রাজধানী ঢাকার অন্যতম ঐতিহ্য নিউমার্কেট। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে এই বিপণী বিতান তার জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে। ঢাকাবাসীর বহু স্মৃতি জড়িয়ে পুরনো এই মার্কেটের সঙ্গে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে নানা অব্যবস্থাপনায় মার্কেটটি হারাতে বসেছে তার প্রাচীন রূপ।
নিউমার্কেটের স্মৃতিচারণ এবং এর প্রতি ভালোবাসা তুলে ধরে ফেসবুকে এক দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিয়েছেন সেবামূলক সংস্থা ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’-এর সমন্বয়ক শাহানা হুদা। ছবিসহ স্ট্যাটাসটিতে তিনি লিখেছেন:
‘আমার ছোটবেলার বেড়ানোর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল নিউমার্কেট। সে সময় ঢাকায় কেনাকাটার আর তেমন কোনো মার্কেটও ছিল না। কিছু কিনতে হলে যেতে হত বায়তুল মোকাররম, রমনা আর নিউমার্কেট। এমনকি গাওসিয়া, হকার্সও ছিল না। আধুনিক ঢাকা তৈরির লক্ষ্যে ১৯৫২ সালে এই নিউমার্কেটের কাজ শুরু হয় এবং শেষ হয় ১৯৫৪ সালে, তৎকালীন নুরুল আমিন সরকারের জামানায়।
বিশেষ করে আমার ছোটখালা যখন পাকশী থেকে ঢাকায় বেড়াতে আসতো, তখন তো আমাদের একেবারে পোয়াবারো অবস্থা। আমি, আম্মা, খালা, লিন্ডা আপা, বাবেল, বিজয় সবাই দলবেঁধে নিউমার্কেটে যেতাম। ওখানে আম্মারা কেনাকাটা করতো। আমরা পিছে পিছে ঘুরতাম। আমাদের মূল আকর্ষণ ছিল লাইট এর প্যাটিস, কেক, নানখাতাই বিস্কুট আর রূপালি রাংতা মোড়ানো নেসস্তার হালুয়া। পাশের দোকানটা ছিল অলিম্পিয়া। সে সময় তো আর এত জাতের আইসক্রীম ছিল না, তাই নিউমার্কেটের নভেলের আইসক্রিম ছিল আমাদের কাছে দারুণ প্রিয়। আব্বার হাত ধরে যখন যেতাম তখন নভেলের ছাতি দিয়ে সাজানো আইসক্রিমটি খেতামই খেতাম।
যখন ইডেন কলেজে ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্রী, তখনও এই নিউমার্কেট ছিল আমাদের মূল ঘোরাঘুরির জায়গা। একটা বই কিনতে ১০ জন যেতাম, কাপড়, ওড়না, ব্যাগ বা স্যান্ডেল কিনতে আরও ক’জন বেশি, এমনকি একটা কার্ড কিনতে নিদেনপক্ষে ৫ জন যেতাম। আসলে টো টো করা্টাই ছিল মজার। চটপটি, ফুচকা খেতে, ছবি তুলতে ও ওয়াশ করতে, গানের ক্যাসেট কিনতে বা রেকর্ড করাতে দিতে, চশমা কিনতে বা চোখের ডাক্তার দেখাতে আমাদের এই নিউমার্কেটেই যেতে হত। বই ও পড়াশোনা রিলেটেড সবধরণের জিনিসপত্র এখানেই পাওয়া যায় সবচেয়ে বেশি এবং তা আজতক। পেছনের চপ কাটলেটের দোকান, দুবাই মার্কেট, লোহা-কড়াই-ডেকচির দোকান, বিভিন্ন মশলা, বিরাট কাঁচাবাজারে সব সবকিছু পাওয়া যায়। আর তাই ছোটবেলাতে, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সংসার জীবনেও এই নিউমার্কেট আমাদের কাছে খুব প্রিয় ও প্রয়োজনীয় একটি মার্কেট।
