দুশো বছরের বৃটিশ শাসনের পর সাতচল্লিশের দেশভাগ, পাকিস্তানের জন্ম, ধর্মভিত্তিক জাতীয়তার উদ্ভব, ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এই সব কিছুর মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা এক নারী, ঠিক যেন মাক্সিম গোর্কির মা উপন্যাসের সেই মা- যে একাত্তরের পঁচিশ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের পরদিন তাঁর দু’সন্তানকে বলতে পেরেছিলেন, “ছেলেরা আমার যুদ্ধে চলে যাও, দেশ স্বাধীন করে তবেই ফিরে এসো। যদি গুলি লাগে তবে বুক পেতে দিও বীর সাহসী সৈনিকের মতো। পিঠে গুলি নয়, মৃত্যুও যেন বীরের মত হয়।” বাংলাদেশে এমন কজন মা আছেন যিনি এমন করে তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ ধন তাঁর সন্তানকে এমন সাহসিকতার সাথে যুদ্ধে পাঠাতে পারেন?
সময়ের প্রয়োজনে সাড়া দেবার এ গল্প শুনতে শুনতে আমি এই মাকে প্রশ্ন করেছিলাম- বাড়ি থেকে বেরিয়ে ওঁনার ছেলেরা যখন সামনে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন তখন কি তিনি ছেলেদের পিছু ডেকেছিলেন কিনা? ছেলেরাও কি ফেরত এসেছিলেন? তিনি জানিয়েছিলেন, ‘‘না’’। তিনি নিজেও আর পিছু ডাকেননি আর তাঁর ছেলেরাও আর পিছনে ফিরে তাকাননি। তবে তিনি ততোক্ষণ পর্যন্তই তাকিয়ে ছিলেন যতোক্ষণ পর্যন্ত ছেলেদের অবয়ব দেখা যাচ্ছিল। একটা সময় ছেলেরা দৃষ্টি সীমার বাইরে চলে গেলে, তিনি তখন দৃষ্টি ফিরিয়েছিলেন। ছেলেরা চলে যাবার পর তিনি ‘সালেমা বেগম’ ও তাঁর স্বামী ‘ডা. এম এ শিকদার’ অঝোর কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারপর থেকে তাঁদের সন্তানদের জন্য শুরু হলো তাঁদের অনন্ত সময় অপেক্ষায় থাকা। সে অপেক্ষার প্রহর আমৃত্য প্রলম্বিতই ছিল!
‘পিঠে গুলি নয়- মৃত্যুও যেন বীরের মত হয়’- এই দর্শনের উদগাতা জননীর নাম সালেমা বেগম। তিনি এক স্বাধীনচেতা নারী। আত্মনির্ভরশীল এবং আত্মবিশ্বাসী মানুষ। দেশের প্রয়োজনে তিনি তাঁর দুই সন্তানকে যুদ্ধে পাঠান। সন্তান দু’জন হলেন সে. লে. সেলিম ও ডা. এম এ হাসান।

এই মহিয়সী নারী সালেমা বেগমের সঙ্গে আমার পরিচয় হয় ২০০৮ সনে। পরিচয় এক সময় অনেক গভীর হয়। আমি হয়ে উঠি তাঁর কন্যাতুল্য আত্মিক বন্ধু। তাঁর শেষ যাত্রার সময় হাসপাতালে তাঁর পাশে আমি, একজন আয়া ও তাঁর পুত্র ডা. হাসান ছাড়া আর কেউ ছিল না! আমার মতে, এই বীর মাতার শেষ যাত্রাটি ছিল ভীষণ শান্তির। আমার দু’খানা হাতের উপরে তিনি মাথা রেখে কখন যে চিরনিদ্রার পথিক হলেন-আমি নিজেও তা বুঝতে পারি না। তাঁকে বীর মাতা ও যোদ্ধা বলছি এই কারণে যে, তিনি জীবনের প্রতি পদে পদে একা যুদ্ধ করে গেছেন। কোনোদিনও কারো কাছে ব্যক্তিস্বার্থে মাথা নত করেননি এবং বা হেরে যাননি।
