওয়ার ঘটনা ভিআইপি হিসেবে তাদের বিশেষ সুবিধা অর্জনের নামে অসাংবিধানিক, সম্পূর্ণভাবে অবৈধ, বৈষম্যমূলক এবং একই সঙ্গে অনৈতিক ও অমানবিক দিক, পরিষ্কারভাবেই ক্ষমতার অপব্যবহারের দৃষ্টান্ত।
আমাদের সংবিধানে পরিষ্কারভাবে সকল নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, “বাংলাদেশে যে ভিআইপি তার জন্য সুবিধার সীমারেখা রয়েছে। যারা ভিআইপি তাদের কার্যালয় নির্ধারিত, তাদের চেয়ারটা নির্ধারিত, তাদের গাড়িটা নির্ধারিত, তাদের বাড়িটা নির্ধারিত। এই ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে। তবে জনগণের ব্যবহারযোগ্য যে সুযোগ-সুবিধা যেমন রাস্তাঘাট, তা তারা (ভিআইপি ব্যক্তিরা) দখল করে নেবেন বা বন্ধ করে দেবেন – তা কোন ভিআইপি আচরণ হতে পারে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।অথচ কি ঘটছে বাংলাদেশে?
মানুষকে বিপদে ফেলে ও জিম্মি করে ভিআইপি সুবিধা নিতে ব্যস্ত হয়ে উঠছে তারা?কিছুদিন আগে দাবি তোলা হয়, রাস্তার একটা নির্ধারিত অংশ ভিআইপিদের জন্য রাখতে হবে এবং বিমানবন্দরে তাদের নিরাপত্তা তল্লাশি করা যাবে না।মাত্র দুজন ভিআইপির জন্য আলাদা রাস্তা দিয়ে জনদূর্ভোগ বাড়ানো কি যৌক্তিক?তাই আমাদের দাবী কারা ভিআইপি ও কারা ভিআইপি নয় তা পরিষ্কার করা হোক৷ সূর্যের আলোয় আলোকিত চাঁদের মত ভিআইপির আলোয় আলোকিত ভিআইপিদের উপদ্রব বন্ধ হোক৷
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








