বাংলাদেশে গত এক দশকের ট্রেন্ড হলো নতুন ইস্যু এলেই পুরনো ইস্যু হারিয়ে যায়। মানুষ দুয়েকদিন আলোচনা করে তারপর পুরনো ইস্যু ভুলে গিয়ে নতুন ইস্যু নিয়ে আলোচনায় মেতে উঠে। যে কারণে অনেকে রসিকতা করে বলেন বাংলাদেশের মানুষের মেমরি গোল্ডফিসের মতো। প্রচলিত ধারণা হলো গোল্ডফিস মাত্র তিন সেকেণ্ড কোন কিছু মনে রাখতে পারে। তবে সাম্প্রতিককালে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে বলছেন যে, গোল্ডফিস ১২ দিন পর্যন্ত মনে রাখতে পারে। তিন সেকেণ্ড হোক আর ১২দিন হোক কোনটাই জাতীয় জীবনের জন্য বেশি সময় নয়। আমাদের জাতীয় জীবনের দুভোর্গের জন্য কেউ কেউ এই মনে না রাখতে পারাকে দায়ী করে থাকেন। কারো কারো ধারণা ইস্যুর নিচে ইস্যু চাপা পড়ার যে রেওয়াজ তৈরি হয়েছে তার সুযোগ নিচ্ছে সুযোগ সন্ধানী রাজনৈতিক দলগুলো। মিডিয়া এক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে চলেছে।
তবে দেখে শুনে মনে হচ্ছে সুপ্রিম কোর্টের সামনে স্থাপিত, অপসারিত এবং পুনঃস্থাপিত ভাস্কর্য ইস্যুটি বাংলাদেশে বিভিন্ন আঙ্গিকে আরো অনেকদিন ধরে থাকবে কিংবা আরো অনেকভাবে ঘুরেফিরে আলোচনায় আসবে। ইতোমধ্যে ভাস্কর্য ইস্যুটি আলোচনায় আসার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই এমন কিছু প্রশ্ন তুলেছেন যেটা তারা আগে তোলেননি। যেমন স্বাধীনতাত্তোর চারুকলা কলেজের ১৯৭৬ সালের ব্যাচের ভাস্কর্য বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী তৌফিকুর রহমান তার একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে ভাস্কর্যটি সরিয়ে ফেলাকে সমর্থন করে লিখেছেন “…এ ভাস্কর্যটি যেন অন্য কোথাও স্থাপন না করা হয়।” তিনি এই ভাস্কর্যটিকে মানহীন বলেছেন। তারমতো আরো অনেকেই ভাস্কর্যটিকে মানহীন বলেছেন এবং এটি সরিয়ে নেওয়ায় তাদের স্বস্তির কথা বলেছেন।
গণমাধ্যম ও ফেসবুকে আরো একটি বিষয় আলোচিত হয়েছে এভাবে যে, এটি মূর্তি, ভাস্কর্য নয়। টেলিভিশনের টক শোগুলোতেও দুইভাবে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করতে দেখা গেছে। বিতর্কের তৃতীয় জায়গাটি হলো এটা কি গ্রীক দেবী থেমিসের মূর্তি কিনা? যদিও এর ব্যাখ্যা স্বয়ং ভাস্কর শিল্পী মৃণাল হক দিয়েছেন। তিনি একটি অনলাইন নিউজ মিডিয়াতে দেওয়া সাক্ষাতকারে বলেছেন যে, তিনি একটি বাঙালি মেয়ের ভাস্কর্য বানিয়েছেন কোন গ্রীক দেবীর নয়। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, “দেখেন এটা দেখলে কী পাওয়া যায়? এখানে শাড়ি, ব্লাউজ ও পেটিকোট পরা একটি বাঙালি মেয়ে। এটা কী করে গ্রিক হলো? ড্রেসে নাই, চেহারায় গ্রিক নাই। গ্রিক বললে তো আর গ্রিক হবে না। এটা সম্পূর্ণ একটা বাঙালি মেয়ে। যে মেয়েটি হাতে দাড়িপাল্লা নিয়ে বিচারের প্রতীক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।”