ঢাকা কাঁপানো গেরিলা যোদ্ধা শহীদ রুমি ও তাঁর মা শ্রদ্ধেয়া জাহানারা ইমাম এবং গেরিলা যোদ্ধা শহীদ আজাদ ও তাঁর মা শ্রদ্ধেয়া সাফিয়া বেগমের কথা আমরা সবাই কমবেশি জানি। কিন্তু লালপুর, তেলিয়াপাড়া, হরষপুর, মুকুন্দপুর, ফেনী, ফুলগাজী, বেলোনিয়া, আখাউড়া ও মিরপুর মুক্ত করা বীরযোদ্ধা শহীদ লেঃ সেলিম ও তাঁর মায়ের কথা আমরা ক’জন জানি? অথচ তাঁর কথাও শ্রদ্ধার সঙ্গে বলা উচিত এবং জানানো উচিত আমাদের। মুক্তিযুদ্ধ বিস্মৃত হওয়া প্রকারান্তরে বাঙালী জাতির অস্তিত্ব হুমকির মুখে ঠেলে দেয়া। বাঙ্গালী জাতির আত্মপরিচয় ও গৌরবের অহংকারকে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করতে হবে- তাছাড়া ভিন্ন কোন পথ নেই।
তাই শহীদ মাতা সালেমা বেগম এর কথা আমি বলতে চাই বর্তমান প্রজন্মকে। এ দেশেও মাক্সিম গোর্কির ‘মা’ এর মতো এক ‘মা’ তৈরী হয়েছিলেন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে-যিনি যুদ্ধ পরবর্তী রাজনৈতিক অচলায়তনের দুর্বিপাকে সবার অজান্তে নিভৃতে পৃথিবী থেকে বিদায়ও নিয়েছেন।
২০০৮ সালের এপ্রিলে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। চলচ্চিত্র নির্মাতা ফখরুল আরেফিন খানের “আল বদর” তথ্যচিত্র নির্মানের কাজে সেখানে যাওয়ার সুযোগ হয়। মুক্তিযোদ্ধা ডা. এম এ হাসানের ইন্টারভিউ নেয়ার কাজ ছিল। কাজ শেষে আমরা ফেরত আসবো তখন এম এ হাসান বললেন, ওনার আলবিরুনী হাসপাতালের (যেখানে আমরা ইন্টারভিউ করতে গিয়েছি) ওপর তলায় ওঁনার মা থাকেন। উনি আমাদের জন্য অপেক্ষায় বসে আছেন। আমরা এতক্ষণ একজন সাহসী যোদ্ধার কথা রেকর্ড করছিলাম এবং এই বীর মায়ের আরেকটি সন্তানও সাহসী বীর যোদ্ধা শহীদ লেঃ সেলিম। এ মায়ের সঙ্গে দেখা হবে ভেবে সত্যি চমকিত হলাম। অতঃপর সিঁড়ি বেয়ে সবাই ওপরে গেলাম। তিন তলায় পাশাপাশি দুটি কামরা একটিতে তিনি থাকেন অন্যটিতে রোগী ভর্তি। আরেকটি কামরায় ওঁনার ছেলের স্ত্রী ব্যবহার করেন। একটি ছোট্ট রন্ধনশালাও রয়েছে, সেখানে শহীদ মাতা সালেমা বেগমের জন্য রান্না হয়। আমরা সবাই ওঁনার ঘরে গিয়ে বসলাম। বিস্কুট পানি সাজিয়ে রেখেছেন ছোট্ট সেন্টার টেবিলে। দেখলাম ঠোঁটের কোনে হাসি আর চোখদুটো যেন জ্বলজ্বল করছে। সালেমা বেগম বললেন, “তোমাদের যখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করতে দেখি তখন আমার খুব আনন্দ হয়। আমি এখন বুড়ো বয়সে (৮৩) কিছু করতে পারিনা। আমার ছেলের অনুমতি পাইনা, নইলে তোমাদের মত আমিও এসব কাজ করতাম!” এরপর শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটানা স্মৃতি তর্পণ। সেদিনই তিনি বললেন, “আমি আমার ছেলেদের বলেছিলাম, জয়ী হয়ে ফিরে এসো, পরাজিত হয়ে নয়। আর যদি গুলি লাগে তবে ভীরুর মতো পালিয়ে যেয়ে পিঠে গুলি নিও না, সাহসী বীরের মত বুক পেতে দিও।” এই কথা গুলো বলতে বলতে