ভারতের প্রশ্নফাঁসের খবরে হয়তো বাংলাদেশের প্রশ্নফাঁসের অস্বাভাবিকতাকে এখন বেশ স্বাভাবিক হিসেবে তুলে ধরা হবে। কারণ এদেশে একের দোষ দেখিয়ে অন্যের দোষকে খাটো করে দেখার প্রবৃত্তি খুবই দৃশ্যমানভাবে সক্রিয় রয়েছে। এখন হয়তো কেউ কেউ বলবে, ‘প্রশ্নফাঁস নিয়ে এত মাতামাতির কী আছে? ভারতের মত দেশেও তো প্রশ্ন ফাঁস হয়।’
রাজনীতিতে বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে নিজেদের দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন ও নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে স্বাভাবিক করে নিতে উপমা হিসেবে দাঁড় করায় বিগত দিনের আওয়ামী লীগ আমলের দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন ও অনৈতিকতার নজীর। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে ক্ষমতাপক্ষীয়রা তখন তুলে ধরে বিএনপি আমলের দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন ও অনৈতিকতার নজীর।
একজন সংসদ সদস্য সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকেন তার প্রতিপক্ষের দোষ-ক্রুটি তুলে ধরতে। গ্রামে-গঞ্জে দেখা যায়, চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার আগে ও পরে দু্’সময়েই তার প্রতিদ্বন্দ্বীর নানা নেতিবাচক দিক তুলে ধরে নিজের ইতিবাচক অবস্থান তুলে ধরতে চেষ্টা করে। অপরজনের অধিক নেতিবাচকতা উপস্থাপন করে নিজের নেতিবাচকতাকে ঢেকে দিতে চেষ্টা করে তারা। তেমনি একজন মন্ত্রীও যখন তার নানা কর্মকাণ্ডে সমালোচিত হয়ে ওঠেন তখন তিনিও বিগত দিনের মন্ত্রীর অনুরূপ কর্মকাণ্ডকেই নজীর হিসেবে তুলে ধরে ধরতে তৎপর হন। এভাবে সর্বত্রই রক্ষিত হওয়ার চেষ্টা চলছে নেতিবাচকতা দিয়ে নেতিবাচকতা রক্ষার অপচেষ্টা। নেতিবাচকতাকে সহনশীল করতে প্রয়োগ হচ্ছে পূর্ববর্তীদের নেতিবাচকতার উদাহরণ। কে কার চেয়ে কত বড় চোর, কে কার চেয়ে কত বড় ডাকাত, কে কার চেয়ে কত বড় লুটেরা এগুলোর ব্যাখ্যা দেয়া হয়।
এমন কথাও বলতে শোনা যায়, সে খুনি কিন্তু নিজের এলাকায় খুন করে না। আরেকজনকে দেখিয়ে বলা হয়, খুনি হলেও তার মত এতটা জঘন্য খুনি নয় সে। বলতে শোনা যায়, সে ধর্ষক কিন্তু শিশু ধর্ষক নয়। শিশু ধর্ষণকারী ও শিশু ধর্ষণ না করা ধর্ষক, এ দুয়ের তুলনায়ও মূল্যায়ন করা হয়। তখন শিশু ধর্ষণ না করা ধর্ষক জনমতে উত্তীর্ণ হয়ে যায়। জনমত অর্জনের বৈতরণি পাড় হয়ে শিশু ধর্ষণ না করা ধর্ষকও একদিন হয়ে যায় শিশু ধর্ষণ কারী। তখন তার অপকর্মের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য প্রতিপক্ষের অনুরূপ অপকর্মকে নজীর হিসেবে উপস্থাপন করবে। বলবে, আমার ঘটনা নিয়ে এত মাতামাতি হচ্ছে কেন?এমন কাজতো আমার আগের লোকও করেছে। তখন হয়তো জনতার মাঝেও দেখা দেবে ভিন্ন সুর। এর চেয়ে আগেরটাই ভাল ছিল সে নিজের গাঁয়ে এসব করতো না। এমন পরিস্থিতিতে জনমত আবার সেই আগের লোকের পক্ষেই চলে যায়। অল্পদিনেই ফের তার জনমত পৌঁছে যায় শূন্যের কোঠায়। তখন জনমনে ঠাঁই করে নেয় আগের জন।অপকর্ম দিয়ে অপকর্ম ঢেকে ফেলার অপচেষ্টা একটি চরম অসুস্থ প্রতিযোগিতা!