কিন্তু লক্ষণীয় হলো শিল্পী নিজে বলার পরও গণমাধ্যমে এটিকে গ্রিক দেবী থেমিসের ভাস্কর্য বলে চালানো হয়েছে। পুরো বিষয়টি এমনভাবে এগিয়ে গেছে যে, এটি শিল্পের মানদন্ডের বিচারে নয় রাজনৈতিক বিবেচনায় অপসারণ ও পুনঃস্থাপনের বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। এরই মধ্যে শিল্পী মৃণাল হক মিডিয়াতে বলতে থাকেন যে, “আমি দেড় থেকে দুই কোটি টাকা লস খেয়েছি।” তার এই দাবী ফেসবুক মিডিয়াতে অনেক আলোচনার জন্ম দেয়। সেই সব আলোচনার সারাংশ খুঁজে পাওয়া যায় ফেসবুকে ডাঃ নাসির উদ্দিনের দেওয়া এক স্ট্যাটাসে। তিনি কতগুলো প্রশ্ন করেন এভাবে:
১. মৃনাল হককে এই ভাস্কর্য বানাতে কে বলেছিল? তাকে কি কোন সরকারি প্রতিষ্ঠান এই কাজের জন্য নির্দেশ দিয়েছিল? ২. কোন সরকারি প্রতিষ্ঠান তাকে এই কাজ দিয়ে থাকলে তার সম্মানী কতো ছিল? ৩. সরকারি প্রতিষ্ঠান যদি এটির ব্যয় বহন না করে থাকে, তা হলে শিল্পী কি নিজ খরচে ও শ্রমে এটা করেছেন? তিনি তা করতেই পারেন। সেটি সবাইকে জানানো হোক। ৪. উল্লিখিত সম্ভাবনাগুলো যদি বেঠিক হয়, তবে কি কোন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এর ব্যয় বহন করেছিল? যদি তা হয়, তবে কোন সেই প্রতিষ্ঠান? ৫. ভাস্কর্য টি কোথায় স্থাপন করা হবে তা কে নির্ধারণ করেছিল? সুপ্রিম কোর্ট না অন্য কোন সরকারি অফিস? সরকারি স্থানে এটি স্থাপন করতে নিশ্চয় অনুমতির ব্যাপার ছিল। ৬. যদি সরকারি খরচে হয়ে থাকে তাহলে সরকারি ক্রয় নীতি কি মেনে অথবা টেন্ডার প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এটা নির্মাণ করা হয়েছিল?
কিন্তু এসব প্রশ্নের উত্তর ফেসবুকে কাউকে দিতে দেখা যায়নি। এদিকে ফেসবুকে যা হয়। সবাই যার যার মতো করে লিখতে থাকেন। একটি সুনির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া যায় না। এমনকি সাধারণ একটি প্রশ্ন- ভাস্কর্য ও মূর্তির মধ্যে পার্থক্য কি সেটাও জানা হয় না। যেহেতু আমি ব্যক্তিগতভাবে ভাস্কর তৌফিকুর রহমানকে চিনি, তাই বিষয়গুলো নিয়ে তার সঙ্গে আলাপ করার সুযোগ নিলাম। আলোচনার শুরুতেই তিনি বললেন, ভাস্কর্য বিতর্ক শুরু হওয়ার পর অনেকেই কেন যেন ভাস্কর্যকে মূর্তি বলতে ভয় পায়। সেকারণে তারা মূর্তি না বলে ভাস্কর্য বলছে। প্রকৃতপক্ষে ভাস্কর্য ও মূর্তি একই; অনেকটা লাউ ও কদু কিংবা ডিম আর আন্ডার মতো ব্যাপার। যেনামেই ডাকুক না কেন জিনিস একই। সেসঙ্গে একথাও মনে রাখতে হবে মূর্তি মানেই কিন্তু পূজা করা নয়। যেকোন কিছু একটা মূর্ত রূপ ধারণ করলেই সেটা মূর্তি। একজন মানুষ একটি জায়গায় স্থির হয়ে নিজেই মূর্তি হতে পারেন। সেটা কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টার জন্য হতে পারে।