সেই সময়েও তিরাশী বছরের এই বৃদ্ধ মা আগুনের মতই যেন জ্বলছিলেন! খালাম্মা সালেমা বেগম আরও বললেন, ওঁনার ভাইদের কাছ থেকে রাজনৈতিক সংগ্রামী জীবনের দীক্ষা পেয়েছিলেন, প্রীতিলতার আদর্শ ধারণ ক’রে জীবনের পথ চলেছেন। এরপর তখন থেকে খালাম্মার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ পর্যন্ত আমি হয়ে উঠলাম যেনো তাঁর একমাত্র আত্মার বন্ধু। জীবিত অবস্থায় তিনি বহুবার বলেছেন, “তোমার সাথে আমার আত্মার সম্পর্ক “। ওঁনার মনের ভেতরে এমন কোন চাপা থাকা কথা নেই যা তিনি আমাকে বলে যাননি। আমি যখনই সময় পেয়েছি খালাম্মার শেষ বয়সের নিঃসঙ্গ জীবনের সাথী হতে চলে গিয়েছি তাঁর কাছে।
বরিশালে ছিল ওঁনার সংসার, বাড়িঘর, স্বামীর ভিটা। বছরে দু-তিনবার সেখানে যেতেন, বাড়িঘর রক্ষা, জমিজমার সকল কাজ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিজে সব সমাধান করতেন। বরিশালের বাড়ির পুকুরের মাছ, গাছের আম-জাম-নারিকেলসহ আরও নানা রকম ফল, জমির চাল ইত্যাদি সব কিছু নিয়ে ঢাকা শহরে ফিরে আসতেন। পৌঁছে দিতেন ছেলে আর মেয়েদের বাড়িতে। স্বামী আর শহীদ সন্তান লেঃ সেলিম এর পেনশনের টাকায় নানা প্রয়োজন মেটাতেন। কখনও ছোটো ছেলের কাছে প্রয়োজনে হাত পাতেননি।
মুক্তিযুদ্ধ শেষে জয়ী হয়ে ছেলেরা ঘরে ফেরবার পর ওঁনার আত্মবিশ্বাসের মাত্রা আরও বেড়ে গেল । উনি বললেন, “স্বাধীনতা অর্জন হয়ে গেল, এবার একে রক্ষা করতে হবে। একবারও ছেলেদের বলেননি যুদ্ধ করেছো। অনেক হয়েছে এবার আমার ঘরের ছেলে ঘরে থাক। তোমাদের নিয়ে সুখের দিন কাটাব “। ব্যক্তিগত সুখের কথা উনি কখনোই ভাবেননি এবং ছেলেদের গড়ে তুলেছিলেন চে গুয়েভারার মত বিপ্লবী আদর্শে। এই কথাগুলো পরবর্তীতে উনি অনেক সময় আফসোস করে আমাকে বলতেন, “মা আমি তো ভালো মা হতে পারিনি। দেশের মঙ্গলের কথা ভেবেছি কিন্তু একবারও আমার সন্তানদের নিরাপদ সুখী জীবনের কথা ভাবিনি। কত মা’ই তো মৃত্যুর শংকায় তার ছেলেদের যুদ্ধে পাঠাননি আর আমি ভাবলাম দেশের কথা, তবুও তো জয়ী হয়ে ছেলেরা ফেরত এলো তারপরও কেন আমি ওদের বললাম না-এবার সব ছেড়ে পড়াশোনা করো। সেনাবাহিনীতে না থাকলে আমার কামরুল তো (লেঃ সেলিম এর ডাক নাম) সেদিন মিরপুরে যেতো না। খালাম্মা মাসে একবার হলেও এই একই কথার বিলাপ করতেন। সেলিম ভাই শহীদ হবার পর থেকে আমৃত্যু তিনি এই কঠিন যন্ত্রণা ও অপরাধ বোধে ভুগেছেন। তাঁর সেই কষ্ট-ব্যাথা উপলব্ধি করার চেষ্টা করতাম। হাসপাতালের একটি কক্ষে বছরের পর বছর, জীবনের সব আনন্দকে বিসর্জন দিয়ে প্রতিবাদহীন অনেকটা স্বেচ্ছায় নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। অবশ্য এছাড়া তাঁর আর কোনো উপায়ও ছিলনা। একমাত্র জীবিত ছেলের বউ ডা. যাকিয়া তাঁকে বোঝেননি বরং বরাবর প্রায়শঃ ভুলই বুঝেছেন। কিন্তু