বৃহস্পতিবার (২৫ মে) রাত ১২টার পর সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে ন্যায়ের প্রতীক ভাস্কর্যটি সরিয়ে নেওয়া হলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যায়। সংস্কৃতিশিল্পী, শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট, ব্লগার, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ প্রতিবাদ জানিয়েছে।
সাংবাদিক প্রভাষ আমিন ফেসবুকে লিখেছেন: প্রতিবাদের সকাল আজকের সকালটিকে কিছুতেই শুভ বলা যাচ্ছে না। এমন অন্ধকার ভোর বাংলাদেশ খুব বেশি দেখেনি। হেফাজতে ইসলামের দাবির মুখে রাতের অন্ধকারে সরিয়ে ফেলা হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের সামনের ভাস্কর্যটি। এ নিছক একটি ভাস্কর্যের ওপর আঘাত নয়, এ আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের ওপর অাঘাত। এরপর একে একে হেফাজত তাদের কুৎসিত সব দাবি নিয়ে সামনে আসবে। এই অপশক্তিকে রুখতে হবে এখনই। আমি নিশ্চিত জানি, হেফাজতের অপছায়া একদিন দূর হবেই। বাংলাদেশ আবার ঝলমল করে হাসবে এই শাপলাটির মতই।
শহীদ আলতাফ মাহমুদের মেয়ে শাওন মাহমুদ লিখেছেন: ২৫শে মার্চ ১৯৭১ অপারেশন সার্চলাইট থেকে অনুপ্রাণিত ২৫শে মে ২০১৭ অপারেশন জাস্টিসিয়া ভাস্কর্য অপসারণ।
প্রবাসী সাংবাদিক ফজলুল বারী লিখেছেন: আপন জুয়েলার্সের ধর্ষকদের জামিন দিতে হবে। জেলখানায় ছ্যাচা দিতে হবে বেয়াদব হিন্দু শিক্ষক শ্যামল কান্তিকে। তোমরা এখন সুপ্রিমকার্টের ভাস্কর্য নিয়ে ব্যস্ত থাকো!
ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলী রিয়াজ লিখেছেন, ঢাকায় জিপিওর সামনে স্থাপিত বর্ষা নিক্ষেপের ভাস্কর্য্যটি রাতের অন্ধকারে সকলের অগোচরে সরিয়ে ফেলার ঘটনার কথা কি কারো মনে আছে? সেটা কোন সালের ঘটনা? কিংবা মনে করতে পারেন বিমানবন্দরের সামনে থেকে বাউলের ভাস্কর্য্য সরানোর ঘটনা? সেটাই বা কবে ঘটেছিলো? সেই সময়ে কে কি বলেছিলেন? মনে করতে না পারলে অসুবিধা নেই – ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। মূল চরিত্রের বদল হয় মাত্র। আর হ্যাঁ, পুনরাবৃত্ত ইতিহাস হচ্ছে প্রহসন সেই প্রহসনের স্বাক্ষী হয়ে থাকা কম ভাগ্যের কথা নয়। প্রহসনের নায়ক-নায়িকারাও ‘শিল্পী’, কিংবা পুতুল নাচের উপাদান। 
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কারপ্রাপ্ত চিত্রনাট্যকার ও লেখক মাসুম রেজা লিখেছেন, তবে কী হেরে গেলাম আজ রাতে? একাত্তুর কী তবে পাশ ফিরে শুলো।
