চট্টগ্রাম থেকে: ক্রিকেট অঙ্গনে টাইগার শোয়েব বেশ পরিচিত। যেখানে বাংলাদেশ দলের খেলা, সেখানেই হাজির হন বাংলাদেশের পতাকা আর বাঘের অবয়ব নিয়ে। টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে সংযুক্ত আরব আমিরাতে যাওয়ার জন্য শোয়েবকে পৃষ্ঠপোষক এনে দেন তামিম ইকবাল। মহানুভবতার অন্য একটি গল্পে জড়িয়ে টাইগার ক্রিকেটের আরও দুই পাণ্ডব মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ও মুশফিকুর রহিম।
বাংলাদেশ-আফগানিস্তান তৃতীয় ওয়ানডে শুরুর আগে জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে পতাকা ওড়াচ্ছিলেন এক যুবক। সারা শরীরে রং-তুলির আঁচড়ে সেজেছেন বাঘ। বুকে লেখা ‘মুশফিক ভাই, রান মেশিন’।
মুশফিককে সমর্থন দিতে আসা যুবকের নাম রবিউল ইসলাম রবি। বাড়ি খুলনার খালিশপুরে। যে এলাকা থেকে উঠে আসা মেহেদী হাসান মিরাজ, আফিফ হোসেন ধ্রুব, নুরুল হাসান সোহানদের।
রবিও ক্রিকেট খেলতেন একটা সময়। খুলনার স্বনামধন্য ইউনিটি ক্রিকেট একাডেমিতে করতেন অনুশীলন। আর্থিক অনটনে বেশিদূর এগোতে পারেননি। পরে ঢাকায় গিয়ে টিম বয়ের কাজ শুরু করেন। প্রিমিয়ার লিগের কয়েকটি ক্লাব ও বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগে (বিসিএল) ওয়ালটন মধ্যাঞ্চলে কাজ করার সুবাদে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের কাছাকাছি আসার সুযোগ হয়।
মাহমুদউল্লাহর প্রতি ভালোবাসা কেবল বাড়তেই থাকে রবির। তার অনুরোধেই মুশফিকের জন্য তিন বছর ধরে মাঠে গলা ফাটান রবি। গল্পের বাকিটা জানা যাক রবির কথা থেকেই।
‘ক্রিকেট আমার রক্তের সাথে মিশে গেছে। আগে টিম বয় ছিলাম। ঢাকা লিগে সব দলেই কাজ করেছি। বিসিএলেও কাজ করতাম। সেসময় মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ভাই আমাকে খুব পছন্দ করতেন। জিম্বাবুয়ের সঙ্গে সিলেট স্টেডিয়ামে দুইটা লিফলেট নিয়ে গিয়েছিলাম। যেখানে একটাতে লেখা ছিল ‘‘সবাই যখন থমকে যায় তখন বীরের বেশে লড়ে চলেন একা, এরই নাম মাহমুদউল্লাহ’’। সেসময় তার সঙ্গেই আমি থাকি। আরেকটায় লিখে এনেছিলাম ‘মুশফিক ভাই, রান মেশিন’। ওই ম্যাচে মুশফিক ভাই রান করেছিল।’
‘হোটেল রোজ ভিউতে রিয়াদ ভাই আমাকে রুমে ডেকে নিয়ে বললেন, ‘‘তুই যদি আমাকে ভালোবেসে থাকিস, তাহলে একটা কথা রাখতে হবে।’’ বললাম, ‘‘আপনি যেটি বলবেন আমি সেটিই শুনব।’’ পরে বলেছে আমাকে নিয়ে কিছু লিখবি না। মুশফিককে নিয়ে বেশি বেশি লিখবি। আমি দেখেছি রিয়াদ ভাই মুশফিক ভাইকে অনেক অনেকবেশি ভালোবাসে। আত্মীয়ের দিক থেকে না, ভায়রা হওয়ার আগে থেকেই। তাকে আলাদাভাবে সম্মান করে।’
‘পরে ভারতে গেলাম টি-টুয়েন্টি সিরিজে। সারা শরীরে রং মেখে টাইগার সেজে। রিয়াদ ভাইকে প্রথমে দেখালাম, আমাকে ধন্যবাদ দিলেন। পরে মুশফিক ভাইও দেখল। আমার বুকে লেখা- ‘‘মুশফিক ভাই রান মেশিন।’’ সেটাই শুরু। সেই থেকেই রিয়াদ ভাইয়ের আদেশই পালন করে যাচ্ছি। যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন করে যাব। যতদিন তামিম-মুশফিক-রিয়াদ ভাইয়ের মতো পাণ্ডবরা ক্রিকেটে থাকবে।’
সেই থেকে মাঠে আসা-যাওয়া, থাকার খরচ মুশফিকই দিচ্ছেন রবিকে। যখন খেলা থাকবে না তখনও যেন কিছু করে চলতে পারে সেজন্য মাহমুদউল্লাহ অটোরিক্সা কিনে দিয়েছিলেন। কিন্তু বাবার চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে সেটি মাত্র ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়েছিল। বাংলাদেশ দল বিদেশি সফরে খারাপ খেলায় মাহমুদউল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করার সাহস পাননি রবি। বাবাকেও পারেননি বাঁচাতে।
‘খেলা না থাকলে অটো চালাই। রিয়াদ ভাই পাঁচ ব্যাটারির একটা অটো কিনে দিয়েছিল। খেলা থাকলে ভাড়া দিতাম। খেলা না থাকলে নিজে চালাতাম। খেলোয়াড়রা খুলনা গেলে আমার অটোতে চরত। কিন্তু দুর্ভাগ্য বাবার ব্রেইন স্ট্রোক হওয়ার পর আইসিইউ’তে ছিল, তখন অটো বিক্রি করে দিয়েছিলাম মাত্র ৩০ হাজার টাকায়। বাংলাদেশ দল তখন দেশের বাইরে ছিল। এমনই একটা পরিস্থিতি ছিল বাংলাদেশ দলেরও অবস্থা খারাপ আমার বাবারও অবস্থা খারাপ। তাদের বলতে না পেরে মাত্র ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করে চিকিৎসা করার চেষ্টা করেছি। তবে শেষ রক্ষা হয়নি।’