খালাম্মার তাতে কোন আক্ষেপ ছিলনা। হাসপাতালের দু’চারজন নার্স, আয়া ছিল ওঁনার নিত্যদিনের সঙ্গী। এদের হাতেই বন্দি ছিল ওঁনার জীবন। তবু খালাম্মাকে দেখতাম অকুতোভয় এক সত্ত্বা। তিনি বলতেন, “মা,আমার কামরুল (লে. সেলিম) আমার জীবনের সব আনন্দ নিয়ে গেছে। শুধু ওর স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই ।” আমি বলতাম, “তবুও খালাম্মা আপনারতো আরেকটি ছেলে বেঁচে আছে। আপনার নাতি নাতনি আছে। এই শেষ বয়সে আপনার নাতি নাতনিকে নিয়ে আনন্দে থাকবার কথা।” কিন্তু তিনি নিরব থাকতেন এবং মাঝে মধ্যে বলতেন, “আমার শরীরতো সব সময় খারাপই থাকে তাই হাসপাতালই আমার জন্য নিরাপদ।”

একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি । ওঁনার বড়ো নাতি তখন অস্ট্রেলিয়া থেকে দেশে বেড়াতে এসেছে। সেদিন ছিল ওঁনার বড়ো নাতির ঘরের জমজ দুই কন্যার আকিকার উৎসব। সারাদিন ওঁনার ছেলের বাড়িতে উৎসবের আয়োজন চলেছে। দুপুরে টেলিফোনে একটু বিরক্ত হয়ে আমায় বললেন, “আমি দুদিন ধরে কিভাবে চলি সে খবর কি কেউ রাখে?” ফোনে কথা বলে বুঝতে পারলাম উনি ভালো নেই, অসুস্থ। প্রেশার বেড়েছে, শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। পরদিন সকালে জানলাম- খালাম্মার অবস্থা ভালো না। শুনে ছুটে গেলাম হাসপাতালে এবং যেয়ে দেখলাম ওনাকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টায় নিয়োজিত ওঁনার ছেলে ডা. হাসান। সিপিআর প্রয়োগের সাথে সাথে ‘মা’ ‘মা’ বলে অসহায় আর্তচিৎকার করছেন তিনি। ‘‘মা আমাকে ছেড়ে যাবেন না, মা আমাকে ছেড়ে যাবেন না” – আমি অসহায়ের মত তাকিয়ে দেখছিলাম সন্তান আর মায়ের নাড়ীর বন্ধনের এক সকরুণ দৃশ্য! বহুচেষ্টার পর একসময় তাঁর মা সালেমা বেগম চোখ মেললেন। চোখ মেলেই বললেন, ‘‘আমার ছেলে কোথায়?” মাকে হারানোর ভয়ে পাগল প্রায় ছেলে যেন আনন্দ জোয়ারে ভেসে উঠলেন। মাকে জড়িয়ে পাগলের মতো চুমু দিচ্ছেন আর বলছেন, “এই যে মা আমি আপনার ছেলে, আমি জানি আমাকে ছেড়ে আপনি যেতে পারবেন না”।
জীবিত থাকা অবস্থায় মা-ছেলের এই অসহায় সকরুণ দৃশ্য আমি আরও বহুবার দেখেছি। সালেমা বেগম এর সাথে মাঝে মধ্যে যেয়ে দেখা করতাম শুধুমাত্র ওঁনার ব্যক্তি জীবনের গল্প শোনার জন্য। তিনি নিয়মিত খবর দেখতেন। পত্রিকা পড়তেন এবং দেশ নিয়ে ভাবতেন। ওঁনার গল্পের বিষয় ছিল দেশ, রাজনীতি আর মুক্তিযুদ্ধ। আমি নারী সংগঠন করি জানার পর থেকে আমাদের সংগঠনের নানা কর্মসূচি কর্মকান্ড সম্পর্কে শুনতেন, পরামর্শ দিতেন। বর্তমান সমাজের সামাজিক অর্থনৈতিক অবস্থার যেমন পরিষ্কার ধারণা রাখতেন তেমনি ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে উনসত্তর-একাত্তর সব আন্দোলনই যেন ওনার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করতো। ভাষা