জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গত কয়েক বছর ধরেই বর্ষা ঋতু তার চরিত্র-রূপ-বৈশিষ্ট্য বদলাতে শুরু করেছে। আষাঢ়-শ্রাবণে অবিরাম বৃষ্টি বলতে গেলে এখন অনেকটাই স্মৃতি।
বর্ষার বৃষ্টি যেন কেড়ে নিয়েছে জ্যৈষ্ঠ, হেমন্তের কার্তিক কখনো বা শীতের মাঘ মাস। বাংলাদেশে বর্ষাকাল শুরুর আগে কখনো বৃষ্টি হচ্ছে। কখনো বর্ষার পর বৃষ্টি হচ্ছে। আষাঢ়-শ্রাবণের সেই মুষলধারার বৃষ্টি এখন আর তেমন দেখা যায় না। বর্ষাকালে বৃষ্টির পরিমাণও কমে গেছে। এতটাই কমেছে যে, সেটি স্বাভাবিকের চাইতে গড়ে প্রায় ২৫ ভাগ কম। এ বছর ঘোর বর্ষায় সেই মুষলধারার বৃষ্টিপাত দেখা যায়নি। তবে শ্রাবণের শেষ কয়েকটি দিনে কিছুটা হলেও স্বস্তির বৃষ্টির দেখা মিলেছে।
আমাদের দেশের কৃষি ও কৃষকের জন্য বর্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঋতু। বর্ষার বৃষ্টি কৃষকের জন্য বয়ে আনে ফসলের বার্তা। একইসঙ্গে বর্ষা মধ্যবিত্ত বাঙালির অনেকেরই প্রিয় ঋতু। বিশেষত আমরা যারা গ্রামে শৈশব-কৈশোর কাটিয়েছি তাদের প্রত্যেকের হৃদয়েই সম্ভবত নিজস্ব একটা বর্ষাঋতু থাকে, শরীরে বৃষ্টির ফোঁটা পড়া শিহরণ জাগানো বর্ষা। খুব প্রিয়, খুব একান্ত এক বর্ষাকাল। এর জন্য কবি হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। প্রেমিক হতে হয় শুধু। আর আমরা তো প্রেমিকই।
যে প্রেমের সুবাদে জীবনের প্রতিটি টুপটাপ-ঝমঝম আঁকড়ে ধরে অবিশ্রান্ত ভিজে যাওয়ার আহ্লাদ মাঝবয়সেও ময়ূরের মতো পেখম মেলার স্বপ্ন দেখি। স্থান-কাল-বয়স ভেদে যতই বদলাক মেঘবৃষ্টির পদাবলি, ঘরে ফেরার পথগুলো আলতো শ্রাবণ মেখে ঘন হয়েই থাকে সকলের বুকের ভিতর। থাকে কিছু জলভারনত চোখের অভিমান, মেঘদূতের অপেক্ষা আর জীবনের কাদাঘোলা জলে হারিয়ে যাওয়া একমুঠো স্মৃতির বকুল।
বর্ষা তাই দমকা হাওয়া ফিরিয়ে আনে নস্টালজিয়া, যেখানে উঠোনের পাশে নারকেল গাছে ভিজে ঝুপসি মা-পাখির ডানার নীচে ছানাদের গুটিসুটি। বাগানভর্তি আধডোবা জুঁই, কামিনী, গন্ধরাজ, বেলি, হাস্নুহানা আর লিলির পাপড়ি নেতিয়ে উঠে আসা তীব্র গন্ধ। প্যাচ-প্যাচে কাদা-জলে মাখা পিচ্ছিল পথ-ঘাট। রাস্তার লাইটপোস্টে অজস্র বাদলা পোকার মরণঝাঁপ। ব্যাঙেদের উল্লাসে লোডশেডিংয়ে আবছা সন্ধের কেঁপে ওঠা হ্যারিকেন-আলোয় চালেডালে বেগুনভাজায় ‘মামলেটে’ মফঃস্বলি রূপকথার আনন্দায়োজন।
অঙ্কখাতার হিজিবিজি পাতার নৌকা হয়ে নিরুদ্দেশে ভেসে যাওয়া। সেখানে সোঁদা গন্ধের বয়স বাড়ে না। সেখানে পেঁপে গাছের পাতায় মাথায় জল বাঁচাতে চাওয়া নবীনের টানাটানা বিস্মিত চোখের সামনে রংধনু ঝলসে উঠলে পৃথিবী থেকে ‘দরিদ্র’ শব্দটি হারিয়ে যায়!
