‘না, আমি আসিনি
ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রাচীন পাতা ফুঁড়ে,
দুর্বাসাও নই,
তবু আজ এখানে দাঁড়িয়ে এই রক্ত গোধুলিতে
অভিশাপ দিচ্ছি
আমাদের বুকের ভেতর যারা ভয়ানক কৃষ্ণপক্ষ দিয়েছিল সেটে,
মগজের কোষে কোষে যারা
পুতেছিল আমাদেরই আপনজনের লাশ
দগ্ধ রক্তাপ্লুত,
যারা গণহত্যা
করেছে শহরে গ্রামে টিলায় নদীতে ক্ষেত ও খামারে,
আমি অভিশাপ দিচ্ছি নেকড়ের চেয়ে অধিক
পশু সেই সব পশুদের।’
অভিশাপ দিচ্ছি / শামসুর রাহমান
এক
১৯৭২ সালের ২রা জানুয়ারি দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ‘ কাঁটাসুরের বধ্যভূমি ’ শীর্ষক এক মর্মস্পর্শী প্রতিবেদনে অধ্যাপিকা হামিদা রহমান বুদ্ধিজীবীদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিবরণ লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে যে বিবরণ তিনি উল্লেখ করেছেন তা সত্যি সত্যি হৃদয়বিদারক। সেই প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেছেন , ‘আর একটু দূরে যেতেই দেখতে পেলাম , একটি কঙ্কাল। শুধু পা দুটো আর বুকের পাঁজরটিতে তখনও অল্প মাংস আছে । বোধহয় চিল-শকুন খেয়ে গেছে। কিন্তু মাথায় খুলিটিতে লম্বা লম্বা চুল। চুলগুলো ধুলো-কাদায় মিলে গিযে নারীদেহের সাক্ষ্য বহন করছে। আর একটু এগিয়ে যেতেই বেশ কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে ঝুঁকে পড়ে কী যেন দেখছে। আমি উপরে উঠতে একজন ভদ্রলোক হাত বাড়িয়ে আমাকে উপরে উঠিয়ে নিলেন। সামনে দেখি নিচু জলাভূমির ভেতর এক ভয়াবহ বীভৎস দৃশ্য। সেখানে এক নয় , দুই নয় একেবারে বারো – তেরজন সুস্থ- সবল মানুষ। একের পর এক শুয়ে আছে।
পাশে দুটো লাশ, তার একটির হৃৎপিণ্ড এক যেন ছিঁড়ে নিয়েছে । সেই হৃৎপিণ্ড ছেঁড়া মানুষটি হলো ডাক্তার রাব্বী । … মাঠের পর মাঠ চলে গিয়েছে। প্রতিটি জলার পাশে হাজার হাজার মাটির ঢিবির মধ্যে কঙ্কাল সাক্ষ্য দিয়েছে কত লোককে যে মাঠে হত্যা করা হয়েছে’। দেশ যখন স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত তখন পাকিস্তানিরা বুঝে ফেলল কোনোভাবেই বাঙালি জাতিকে আর কোনোভাবেই দাবিয়ে রাখা যাবে না। পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানিরা বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের চিহ্নিত করে তাদের নিশ্চিহ্ন করতে বদ্ধপরিকর হয়ে ওঠে। মেতে ওঠে পৈশাচিক উল্লাসে। মূলত বাঙালি শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, আইনজীবী, শিল্পী, দার্শনিক ও রাজনৈতিক চিন্তাবিদগণ এই সুপরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞের শিকার হন ।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় , আমাদের মহান মুক্তিযুদ্বে দেশের মানুষ অকাতরে নিজের বুকের রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে এদেশের সম্মানকে সমুন্নত রেখেছে। বাংলার মা-ভাই-বোন-কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-জনতা সবাই এক কাতারে নেমে এসে দেশের জন্য যুদ্ধ করে প্রমাণ করেছে বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি। যুদ্ধে যখন বাঙালি বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে উপস্থিত তখন পাকিস্তানের গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি এদেশের শ্রেষ্ঠ মানুষদের নিঃশেষ করে বাঙালি জাতিকে মেধাশুন্য করার ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠেন । তারই পরিকল্পনা মাফিক পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগিতায় রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ধরে ধরে নির্মমভাবে হত্যা করে ।
ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড চালায় পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী। বাঙালি শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, আইনজীবী, শিল্পী, দার্শনিক ও রাজনৈতিক চিন্তাবিদগণ এই সুপরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞের শিকার হন । বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের নিশ্চিহ্ন করার এই নীলনকশা প্রণয়ন করে পূর্ব পাকিস্তানের । ১২ ডিসেম্বর সেনা সদর দফতরে আলবদর ও আলশামস বাহিনীর হাতে বুদ্ধিজীবীদের তালিকা তুলে দেন তিনি। পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্র সহায়তা নিয়ে তাদেরই ছত্রছায়ায় আধাসামরিক বাহিনী আলবদরের ক্যাডাররা এই বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত করে। যদিও এর আগেই সারাদেশেই শুরু হয়ে গেছে বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞ।
১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হলেও বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড শুরু হয় তারও দিন কয়েক আগে থেকে । ইতিহাসবিদরা এই দিনটিকে পৃথিবীর ইতিহাসের একটিকালো অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন । তারা বলছেন , যুদ্বের শেষের দিকে এসে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের নিশ্ছিত পরাজয়ের আগাম টের পেয়ে যান । ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাঙালিবুদ্ধিজীবী নিধনের বিষয়টিকে বিশেষভাবে প্রাধান্য দিতে শুরু করেন পাকিস্তানিরা । একাত্তরের ১০ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনির এদেশীয় দোসর রাজাকার, আল শামস, আল বদর বাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়ে যায় দৈনিক ইত্তেফাকের কার্যনির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেন ও পিপিআই’র চিফ রিপোর্টার সৈয়দ নাজমুল হককে। 
গবেষকরা অবশ্য তাদের গবেষণায় বলছেন , ২৫মার্চের কালো রাতেই পাকিস্তানিরা অনানুষ্ঠানিক ভাবে শুরু করে বুদ্ধিজীবীদের নিধন এবং তা’ চলে যুদ্ধের পুরো নয় মাস জুড়ে । এমনকি ৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে বিজয় লাভের পরেও বুদ্ধিজীবীদের নিধন অব্যাহত থাকে। যেমন ডঃ মনসুর আলীকে হত্যা করা হয় ২১ ডিসেম্বর আর চলচ্চিত্রকার , গল্পকার জহির রায়হান নিখোঁজ হন বাহাত্তরের ৩০ জানুয়ারি মিরপুরে। বুদ্ধিজীবীদের এই হত্যাযজ্ঞ শুরু হয় এবং ক্রমে তা সমগ্র দেশে বিশেষতঃ জেলা ও মহকুমা শহরে সমপ্রসারিত হয় ।
হত্যাকারীরা বুদ্ধিজীবীদের গেস্টাপো কায়দায় ধরে নিয়ে কালো কাপড় দিয়ে চোখ বেঁধে কোন বিশেষ ক্যাম্পে বা বধ্যভূমিতে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, শহরে জারিকৃত কারফিউয়ের সুযোগে বুদ্ধিজীবীদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে তাদের ওপর চালানো হয়েছিল নির্মম নির্যাতন যে নির্যাতনকে হার মানায় মধ্যযুগীয় বর্বরতা। বেয়নেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে হত্যা করা হয়েছিল দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের।