আন্দোলনের সময় ওনার স্বামী ডা. এম এ সিকদার তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের এ্যানাটমি ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর। একুশে ফেব্রুয়ারির মিছিলের সময় আহত ছাত্রদের কিভাবে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসা হয়েছিল সেই ঐতিহাসিক স্মৃতিগুলো খালাম্মার মুখে শুনেছি। আহতদের চিকিৎসার সময় সালেমা বেগম বিকেল সন্ধ্যা রাত যখনই সময় পেতেন তাদের দেখভাল করতেন। সেই সময়ে সেই হিরোর টুকরো ছেলেদের দেখভালে তিনি মমতাময়ী মায়ের রূপ ধারণ করেছিলেন। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, গণ-অভ্যূত্থান, মুক্তিযুদ্ধ তাঁর মুখে এমন ভাবে শুনতাম অনেকটা রূপকথার মতো আমিও যেন সেই জায়গায় পৌঁছে যেতাম। এমন একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক মা- তাঁর সন্তানেরা সমর যুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে আনবেন এটাই স্বাভাবিক। রাজনৈতিক সামাজিক ও যুদ্ধের গল্প আড্ডায় আর ভালবাসায় ধীরে ধীরে খালাম্মা আর আমি ভীষণ রকমের বন্ধু হয়ে উঠলাম। বছরের ষোলই ডিসেম্বর বিজয় দিবসে মিষ্টি ফুল আর ভালো মন্দ রান্না করে নিয়ে সারাদিন খালাম্মার সঙ্গে কাটাতাম। বছরে এই একটা ‘দিন’ আমি প্রায় নীরবেই ওঁনার সঙ্গে উদযাপন করতাম। একবার দু’জন একসাথে খেতে বসেছি, তখন লক্ষ্য করলাম ওঁনার চোখে জল। বললেন- “বছরের পর বছর আমি একা একা খাই। মাঝে মাঝে খাবার একদম বিষের মতো মনে হয়। যখন বরিশালে থাকি তখনও একা। আবার যখন এই হাসপাতালে থাকি তখনও একা। কেমন করে সবকিছু হারিয়ে ফেললাম। কেনই বা এমন একা হয়ে গেলাম?” শুনে আমার মনটা বিষাদে ভরে যায়। সত্যি খাবারটা যেন বিষাদে বিষাক্ত হতে উঠলো। কিছুটা সময় চুপচাপ বসে রইলাম দু’জন তারপর অনেকটা আহ্লাদ করেই বললাম, “খালাম্মা এই যে আমি এত আসি আপনার কাছে। আমি বুঝি আপনার মেয়ে না? আপনারা মায়েরা একাত্তরে ওভাবে যদি নিজের ছেলেদের যুদ্ধে না পাঠাতেন তবে কি আমরা এই দেশটা পেতাম? দেখেন, কতো লক্ষ কোটি সন্তানেরা এই দেশে স্বাধীনভাবে বড় হচ্ছে, এ কি সম্ভব হতো যদি দেশটা স্বাধীন না হতো? এরা সব তো আপনারই সন্তান, লক্ষকোটি সন্তানের মা আপনি।” আমার কথা না ফুরোতেই মুহূর্তে ওঁনার মুখটা খুশিতে উজ্বল হয়ে উঠলো। তিনি মিরপুর মুক্তির অগ্রসেনানী লে. সেলিম সম্পর্কে বলতেন, “আমার কামরুল (লে. সেলিমের ডাক নাম) ছিল দুরন্ত, আর আমার বুলু (এম এ হাসানের ডাক নাম) ছিল শান্ত। দুইজন একেবারে বিপরীত। আমার কামরুল সারাদিন বাইরে বাইরে থাকতো। দল করতো, প্রতিবেশীদের কখন কি বিপদ হলো, বাইরের কাজ কর্ম, আর খেলাধুলায় মত্ত থাকতো। কিন্তু আমার বুলু ঘরের মধ্যে পড়ার টেবিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করে