বঙ্গপোসাগর থেকে উঠে আসা জীবনে প্রতিটি বর্ষা মানেই কিছু ভাঙনের গল্প। স্কুলঘরে আশ্রিত বানভাসিদের ইতিকথা বিষণ্ণ করে তুলত খুব। বর্ষা মানে সে এক ভয়ানক বিড়ম্বনা। তার মধ্যেই জলে হুটোপুটি করতে দেখা স্কুলফেরত ছেলেমেয়েদের ভিড়ে কখনও নেমে পড়াও ছিল বাড়ির যাবতীয় সতর্কবার্তা ও অনুশাসন ভুলে। জামার ভেতরে বইখাতা দুইহাত দিয়ে বুকে আগলে রেখেও ভিজে একশা। ছোট ছোট মাছ ধরার নামে ব্যাঙাচি ধরা! সেগুলো কুড়িয়ে বাড়ি পর্যন্ত এনে মায়ের বকুনি খাওয়া!
আজ মনে হয়, এ ভাবেই আমরা দুর্লভ ভেবে কত অবান্তর জিনিস কুড়োই বলেই বোধ হয় কিছু নির্মল আনন্দ আজও বেঁচে আছে জীবনে! তখন আমরা অনেক পথ পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতাম। ছিল না এখনকার মতো পলিথিনের সমারোহ। ছাতাও ছিল না। আর বর্ষার ঢল ছাতায় বশ করা যেত না। অগত্যা ভিজে গোসল করতে করতে স্কুলে যেতে হতো। অনেক সময় অভিভাবকরা বারণ করলেও গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসের অজুহাত দেখিয়ে লাগাতাম ছুট। স্কুলে গিয়ে দেখতাম একেবারে ফাঁকা। কয়েকজন মাত্র বৃষ্টিতে ভিজে উপস্থিত হয়েছে। স্যারদেরও অনেকেই অনুপস্থিত। একসময় ঘোষণা করা হতো আজ ছুটি।
বৃষ্টিভেজা দিনে এমন আকস্মিক ছুটি যে কী স্বর্গীয় আনন্দ দিত। তখন দলবেঁধে বৃষ্টিতে দাপাদাপি। মাঠের জলে শুয়ে গড়াগড়ি। হঠাৎ পড়ে পাওয়া ছুটিতে এত যে আনন্দ থাকে, তা কিশোরকালের মতো কেই-বা জানে! এখন বৃষ্টিতে জবুথবু শিশু-কিশোরদের যখন বাবা কিংবা মায়ের সঙ্গে ছাতার তলে কিংবা রেইনকোটের মধ্যে প্যাকেট হয়ে স্কুলে যেতে দেখি, তখন বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে। অন্তরাত্মাকে কে যেন খামচে ধরে। যার ডাকনাম আসলে বর্ষাকাল!
ভাবি, প্রজন্মভেদে ঋতুবদল কি আলাদা অনুভব নিয়ে আসে জীবনের নানা বাঁকে? অন্য ঋতুর কথা খুব নিশ্চিত করে না বলতে পারলেও বর্ষার বোধ হয় সত্যিই এক চিরকালীনতা আছে, যেখানে যুগ যুগ ধরে অলক্ষ্য জল বেড়ে ওঠা থাকেই। একটা কুহক, ঘোর, ঘূর্ণি, রহস্যময়তা, বিষাদ, বিরহ, মনকেমন, আশঙ্কা, নিরাপত্তাহীনতা— আরও কতো কী! এটা আসলে ভালোবাসারও প্রতিশব্দ। অফিসটাইমে হঠাৎ ভিজে বৃষ্টিকে যতই ‘ননসেন্স’ বলি না কেন, বৃষ্টি তো আসলে ভালোবাসার প্রতিশব্দই! কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য প্রেমে পড়া ছেলেমেয়েদের কাছে প্রবল বৃষ্টি আদৌ কোনও অন্তরায় নয়, বরং ছাতার আড়াল বা পর্দাঘেরা রিকশার নিবিড়তা যথেষ্ট কাঙ্ক্ষিত।
সে কথা সব কালেই সত্যি। এমন দিনেই তারে বলা যায়! এমন দৃশ্য দেখলে অবশ্য কিছুটা দীর্ঘশ্বাসও জাগে। আমাদের সময়ে আমরা তেমন সুযোগ পাইনি বলে! বর্ষার জলে আকুল প্রাণ কেবলই প্রিয়জনকে না বলার কথার ব্যাকুল কাব্য হয়েই রয়ে গেল!