জানা যায় , ঢাকা শহরের দু’টি বধ্যভূমির মধ্যে একটি ছিল মোহাম্মদপুরের কাছে রায়ের বাজারের জলাভূমি, অপরটি ছিল মিরপুরে। যুদ্বের পরে এ দুটি বধ্যভূমির ডোবা, নালা, ইটের পাঁজার মধ্যে অসংখ্য মৃতদেহ বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এসব মৃতদেহের অধিকাংশের চোখ কালো কাপড়ে বাঁধা ছিল , হাত পেছন দিক থেকে বাঁধা। এসব মৃতদেহের মাথায় ও পিঠে বুলেটের চিহ্ন ছিল। আর সারা দেহে ছিল বেয়নেটের ক্ষতচিহ্ন ।
দুই
একই বছর অর্থাৎ বাহাত্তুরের ৮ই জানুয়ারি দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় মিরপুরের শিয়ালবাড়ী বধ্যভূমি নিয়ে আনিসুর রহমানের একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে কুটি কুটি করে কাটা বুদ্ধিজীবীদের হাড়ের ছবিও ছাপা হয়। বধ্যভূমির সেই প্রতিবেদন তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘ …অথবা যদি না যেতাম সেই শিয়ালবাড়ীতে তাহলে দেখতে হতো না ইতিহাসের বর্বরতম অধ্যায়কে। অনুসন্ধিৎসু হিসেবে যা দেখাও কোনো মানুষের উচিত নয়। ওখানে না গেলে গায়ে ধরত না এমন দহনজ্বালা । সহ্য করতে হতো না ভয়-ক্রোধ, ঘৃণা মিশ্রিত এমন তীব্র অনুভূতি যে অনুভূতি বলে বুঝাবার নয় ’।
মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে এসে শত্রুপক্ষ দেশব্যাপী সংঘটিত করে পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড। বুদ্ধিজীবী, কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ কেউ-ই তাদের এই হত্যাকাণ্ড থেকে রেহাই পায়নি। বিজয়ের পর ঢাকাসহ সারাদেশে এসব হত্যাকাণ্ডের আবিস্কৃত হতে থাকে। উদ্ধার করা হয় কঙ্কাল। হাড়গোড়। ১৯৭১ সালের ১৯ শে ডিসেম্বর দৈনিক বাংলা পৃথিবীল নিষ্ঠুরতম বধ্যভূমি আবিস্কৃত হওয়ার ঘটনা নিয়ে ‘শতাব্দীর জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড সংঘটন করেছে আলবদর বর্বর বাহিনী’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘স্বাধীনতার আনন্দ, উচ্ছ্বাসের মাঝে গতকাল শনিবার বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা নগরীতে করুণ ছায়া নেমে আসে। মুক্তির আনন্দকে ছাপিয়ে ওঠে কান্নার রোল।
শতাব্দীর জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে ঢাকা নগরী ও বাংলাদেশে গত ফেব্রুয়ারি থেকে। তা আরো চরম হয়ে উঠেছিল মুক্তির পূর্বক্ষণে। গতকাল রায়েরবাজার ও ধানমন্ডি এলাকায় বিভিন্ন গর্ত থেকে প্রচুর সংখ্যক লাশ উদ্ধার করা হয়। এদের মধ্যে অধ্যাপক, ডাক্তার, সাংবাদিক ও সাহিত্যিকদের লাশও রয়েছে। এ পর্যন্ত কতিপয় লাশ চেনারও উপায় নেই।’
ঘাতকরা বেছে বেছে যাদের হত্যা করেছিল তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেনঃ এ এন এম মুনীর চৌধুরী , ড. জিসি দেব , মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আনোয়ার পাশা , ড. জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, আবদুল মুকতাদির, এস এম রাশীদুল হাসান, ড. এন এম ফয়জুল মাহী, ফজলুর রহমান খান, এ এন এম মুনীরুজ্জামান, ড. সিরাজুল হক খান , ড. শাহাদাত আলী, ড. এম এ খায়ের, এ আর খান খাদিম, মোঃ সাদেক, শরাফত