দিত। ওদের বাবার হাতে কামরুল তার দুরন্তপনার জন্য মারও খেতো। কিন্তু বুলুকে ওর বাবা খুব আদর করতো,পড়াশোনায় মনোযোগী ছিল সে। উনার স্বপ্ন ছিল বুলু একজন বিজ্ঞানী হবে।” আমার কামরুল (লে. সেলিম) এত দুরন্তপনার মধ্যেও এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষায় খুব ভালো রেজাল্ট করলো। আমরা তখন রাজশাহীতে। ও রাজশাহী ইনজিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হলো, ভালো শুটার ছিল। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ও যখন থার্ড ইয়ারে সেই সময়ে বুলুকে (এম এ হাসান) নিয়ে যুদ্ধে গেল। আমার বুলু তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে। ১৪ এপ্রিল প্রথম যুদ্ধ করলো ‘লালপুরে’ এরপর ‘তেলিয়াপাড়া’, ‘নরসিংদি’, ‘আখাউড়া’, ‘সালদা নদী’, ‘ফুলগাজী’, ‘পরশুরাম’, ‘বেলোনিয়া’ এরকম আরও কত জায়গায়। আমার কামরুল চিঠি লিখতো। একবার একটা চিঠিতে লিখলো, ‘‘মাগো অনেক দিন তোমার মুখ খানা দেখিনা, যখন তুমি আমাদের বিদায় দিলে আমার শুধু সেই ক্ষণটার কথাই মনে পড়ে, যখন তোমার কথা ভাবি, তোমাকে বাবাকে ছেড়ে আসতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো। তাই গেট থেকে আর পিছু ফিরে তাকাইনি।”
খালাম্মা মাঝে মধ্যে বলতেন, “কফিনে তো আমার কামরুলের (লে. সেলিম) দেহ ছিল না, এমনও তো হতে পারে, আমার কামরুল বেঁচে আছে!” খালাম্মা মৃত্যুর কিছু দিন আগেও এই কথা দ্বিতীয়বার বলেছিলেন, “যদি এমন হয় আমি মরে গেলাম আর কামরুল পৃথিবীর কোনো একটা জায়গা থেকে এসে হাজির হলো। আমি রোজ ভাবি কামরুল যদি হঠাৎ এসে বলে, মা আমি বেঁচে আছি।”
সালেমা বেগমের মতো তাঁর ছোট ছেলে ডা. এম এ হাসান নিজেও ভাই হারানোর যন্ত্রণা বয়ে বেড়ান প্রতি পদে পদে। সালেমা বেগম আর ডা. এম এ হাসানকে কখনো দেখিনি কোন উৎসব অনুষ্ঠানে মেতে উঠতে। আমি প্রশ্ন করলে সব সময় বলতেন, “এসব আনন্দ ফুর্তি ভালো লাগে না মা”। প্রতিটি বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবসে এমনকি প্রতি দিনই চোখের জলেই ডুবে থেকেছেন ওনারা। বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা রমা চৌধুরী স্বাধীন দেশের মাটিতে কখনও জুতো পায়ে হাঁটেননি। কারণ এই মাটি শহীদের রক্তে রঞ্জিত। আমরা এ প্রজন্মের অনেকে ভাবছিনা সত্যিই কি মূল্য দিতে হয়েছিলো মুক্তিযুদ্ধের সময় এ দেশের অধিকাংশ মানুষকে। আমরা যে কতোটা অকৃতজ্ঞ ও সুবিধাবাদী জাতিসত্ত্বা তা হয়তো আমরা কোনো দিনও বুঝবো না। ধীরে ধীরে মুক্তিযুদ্ধের সব জীবন্ত স্বাক্ষী মানুষগুলো ফুরিয়ে যাচ্ছেন। চলেন যাচ্ছেন। অথচ স্ফীত উদরে বেড়ে চলেছে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের সংখ্যা ও মানসিকতা। কে রুখবে রক্তস্নাত এ জাতির অধঃপতন?