আমাদের অনেক বন্ধুর প্রেম হয়েছে এখানে ঘুরতে ঘুরতে। পাত্র-পাত্রী দেখানোর জায়গা ছিল এটি । বন্ধুদের মিটিং প্লেসও ছিল এখানে। বন্ধু ইফ্ফাত ও মুন ভাইয়ের নিশ্চয়ই মনে আছে তাদের প্রেমকালীন সময়ে নিউমার্কেটের ভূমিকার কথা, যদিও সেটা ছিল ১৯৮৪/৮৫ সাল। আমরা তো কোন ছাড়, আব্বার কাছেও শুনেছি বিয়ের আগে তারা, বন্ধুরা এখানেই সমবেত হত অফিসের পর। আর অনেকের বিয়ের জন্য কনে দেখার পর্বটিও হয়েছে এখানে।
এখনও অনসূয়া যখন ঢাকায় আসে, তখনও তাকে একবার দু’বার নিউমার্কেট ও নীলক্ষেত মার্কেটে যেতেই হয়। এক কথায় বোঝাতে চাইছি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই মার্কেটটি আমাদের কাছে প্রিয়। কয়েক বছর আগে গিয়ে আমি যখন দেখলাম ৪০/৫০ বছর আগের লাইট বেকারি ও কনফেকশনারিটি উঠে গেছে, আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। ওখানকার ক্যাশে বসা মানুষটি, বিক্রেতাদের চেহারা আমি আজও মনে করতে পারি । যেন ওরা আমার কতকালের চেনা। বইয়ের দোকান জিনাত বুক ডিপো তো আমাদের নিজেদের বইয়ের দোকান হয়ে গিয়েছিল ।
আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি – এতো বড় পরিসরে, এত পরিকল্পনা মাফিক সুন্দরভাবে সাজানো মার্কেট ঢাকায় আর একটাও নাই। সবচেয়ে বড় ব্যাপার ছিল এখানকার ওপেন স্পেস বা খোলা জায়গাটি। ইচ্ছে মতো হেঁটে, গল্প করতে করতে, এদিক-ওদিক দেখতে দেখতে হাঁটা যায়। বাচ্চারা নিজের মতো করে ঘুরতে পারে। গাড়ি ঢুকতো না বলে সবাই বেশ নিরাপদে, আয়েশি ভঙ্গীতে এখানে কেনাকাটা করতে পারে। আমরা আধুনিক বিভিন্ন দেশে দেখেছি। শপিংমলের ভেতরে বা রাস্তায় হাঁটতেই হবে। গাড়ি ঢুকানো যাবে না। দিনে দিনে এই মার্কেটটি বড় হয়েছে, দোকানপাট বেড়েছে, ক্রেতার সংখ্যা বেড়েছে কিন্তু তেমন কোন সৌন্দর্যহানি হয়নি এর। আর এখানে তিনটি গেট মিলে গাড়ি পার্কিং এর দেদার জায়গা আছে, আছে সিকিউরিটি ব্যবস্থা।
সবার মনে হতে পারে আমি কেন নিউমার্কেট নিয়ে এই কাসুন্দি ঘাঁটছি? এটা নিছক অতীত হাতড়ানো নয়। এর যথেষ্ট কারণ আছে। সেদিন নিউমার্কেটে গিয়ে দেখলাম আমাদের প্রিয় জায়গাটি নষ্ট হয়ে যেতে বসেছে। ক্রেতাদের হাঁটার জায়গাটি ক্রমেই গাড়ি পার্কিং এর জায়গা হয়ে যাচ্ছে। আর নিরাপদে এখানে হাঁটা যাচ্ছে না। কারণ ভেতর দিয়ে সমানে গাড়ি চলছে, পার্কিংও করা আছে বহু গাড়ি।

আমি বিক্রেতাদের কাছে জানতে চাইলাম এখানে ভেতরে গাড়ি কাদের? এরা বাইরে পার্কিং করছে না কেন? বলল, ‘সরকারি গাড়ি আর ভিআইপি গাড়ি সব ভিতরে রাখে। হেরা বাইরে পার্কিং করে না। আগে ২/৪ টা ছিল, অহন হালার ভিআইপির সংখ্যা বাড়তাছে। দুইদিন পর হাঁটোনের জায়গা পাইবেন না।’ ৩৫ একর জায়গা জুড়ে না আবার ভিআইপিদের পার্কিং লট বা বাড়িঘর হয়ে যায়, সেই ভয় পাচ্ছি। এদের পাওয়ার কোনো শেষ নাই, পাওয়ানোর চেষ্টা বৃথা তাই।’