আমি তার কাছ থেকেই জানতে পারলাম সত্তরের দশকে তারা যখন চারুকলা কলেজে পড়তেন তখন ভাস্কর্য বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যারা ছিলেন তাদের কারো ব্যাকগ্রাউন্ড ভাস্কর্য নয়। তারা কেউ গ্রাফিকস, পেইন্টিং, সিরামিকস কিংবা চারুকলার অন্য কোন বিভাগে লেখাপড়া করেছেন। যেমন তখনকার ভাস্কর্য ডিপার্টমেন্টের প্রধান আবদুর রাজ্জাক নিজে ছিলেন গ্রাফিকসের ছাত্র । এছাড়াও শিক্ষক হিসেবে ছিলেন স্বনামধন্য শিল্পী হামিদুজ্জামান। কিন্তু তারা কেউই ভাস্কর ছিলেন না। তাদের লেখাপড়ার মূল বিষয়বস্তুও ভাস্কর্য ছিল না। এতে কি সমস্যা হয়েছিল সেসম্পর্কে ভাস্কর তৌফিকুর রহমান বলেন, ফলে আমরা ভাস্কর্যের ত্রিমাত্রিক বিষয়টা সেভাবে শিখতে পারিনি। আমাদেরকে ভাস্কর্য বিদ্যা অর্জনে বেগ পেতে হয়েছে। আমরা কতোটা কম শিখেছি তা চীনে এমএফএ করার সময় বুঝতে পারলাম।
কিন্তু একথাও ঠিক যে তারা যখন চারুকলায় পড়েছেন তখন দেশে ভাস্কর ছিলেন। কিন্তু তারা শিক্ষক হিসেবে কাজ করেননি। যেমন নভেরা আহমেদ। তৌফিকুর রহমান বলেন, নভেরা যদি আমাদের শিক্ষক হতেন তাহলে হয়তো ডিপার্টমেন্টের শিক্ষা কার্যক্রম অন্য মাত্রায় চলে যেতে পারত। গুণগত দিকগুলো অনেক বেশি বাড়তে পারত। কিন্তু সেটা হয়নি। তবে আশার কথা হলো পরবর্তীতে আমাদের পরের প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা ভাস্কর্য ডিপার্টমেন্টে ভাস্করদের মাধ্যমেই শেখার সুযোগ পেয়েছে। ফলে নতুন প্রজন্মের ভাস্করদের মধ্যে অনেক মেধাবী ভাস্কর তৈরি হয়েছে। কিন্তু দেশে এখন যখন কোন ভাস্কর্য তৈরি হয় তখন দেখা যায় সেই কাজ তরুণ মেধাবী ভাস্কররা পান না। সেই কাজগুলো চারুকলা নয়, বরং ব্যবসা ভালো বোঝে এমন কারো হাতে চলে যায়। এখন দেশে শিল্পীরা নন, চারুকলায় পড়া ব্যবসায়ীরা ভাস্কর্য তৈরি করছেন।
আমাদের ঢাকা শহরেই ২৫টির বেশি কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ও নিউইয়র্কে কাজ করার দাবীদার এবং বর্তমানের আলোচিত ভাস্কর্যের শিল্পী মি. মৃণাল হকের কাজগুলোকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে মি. তৌফিকুর রহমান বলেন যে, মৃণাল হক আমাদের সমসাময়িক সময়ে চারুকলা কলেজে লেখাপড়া শুরু করেছিল সিরামিকস ডিপার্টমেন্টে। পরবর্তীতে স্কাল্পচার ডিপার্টমেন্টে আসে। যতোদূর মনে পড়ে আমাদের ডিপার্টমেন্টে আমার জুনিয়র হয়েই ভর্তি হয়েছিল। যদিও সিরামিকসে থাকাকালীন আমার সিনিয়র ছিল। একজন শিল্পীকে সবসময় কাজে ও কথায় সৎ হতে হয়। তিনি কিভাবে কাজগুলো সংগ্রহ করেন এবং কাজগুলো করে থাকেন সেটি যদি তিনি প্রকাশ্যে বলেন তাহলে তার শিল্পী সত্তার সত্যিকারের পরিচয় পাওয়া যেতো।