এরকম ভয়াবহ নজীরের প্রতিযোগিতাই আমাদের সমাজ,সংস্কৃতি ও রাজনীতির সর্বনাশ ঘটাচ্ছে। নীতি ও নৈতিকতা পঁচে গলে বর্জ্য ছড়াচ্ছে সর্বত্র। নেতিবাচকতা দিয়ে জনতার কাছে সৃষ্টি করে চলেছে ইতিবাচকতা। ভারতের প্রশ্ন ফাঁসও এখন ব্যবহৃত হবে বাংলাদেশের প্রশ্ন ফাঁসের সমালোচনার জবাবে। বাংলাদেশে প্রশ্ন ফাঁস এমন আকার ধারণ করেছে যে তা মোকাবেলায় র্যাবের হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে। প্রশ্ন ফাঁসকারীদের বলা হচ্ছে প্রশ্ন সন্ত্রাসী। এমনই একটা চরম সময়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে প্রশ্ন ফাঁস হল। নেতিবাচকতা দিয়ে অনেকেই সৃষ্টি করে চলছে নিজের ইতিবাচকতা। শিক্ষা বিভাগের কর্তা ব্যক্তিরা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে এখন ভারতের প্রসঙ্গটা তুলে ধরবে। অনেককেই বলতে শোনা যাবে, প্রশ্ন ফাঁস কি কেবলই বাংলাদেশে? ভারতেও তো হচ্ছে। কিন্তু তারা দক্ষিণ কোরিয়ার মন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়টা বলবে না। কারণ এটা বললে নিজের পদটা নড়বড়ে হয়ে যায়। এটা তার নেতিবাচকতার পক্ষে সহায়ক হবেনা তাই।
চারিদিকে এমনই নোংরা রীতি দৃশ্যমান হচ্ছে যে কেউই আর ভাল দিকগুলোকে অধিকতর ভাল করতে ভালোর দৃষ্টান্ত গুলোকে টেনে আনছে না। কিন্তু মন্দ কাজ রক্ষায় ঠিকই মন্দ কাজের উদাহরণ নিয়ে আসছে। জনমতের প্রতিফলন কিভাবে হয়? ধরা যাক, একই এলাকায় যদু ও মধু নামের দুজন নির্বাচনে দাঁড়ালো। ফলাফলে মধু পাস করল। তখন যদু পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত কেবলই মধুর নেতিবাচক দিক খুঁজে বেড়াবে আর মানুষকে বলবে, আমাকে ভোট না দিয়েতো সব ভোট দিয়ে দিলে মধুকে। দেখো এবার কি মধু খাওয়াচ্ছে তোমাদের মধু। মধুর নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে বিরক্ত জনতা তখন বলবে আর মধুকে নয় এবার যদুকেই দেব। পরবর্তী নির্বাচনে মধুর হার নিশ্চিত হল। যদু জিতে গিয়ে শুরু করল মধুর চেয়েও অনেক বেশী নেতিবাচক কর্মকাণ্ড। তখন আবার মানুষ বলবে যদু যা শুরু করেছে তার চেয়ে মধুই ভাল ছিল। যদুর প্রতি সমর্থন নয় মধুর প্রতি বিরোধিতাই যদুর পক্ষে চলে গেল। এরপর আবার যদুর অধিক নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে জনমত ঘুরে আবার ফিরে যাবে মধুরই কাছে। এভাবেই অনন্যোপায় জনমত একবার যাচ্ছে যদুর দিকে আরেকবার মধুর দিকে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)।