আলী, গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য । রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন অধ্যাপক মীর আবদুল কাইয়ুম, হবিবর রহমান, সুখরঞ্জন সমাদ্দার, ড. আবুল কালাম আজাদ । সাংবাদিক হিসেবে ছিলেন সিরাজুদ্দীন হোসেন , শহীদুল্লাহ কায়সার , খোন্দকার আবু তালেব, নিজামুদ্দীন আহমদ, আ ন ম গোলাম মোস্তফা, শহীদ সাবের, শেখ আবদুল মান্নান (লাডু), সৈয়দ নজমুল হক, এম আখতার, আবুল বাসার, চিশতী হেলালুর রহমান, শিবসদন চক্রবর্তী, সেলিনা পারভীন এছাড়া শিল্পী আলতাফ মাহমুদ, মেহেরুন্নেসা, দানবীর রণদাপ্রসাদ সাহাসহ আরো অনেক নাম রয়েছে।
তিন
পাক-বাহিনী এবং তাদের দোসর রাজাকার, আল-বদর, আলশামস কর্তৃক বুদ্ধিজীবীদের হত্যাযজ্ঞের স্মরণে বাঙালি জাতি স্বশ্রদ্ধ চিত্তে ১৯৭২ সাল থেকে ১৪ই ডিসেম্বরকে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করে আসছে । বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ ১৪ ডিসেম্বরকে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ঘোষণা করেছিলেন। কারণ অপহরণ ও পরে নির্বিচারে হত্যা এই ১৪ ডিসেম্বরেই অর্থাৎ পাক-বাহিনীর আত্ম-সমর্পন এবং বাঙালির বিজয় অর্জন তথা বিজয় দিবসের ঠিক দু’দিন পূর্বে, সংগঠিত হয়েছিল সবচেয়ে বেশী ।
২০শে ডিসেম্বর ১৯৭১ এ, মুজিবনগর সরকারের এক মুখপাত্র জানান, ১৬ই ডিসেম্বরে আত্মসমর্পনের পূর্বে পাকবাহিনী এবং তাদের সহযোগীরা মিলে ৩৬০ জন বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে । ১৯৯৪ সালে পুণঃমুদ্রিত বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত “শহীদ বুদ্ধিজীবী সম্পর্কিত তথ্যকোষে” শহীদ আখ্যায়িত হয়েছেন তারা যাদের পাক-বাহিনী এবং দোসরেরা (রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস) বিভিন্ন সময় নির্বিচারে হত্যা করেছিল এবং যারা ২৫ মার্চ ১৯৭১ থেকে ৩১ জানুয়ারি ১৯৭২ সময়কাল থেকে নিঁখোজ।
লেখক, বিজ্ঞানী, চিত্রশিল্পী, সংগীতশিল্পী, শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, উকিল, চিকিৎসক, স্থপতি, ভাস্কর, সরকারি-বেসরকারি কর্মী, নাট্য-কর্মী, জনসেবায় নিয়োজিত কর্মীদের বুদ্ধিজীবি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ১৯৭২ সালে সরকার কর্তৃক প্রকাশিত ”বাংলাদেশ” নামক প্রামান্য চিত্রে বলা হয়, স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ৬৩৭ জন প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক, ২৭০ জন সেকেন্ডারি স্কুলশিক্ষক এবং ৫৯ জন কলেজ-শিক্ষককে হত্যা করা হয় । দৈনিক পত্রিকাগুলো নিখোঁজ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় এবং চতুর্থ সপ্তাহে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গোপন তথ্যসূত্রের ভিত্তিতে, ১৮ই ডিসেম্বরে একদল সাংবাদিক ঢাকার পশ্চিমে, রায়ের বাজার এলাকায় পচনশীল, ক্ষত-বিক্ষত লাশের একটি গণ-কবরের সন্ধান লাভ করে। জাতির মেধাবী ব্যক্তিবর্গের দেহগুলো অত্যাচারের সুস্পষ্ট চিহ্ন নিয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, একে-অন্যের নীচে চাপা পড়ে ছিল। লালমাটিয়ায় শারীরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সাংবাদিকরা একটি বন্দীশালা আবিষ্কার করে, যা ছিল রাজাকার, আলবদর, আলশামসদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ এবং