আমি একজন শিল্পী হিসেবে মনে করি বাংলাদেশে ভালো মানের ভাস্কর্য তৈরি হওয়া দরকার। শিল্পীরা সবসময় কাজকে গুরুত্ব দেয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মৃণাল হক যতোগুলো কাজ করেছেন কিংবা কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন সেগুলো তিনি নিজে না করে তরুণ ও মেধাবী ভাস্করদের রেফার করতে পারতেন। যারা কাজগুলো আরো ভালোভাবে করতে পারত বলে আমি মনে করি। কারণ কেউ যদি সত্যিকারের শিল্পী হন তিনি নিজের কাজের ভালোমন্দ বুঝতে পারেন। পিকাসো পর্যন্ত নিজের কাজ ফেলে দিয়েছেন। যখন কোন কাজ জনগণের জন্য উম্মুক্ত করা হয়, সেটা যদি ভালো মানের না হয় সেক্ষেত্রে প্রকৃত শিল্পীর দায়িত্ব হলো সেই কাজটি নিজেই সরিয়ে নেওয়া। যে দায়িত্বটি শিল্পী হিসেবে মি. মৃণাল হক পালন করতে পারেননি। সেদিক থেকে মি. হকের দুর্বলতা আছে। পাশাপাশি গণমাধ্যমে মৃণাল হককে ফোকাস করার আগে তার সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ খবর না নেওয়ায় বিভ্রান্তির পরিমাণ বেড়েছে।
গত কয়েকদিনের আলোচনা সমালোচনা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, বাংলাদেশে অন্য অনেক ক্ষেত্রের মতোই ভাস্কর্য তৈরি ও স্থাপনে এক ধরনের অস্বচ্ছতা রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের কমিশন্ড করা কাজগুলো বিজ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে কিংবা টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কিংবা বাছাই কমিটির মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হয় কিনা তা সুস্পষ্ট নয়। বোঝা যাচ্ছে দুয়েকটা উদাহরণ থাকলেও সেখানে বাছাই কমিটির বা টেকনিক্যাল কমিটির বিচারকদের ভূমিকা থাকে খুবই দুর্বল।
ঢাকা শহর আয়তনে বাড়ছে। আগামীতে আরো বাড়বে। আর শহরের সৌন্দর্য্য বাড়াতে নতুন নতুন ভাস্কর্য তৈরি হবে সেটাই স্বাভাবিক। সেই সকল ভাস্কর্য বা মূর্তি তৈরিতে সত্যিকারের ভালো মানের মেধাবী তরুণরা তাদের কাজ দেখানোর সুযোগ পাবেন সেই আশা আমরা করতেই পারি। এই অবস্থায় বাংলাদেশে উন্নতমানের ভাস্কর্য তৈরির চর্চার জায়গা তৈরির জন্য বিভিন্ন পক্ষের দায়িত্ব পালনের সুযোগ আছে। যখন কোন প্রতিষ্ঠান সেটা সরকারি কিংবা বেসরকারি যেটাই হোক না কেন, ভাস্কর্য বা মূর্তি বানানোর সিদ্ধান্ত নেবে তখন পুরো প্রক্রিয়াটিকে স্বচ্ছতার সঙ্গে বিজ্ঞাপন দিয়ে উম্মুক্ত টেন্ডারের মাধ্যমে করার দরকার আছে। টেন্ডারের ক্ষেত্রেও কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। এখন দুই চারটা যে কাজের টেন্ডার হয় সেখানে দেখা যায় চারুকলা নেই, আছে প্রথম শ্রেণির ঠিকাদারের বিষয় আশয়। আগে কতো টাকার কাজ করেছেন, ব্যাংকে কতো টাকা আছে এই সব। ফলে নতুন মেধাবী তরুণ শিল্পীরা কাজ করতে পারছেন না। এই অবস্থায় সিনিয়র শিল্পীদের সময় হয়েছে সরে গিয়ে নতুন প্রজন্মকে জায়গা করে দেওয়া।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