কানাডা ভিত্তিক নিউজ পোর্টাল নতুন দেশের সম্পাদক শওগাত আলী সাগর লিখেছেন: সুপ্রিম কোর্ট চত্বর থেকে রাতের আঁধারে ‘ভাস্কর্য’ সরিয়ে ফেলা নিয়ে ফেসবুকে বেশ প্রতিক্রিয়া দেখছি। প্রতিবাদী কিছু মানুষ রাতের বেলায় মুষ্টিবদ্ধ হাত উপরে তুলে শ্লোগান দিয়েছেন, মিছিল করেছেন। সংখ্যার হিসেবে এই প্রতিক্রিয়া বা প্রতিবাদটা সম্ভবত বড় কিছু নয়। তবু কিছু মানুষ প্রতিবাদ তো করেছে- এইটুকু সান্তনা পাওয়ার পথও করে দিয়েছেন তারা।
যারা ‘ভাস্কর্য’ সরানো নিয়ে প্রতিবাদ করছেন- তাদের কাছে এটা আদর্শের লড়াই।যারা ‘ভাস্কর্য’ সরানোর দাবি তুলেছিলো- তাদের কাছেও এটা আদর্শের লড়াই। সরকারের কাছে এটা মোটেও আদর্শের লড়াই নয়। সরকারের কাছে হয়তো ভিন্ন কিছু।
সরকারের কাছে আসলে বিষয়টা কি? সরকারের কাছে খুব সম্ভবত ‘শক্তি’টাই বিবেচনা পেয়েছে। কাল যদি ‘ভাস্কর্যের’ পক্ষে শক্তি দেখানোর প্রশ্ন ওঠে- কারা জিতবেন? কারা সবচেয়ে বেশি লোক দেখাতে পারবে? প্রগতিশীল কোনো কোনো সম্পাদকও যখন এই ভাস্কর্যটাকে ‘আবর্জনা’ মনে করেন- তখন সাধারন মানুষকে আপনি আপনার পাশে পাবার আশা করেন কিভাবে?
আপনি হয়তো বলবেন- সরকার হেফাজতের দাবির কাছে মাথানত করেছে। তাতে সমস্যা কি? সরকার সবসময়ই শক্তিমানের কাছে, শক্তির কাছেই মাথা নত করে। এটাই তো ইতিহাসের শিক্ষা। হেফাজত তার শক্তির বিস্তৃতি ঘটিয়েছে, আর আমরা, আপনারা- নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে শক্তিক্ষয় করেছি। সরকার আমাদের কথা কেন শুনবে?
সরকার জানে, রাষ্ট্রের দুর্নীতি, অনাচার নিয়ে আমরা প্রতিবাদে মাঠে নামবো না। কারন আমরা এই সরকারকে ভালোবাসি। সরকার জানে সুপ্রিম কোর্টের স্বাধীনতা খর্ব করার, উচ্চতর আদালতকে ‘পঙ্গু’ করার কোনো চেষ্টা- উদ্যোগেরই আমরা প্রতিবাদ করবো না।
রাস্তা গরম করার মতো কোনো বিরোধী দলও দেশে নেই। কোনো গোষ্ঠী মাঠে নামলে পিটিয়ে তাদের উঠিয়ে দেওয়া যাবে। টুপিওয়ালারাই একমাত্র গোষ্ঠী যাদের পিটাপিটিতে সরকার তেমন আগ্রহী নয়। অনাগ্রহের পেছনেও কিন্তু কোনো আদর্শ নেই। আছে এই গোষ্ঠীটির ক্ষমতা। ধর্মের নাম করে এই গোষ্ঠীটি যে কোনো সময় মাঠ গরম করে ফেলতে পারে। এখন কেবল এই গোষ্ঠীটিই পারে। সরকার এই গোষ্ঠীকে চটাতে যাবে কেন?
আপনি যদি সরকারকে আপনার কথা শুনাতে চান- তা হলে আপনার শক্তি বাড়ান। নিজেদের শক্তিশালী করুন। তারও আগে ‘সরকার আপনার প্রেমিক’- এই বোধটা ভেঙ্গে ফেলুন। সরকার তথা রাষ্ট্র কখনোই কারো প্রেমিক হয় না। তারা প্রেমিকের ভাব করে, জনতার ক্ষোভ বিক্ষোভকে বঞ্চিত প্রেমিকার অভিমান ভেবে উপেক্ষাই করে।
আবারো বলি, সরকার বলেন, রাষ্ট্র বলেন- তারা ক্ষমতা দেখে, তারা কখনো কাউকে ক্ষমতা দেয় না। ‘শক্তি’ দেখেই তারা কাকে কাছে টানবেন, কাকে দুরে ঠেলবেন- সেই সিদ্ধান্ত নেন।