কামালউদ্দিন, চিকিৎসক ফজলে রাব্বী, আব্দুল আলিম চৌধুরী, আবুল খায়ের এবং সাংবাদিক মুহাম্মদ আখতার পচনশীল লাশগুলো পরিবার কর্তৃক সনাক্ত করা হয় সেদিনই । সাংবাদিক সেলিনা পারভিন এর লাশ সনাক্ত করা হয় পরের দিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য, সিরাজুল হক, ফাইজুল মহি এবং চিকিৎসক গোলাম মুর্তোজা, আজহারুল হক, হুমায়ুন কবীর ও মনসুর আলী’র লাশ পরে চিহ্নিত করা হয়। লাশ সনাক্তকরণের সময় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিবারের সদস্যদের অনেকেই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ছিলেন।
এরকম আরো বধ্যভূমি ছিল মিরপুর এবং রায়ের বাজার এলাকায়, তেঁজগাঁও এর কৃষি বর্ধিতকরণ বিভাগের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, মহাখালীর টি.বি. হাসপাতাল সহ সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায়। অনেক লাশই পরে সনাক্তকরণের পর্যায়ে ছিলনা । এসময় সংবাদপত্রগুলো নিখোঁজ বুদ্ধিজীবীদের (নভেম্বরের শেষের দিকে এবং ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত অপহরণ অথবা গ্রেফতারকৃত) নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করছিল।
বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডটি যে একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা সেটা ধীরে ধীরে পরিস্কার হয়ে ওঠে মানুষের কাছে । মফিজউদ্দিনের (লাশ বহনকারী বাহনের চালক) স্বীকারোক্তি অনুযায়ী আশরাফুজ্জামান খান, ইসলামি ছাত্র সংস্থার কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য এবং পাকিস্তান রেডিও’র সাবেক কর্মী , নিজ হাতে সাত জন শিক্ষককে গুলি করেন। মফিজউদ্দনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী এমন দুর্ভাগ্যজনক ভাবে মৃত্যুবরণকারী শিক্ষকদের লাশ উদ্ধার করা হয় রায়ের বাজার বধ্যভূমি এবং মিরপুরের শিয়াল বাড়ির গণ কবর থেকে। তার ডায়েরিতে ২০ জন শিক্ষক সহ আরো অনেক বাঙালির তালিকা ছিল। তার ডায়েরিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬ জন শিক্ষকের নাম ছিল যারা পাকবাহিনীকে সহযোগিতা করেছিল । বুদ্ধিজীবী হত্যা পরিকল্পনায় পাক-বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার কাসেম এবং ক্যাপ্টেন কাইয়ুম ছিল মূল হোতা । নভেম্বর মাসের কোন এক সময় তারা মওলানা আব্দুল মান্নানের বাসগৃহে মাদ্রাসা শিক্ষক সংঘের প্রেসিডেন্ট সহকারে বৈঠক করে । গবেষকরা বলছেন, মওলানা আব্দুল মান্নানের বাসগৃহে অনুষ্ঠিত আলোচনাতেই বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মূল পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
চার
প্রতি বছরের বুদ্ধিজীবী দিবস বাঙালির মনে বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে একটি প্রশ্ন রেখে যায় । বুদ্ধিজীবীরা যেমন তাদের জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন দেশের জন্য, মানুষের জন্য, কল্যাণের জন্য সর্বোপরি স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, দেখো তোমাদের জন্য, দেশের জন্য আমরা আমাদের সবটুকু উৎসর্গ করে গেলাম। আগামী দিনে দেশমাতৃকার প্রয়োজনে তুমিও আমাদের মত কর তৈরি হও। বুদ্ধিজীবী দিবসের বড় শিক্ষা এটাই ।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