যাইহোক, শহীদ মাতা সালেমা বেগমের সাথে আমার পথচলা ছিল ওঁনার জীবনের শেষের প্রায় দশটি বছর। ২০০৮ এর এপ্রিলের এগারো হতে ২০১৮ জানুয়ারীর উনিশ তারিখ পর্যন্ত আমি তার সাথে ছিলাম। খালাম্মা মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত কাজগুলো করার জন্য তাঁর ছোট ছেলে এম এ হাসানকে সঙ্গী করে কঠিন পথে যাত্রা শুরু করলেন। বিরানব্বই সালে বরিশালে ’৭১ এর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আহবায়ক হিসেবে ওঁনাকে নির্বাচন করা হলো। শুরু হলো গ্রাম গঞ্জে মিটিং, জনসংযোগ, ঘাতক দালালদের চিহ্নিত করে ফাঁসির দাবী তোলা। মিরপুরে মুসলিমবাজার বধ্যভূমি আবিষ্কার করার পর ছোট ছেলের হাত ধরে খুঁজে ফিরতেন বড়ো ছেলের অস্থি-করোটি। ডা.এম এ হাসান মুসলিম বাজার বধ্যভুমির শত শত হাড়গোড় এর ডিএনএ প্রোফাইলের কাজ করেন বাংলাদেশে প্রথম। জল্লাদ খানার বধ্যভূমির এসব হাড়গোড় মাথার খুলি গুলো খালাম্মা হাতিয়ে দেখতেন আর খুঁজে ফিরতেন তাঁর আদরের সন্তান কামরুলের শেষ চিহ্ন। এক বীর মায়ের অটুট দৃঢ়তা, সাহস, প্রেরণা আর উদ্দ্যোগেই ডা. এম এ হাসান যুদ্ধপরাধীদের বিচারের জন্য গবেষণার কাজ শুরু করেন। গঠন করেন ‘ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিংস কমিটি’।
নব্বই এর শুরুতে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হবার আগেই ডাঃ এম এ হাসান গঠন করেছিলেন ‘লেঃ সেলিম মঞ্চ’। এর উদ্দেশ্য ছিলো- যুদ্ধপরাধী ও জামাত শিবিরের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন গড়ে তোলা। দুই বছর মা ছেলে অক্লান্ত পরিশ্রম করে লেঃ সেলিম মঞ্চের আন্দোলন শুরু করেন। কিন্তু ১৯৯২ এর জানুয়ারীতে ওঁনার ছোট মেয়ে খুকু ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মেয়ের মৃত্যুর পরে নাতনিকে সাথে নিয়ে তিনি বরিশালে ফেরত যান এবং ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির বরিশাল শাখার আহবায়ক হিসেবে ছিয়ানব্বই সাল পর্যন্ত পূর্ণ উদ্যমে কাজ করেন। ১৯৯৭ এর জানুয়ারীতেই তিনি তাঁর স্বামীকে হারান। স্বামীর মৃত্যুর পরে আবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং নিঃসঙ্গ হয়ে যান।
