আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী এবং বর্তমানে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ- জাতীয় স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য। চট্টগ্রামের রাজনৈতিক গন্ডি পেরিয়ে বিএনপির জাতীয় রাজনীতিতে জোরালো অবদান রেখে চলেছেন। ১৯৪৯ সালে চট্টগ্রামে জন্ম নেয়া আমীর খসরু মাহমুদের পিতা আলহাজ্ব মাহমুদুন্নবী চৌধুরী ছিলেন ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে অত্র এলাকা হতে নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য এবং যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রী।
ছেলেবেলা থেকেই রাজনৈতিক পরিবেশে বড় হওয়া এই রাজনীতিবিদ চট্টগ্রাম কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন ১৯৬৯ সালে। তারপর উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য চলে যান যুক্তরাজ্যে। লন্ডন থেকে হিসাব বিজ্ঞানে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করে স্বদেশে ফিরে আসেন। শিক্ষা জীবন শেষ করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পিতার ব্যবসার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কর্মজীবনের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সক্রিয় রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষা, ক্রীড়াসহ জনসেবামূলক কাজ করে চলেছেন।
বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে একান্তে কথা বলেছেন চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে-
চ্যানেল আই অনলাইন: বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আপনারা কোন প্রক্রিয়ায় কাজ করছেন?
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: আমরা এখনো আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি। যদিও দেশনেত্রীর নামে মামলা এবং তাকে কারাবন্দি করার বিষয়টি আইনি বিষয় নয়, এটি পুরোপুরি রাজনৈতিক বিষয়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে বেগম খালেদা জিয়া এখনো জামিন পাচ্ছেন না। অসুস্থতা সত্ত্বেও কোনো চিকিৎসা পাচ্ছেন না। বিএনপি আইনের শাসনে বিশ্বাস করে বলেই এখনো আইনি প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। যদিও দেশে কোনো আইনের শাসন নেই। মূলত এই সরকার খালেদা জিয়াকে নির্বাচনের বাইরে রেখে ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। অবৈধ ক্ষমতা দখলের অংশ হিসেবেই তারা রাষ্ট্রের সকল স্পেস বন্ধ করে দিচ্ছে। তাদের লক্ষ্য একদলীয় শাসন নিশ্চিত করা। সরকার জনগণের অধিকার হরণ করে নিচ্ছে।
চ্যানেল আই অনলাইন: তাহলে এই অবস্থায় আপনাদের পদক্ষেপ কী?
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: এটি তো শুধু বিএনপির বিষয় নয়। জনগণের বিষয়। জনগণ অধিকারহীন। সকল কিছু থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শুধু ভোটাধিকার নয়, আইনের শাসন বঞ্চিত। বাক স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হচ্ছে। মিছিল-মিটিং, সভা করার অধিকার হারাচ্ছে জনগণ। সব কিছু বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। স্বৈরাচারি সরকারগুলো এভাবেই সবকিছু বন্ধ করে দেয়। তারপর একতরফাভাবে সবকিছু করে। এভাবে চলতে পারে না। জনগণকেই ঘুরে দাঁড়াতে হবে।
চ্যানেল আই অনলাইন: একদিকে খালেদা জিয়া কারাবন্দি, তারেক রহমানেরও সাজা হয়েছে (লন্ডনে আছেন), আপনারা মিছিল-মিটিং, সভা-সমাবেশ করতে পারছেন না। সরকারও কোনো ছাড় দিচ্ছে না। এই অবস্থায় আপনাদের অন্য কি কৌশল আছে?