ছোটবেলায় দিগন্তবিস্তৃত খোলা মাঠে ভেজা, বাঁশঝাড়ের নিচে, টিনের চালে-গাছের ডালে ডোবা-পুকুরে বর্ষাযাপনের অভিজ্ঞতায় সিক্ত হয়ে বলা যায়, গ্রামের সেই নির্জনতা মাখানো গাছগাছালি ঘেরা বর্ষাঋতুতে না ছুঁলে বোঝা যায় না প্রকৃত বেঁচে থাকায় কতখানি শ্রাবণজল মিশে থাকে!
সে সব আখ্যান লিখে ওঠা যায় না, বয়ান করা যায় না সে সবের! শুধু অনুভবের কাছে ঋণ বাড়িয়ে দেয়। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত প্রবল একটানা জলপড়ার শব্দ, দৃষ্টিসীমা পেরিয়ে যেন দিগন্তের ওই পার থেকে, অন্য দ্রাঘিমা থেকে হু হু করে ছুটে আসা বৃষ্টির বল্লম! প্রতিদিনের যাতায়াতের পথে ফুঁসে ওঠা সাপের মতো জলের ধারার ক্রমশ গ্রাস করে নেয়। ঘরের বিভিন্ন স্থান দিয়ে জলপড়া, উঠোনে জল জমা হওয়া, জ্বালানি ভিজে যাওয়ায় সীমাহীন কষ্ট করে রান্না-বান্না, ধোঁয়ার গন্ধমাখা চালডাল মেশানো পাতলা খিচুড়ি খাওয়া, সাপের ভয়, কাঁচাঘর ধ্বসে পড়ার আশঙ্কা নিয়ে গুটিশুটি মেরে ঘুম।
সকালে উঠেও দেখা যায় বৃষ্টির তীব্রতা কমেনি। ঘরের বারান্দায় পানি উঠি-উঠি করছে। বাড়ি, শ্মশান, রাস্তা, খাল, মাঠ সব যেন একাকার হয়ে একটা প্রবল জলস্রোতের রূপ নিয়েছে। যেন তলিয়ে যাবে লোকালয় যাবতীয় বিপন্নতার স্মৃতিতে ফিরিয়ে দিয়ে! যে কোনও মুহূর্তে পায়ের তলার মাটি জল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আর আতঙ্ক অভিমানী আর ক্ষুব্ধ করে তোলে অভিভাবকদের।
কিন্তু না। চূড়ান্ত বিপদের আশঙ্কা জাগিয়েও এক সময় বৃষ্টির তীব্রতা থেমে যায়। অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে পানি নেমে যায় ঢালু বেয়ে। তখন চলে মাছ ধরার উৎসব। নানা প্রক্রিয়ায় চলে মাছ ধরা। তবে হাতে হাতেই মাছ ধরা হয় বেশি। রাস্তা থেকে জল সরে যাওয়ায় ঘাসের মধ্যেই মাছগুলো আটকা পড়ে থাকে। আমাদের কাজ শুধু কুড়িয়ে নেওয়া!
সেই বর্ষা জীবন থেকে বহু আগেই বিদায় নিয়েছে। গ্রাম থেকে আমরা হয়েছি শহরমুখী। গ্রামও এখন আর গ্রাম নেই। সেই বর্ষা, অথৈ জলের সমারোহ এখন আর চোখে পড়ে না। তারপরও বর্ষা আসে, বৃষ্টি পড়তে থাকে অনন্ত আষাঢ়ে-শ্রাবণে। শহরের সারি সারি ইমারতে চিঠি না লেখার দিনগুলোয় মেঘের খামে হঠাৎ একটুখানি বৃষ্টির ঝাপটা বারান্দার ফাঁক দিয়ে উড়ে আসে। একটু জোরে বৃষ্টি হলেই গলি-রাস্তা-পথ-ঘাট সব ডুবে যায়। সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা।
সে মনে করিয়ে দেয়, আসলে দ্বীপবাসী আমরা অনেকদিনই। আসলে, বিপন্ন আমরা এ রকমই। আসলে, লোভের কাছে মাথা নত করা উন্নতির রথ বড় অসহায় প্রকৃতির হাতে। আসলে, আমরা সকলেই আছি বুকজলে— কেউ জানি, কেউ জানি না!
বৃষ্টি এখনও আমাদের আনমনা করে। সেই বারান্দায় বসে উঠোন কিংবা মাঠের দিকে তাকিয়ে দেখা বৃষ্টি নামার দৃশ্যটাই স্থির হয়ে আছে। সেই শৈশবের মুষলধারে বৃষ্টি পড়ার দৃশ্যের দিকেই নিষ্পলক তাকিয়ে রয়েছে আমাদের মন। আমাদের অনুভব, স্মৃতি। সেই বৃষ্টি ভেজা মাঠের দিকে— যেখানে সারাজীবন বৃষ্টি পড়ে, বৃষ্টি পড়ে!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