১৯৭২ এর ৩০ জানুয়ারী অবরুদ্ধ মিরপুরে সেনা ও পুলিশ যৌথ অভিযানে লেঃ সেলিম শহীদ হওয়ার পর লেঃ সেলিমের বাবা ডা. এম এ সিকদারকে ডেকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু জানতে চেয়েছিলেন, “আপনাকে কি দিয়ে সাহায্য করতে পার”? ডা. এম এ সিকদার নাকি বলেছিলেন, “আমি কিছুই চাই না। শুধু আমার ছোট ছেলেটাকে সামরিক বাহিনী থেকে অব্যাহতি দিন। ওর মেডিকেল এর পড়াশোনা শেষ করে আমার কাছে থাকুক। এক ছেলেকে হারিয়েছি এখন এই ছেলেই আমার সম্বল”
এরপর থেকে ছোট ছেলে ডা. এম এ হাসান আক্ষরিক অর্থেই ওঁনাদের জীবনের একমাত্র অবলম্বন হয়ে রইলেন। একই সাথে একই আদর্শে বেড়ে ওঠা, একসঙ্গে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করে ফেরত আসা ভাইকে হারিয়ে তিনি একাই বাবা-মায়ের, দুই বোনের দায়িত্ব নিয়ে নিলেন। একটা জিনিস দেখতাম। প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে ডা. এম এ হাসান ভীষণ আতঙ্কে ভুগতেন। বলতেন,”এ মাসে আমার বাবা, ভাই বোন সবাই চলে গেল তাই জানুয়ারি মাস এলেই আমার মা’ কে নিয়ে ভীষণ ভয় হয়”। সত্যি সত্যি সেই জানুয়ারি মাসেই পরলোকে চলে গেলেন শহীদ মাতা সালেমা বেগম। জীবনের শেষ কটি বছর ওঁনাকে শুধু দুঃখের সাগরে ভাসতেই দেখেছি। ওঁনার ছোট নাতি ডাঃ আদিব হাসানের বিয়ে হয় ২০১০ এ। বিয়ের ঠিক তিন মাসের মাথায় ছেলেটি কঠিন রোগাক্রান্ত হয়ে অবশেষে জীবন রক্ষা পায় ঠিকই কিন্তু তার দুটি পা চিরকালের জন্য অবশ হয়ে যায়। চিকিৎসার জন্য ডাঃ এম এ হাসান ছেলেকে নিয়ে ভারত, আমেরিকা, চীন, জাপান, জার্মানি, সিংগাপুর এসব দেশে কয়েকবার করে নিয়ে যেয়ে চিকিৎসা করিয়েছেন। অপারেশন করিয়েছেন কিন্তু আদিব হাসানের দুটি পা আর আগের অবস্থায় ফিরে আসেনি।
চিকিৎসার ব্যয়ভার মেটাতে গিয়ে ডা. এম এ হাসান তিনি তার বাড়ি ঘর, জমিজমা বন্ধক রেখে সহায় সম্পত্তি বিক্রি করে ছেলের চিকিৎসা খরচ চালান এবং দিন শেষে বিশাল অংকের ব্যাংক ঋণ শোধ করতে করতে এখনো তিনি হিমশিম খাচ্ছেন। ওঁনার একমাত্র আয়ের উৎস ছিল আলবিরুনী হাসপাতাল। তাঁর অনুপস্থিতিতে এবং সুযোগ সন্ধানীদের কারণে ধীরে ধীরে এ হাসপাতালটি রোগী শূণ্য হতে থাকলো।
মৃত্যুর ছ’মাস আগে খবর পেলাম খালাম্মা খাবার ছেড়ে দিয়েছেন প্রায় এবং ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছেন। উনিশ জানুয়ারি ২০১৮ সকাল প্রায় দশটা নাগাদ খবর পেলাম, খালাম্মা আর নেই।
তিনি সেদিন দুপুরে না ফেরার দেশে চলে যান।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