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক দল। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশের গণতন্ত্রের পুন:প্রবর্তন করেছেন। তার সহধর্মীনি বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের কারণে ৭৩ বছর বয়সে এসেও কারাগারে বন্দি আছেন। কাজেই গণতান্ত্রিক পথ ছাড়া আমাদের আর কোনো কৌশল নেই। আমরা গণতান্ত্রিক পথেই আছি। জনগণের অধিকার আদায়ের জন্যই খালেদা জিয়া কারাগারে। কাজেই এটি শুধু বিএনপির ইস্যু নয়। জনগণ যখন সকল অধিকার হারিয়ে ফেলছে তখন তাদেরকেই অবস্থান নিতে হবে। জনগণকে সামনে আসতে হবে। ঘুরে দাঁড়াতে হবে। যদিও মানুষ প্রতিবাদ করছে। কিন্তু কোনো স্পেস তো নেই। তাপরও তারা বসে নেই। রাষ্ট্র যখন সন্ত্রাস হয়ে যায়, সরকার যখন সন্ত্রাসী আচরণ করে তখন মানুষ রুখে দাঁড়ায়। মূল বিষয়, গণতান্ত্রিক স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নেই। সকল কিছু তো ভেঙে দিয়েছে সরকার। দেশে যদি প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া না থাকে তাহলে অন্য শক্তি সামনে চলে আসে।
চ্যানেল আই অনলাইন: বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম খবর বেরিয়েছে, শেষ পযন্ত খালেদা জিয়াকে ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে যাবে, এটা কতোটা সত্য?
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: এমন কোনো সিদ্ধান্ত আমাদের মধ্যে হয়নি। এই ধরনের সংবাদ তারা কোথায় পেলো? যিনি দলের মূলশক্তি, যিনি দেশের গণতন্ত্রের জন্য, মানুষের ভোটাধিকারের জন্য, মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য কারাগারে বন্দি আছেন তাকে ছাড়া নির্বাচনে গেলে জনগণ কি তা মেনে নেবে? তাদের কাছে কি সে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে? জনগণ কি সেরকম কিছু হতে দেবে? সেই প্রশ্নই আমি আপনাদের কাছে রাখলাম।
চ্যানেল আই অনলাইন: গাজীপুর-খুলনা সিটি নির্বাচনে আপনারা কী আশা করছেন?
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: এই সিটি নির্বাচন মূল বিষয় নয়। মূল বিষয় হলো, মানুষের অধিকারের সমস্ত স্পেস বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে নির্বাচনে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সংসদ ভেঙে দেয়া এবং সেনাবাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা ইত্যাদি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া তো তারা ভেঙে দিয়েছে। এটা তারা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের অংশ হিসেবে করেছে। আমরা চাই এগুলোর পুন:প্রবর্তন। এগুলো জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতেই হয়েছিলো। স্থানীয় নির্বাচনে কাকে কয়টি আসন ছেড়ে দিলো, কে হারলো, কে জিতলো এটা তেমন বড় কিছু ব্যাপার নয়। আসল কথা হলো গণতান্ত্রিক স্পেস খুলে দেওয়া। সবকিছু বন্ধ করে রেখে কখনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আশা করা যায় না। সিটি নির্বাচনে জেতা না জেতার ওপর কোনো ইমেজ নেই। তার আগে যেসব স্পেস দখল করা হয়েছে তা ফিরিয়ে আসতে হবে, যেসব আইন পরিবর্তন করা হয়েছে তা পুন:প্রবর্তন করতে হবে।
চ্যানেল আই অনলাইন: শোনা যাচ্ছে আওয়ামী লীগের মতো বিএনপিরও প্রতিনিধি দল ভারত সফরে যাচ্ছে?
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: এবিষয়ে আমি কিছুই জানি না এমন কোনো আমন্ত্রণ পেয়েছে বলে আমার জানাই নেই। তবে হ্যাঁ, প্রতিটি রাষ্ট্রের সঙ্গেই আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ- দলের পক্ষ থেকে আমাদের দলের কাছে আমন্ত্রণপত্র আসে। সেসব আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে আমরা বিভিন্ন দেশে ও দলের বিভিন্ন আয়োজনে যাই কিংবা প্রতিনিধি পাঠাই। সেক্ষেত্রে ভারতের কোনো দল যদি আমাদের আমন্ত্রণ জানায়, আমরাও যাবো। বিশেষ করে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক তো থাকতেই পারে। তবে এক্ষেত্রে আমাদের জাতীয় স্বার্থ কোনো রকম ছাড় দিয়ে নয়। জাতীয় স্বার্থের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আমাদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে। যদি পরস্পরের স্বার্থগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো যায়, তাহলে সে সম্পর্ক আরো গভীর হয়।







