গেল বছর এই সময়ে সারাবিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল রোহিঙ্গা গণহত্যা ও তাদের মানবিক সঙ্কট। প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে দলে দলে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল। আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের মুখে মুখে ছিল হত্যা-নির্যাতনের নানা ঘটনা, যদিও মিয়ানমার সরকার তা অস্বীকার করে আসছিল প্রথম থেকেই।
ওই সময়ে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর হামলা ও নির্যাতন থেকে পালিয়ে রক্ষা পাওয়া কয়েকশ’ সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে গণহত্যার স্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘ। সেই প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রাখাইন রাজ্যে গণহত্যা এবং অন্যান্য অঞ্চলে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত করার দাবি জানিয়েছে জাতিসংঘ। এর মধ্য দিয়ে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) তোলার আহ্বানও জানিয়েছে এই আন্তর্জাতিক সংগঠন। গত বছরের ২৫ আগস্ট ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এটাই জাতিসংঘের পক্ষ থেকে সবচেয়ে কঠোর ভাষায় নিন্দা ও সমালোচনা।
জাতিসংঘ মনে করে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর গৃহীত কৌশলগুলো বাস্তবে থাকা নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির সঙ্গে ‘ধারাবাহিক এবং প্রবলভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ’। অর্থাৎ যতটা ঝুঁকি বাস্তবে আছে, সেনাবাহিনীর নেয়া প্রতিরোধ ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাগুলো তার চেয়ে অনেক বেশি কঠোর ও নির্মম। প্রতিবেদনটিতে ৬ জন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার নাম-পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে যাদেরকে এজন্য বিচারের আওতায় আনা দরকার বলেও মনে করে জাতিসংঘ।
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংস অভিযান ঠেকাতে বা হস্তক্ষেপ করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ায় জাতিসংঘ মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের নেতা এবং রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চি’রও ব্যাপক সমালোচনা করেছে ওই প্রতিবেদনে।
গণহত্যা যেকোনো সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ। জাতিসংঘের অনুসন্ধানকারীদের পক্ষ থেকে খুব কমই এ ধরনের অভিযোগ আনা হয়। এ ধরণের পরিস্থিতিতে অভিযুক্তদের বিচার সাধারণত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) হয়ে থাকে। ইতিমধ্যে আইসিসি’র প্রাক–শুনানি আদালতে বিষয়টি আলোচিত হয়েছে, সেখানে গত ১২ জুন বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সঙ্কট বিষয়ে নেদারল্যান্ডসে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে অভিমত জমা দিয়েছে। তবে চিন্তার কথা হচ্ছে, তদন্ত-শুনানি যাইহোক না কেন, রোম সনদে সই না করার কারণে মিয়ানমারের বিচার করা নিয়ে আইনি জটিলতা আছে বলে জানিয়েছে অনেক বিশেষজ্ঞ।
এ অবস্থায় বিশ্বের বিভিন্ন পরাশক্তির দিকে তাকিয়ে সারাবিশ্বের বিবেকবান মানুষসহ পরিস্থিতি সামাল দিয়ে চলা বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোর বেশ ইতিবাচক মনোভাব থাকলেও এশিয়া দুই পরাশক্তি ভারত-চীনের মিয়ানমার প্রীতির কারণে মিয়ানমার এখনও গোঁয়ার্তুমি করতে সাহস পাচ্ছে বলে পররাষ্ট্র বিশেষজ্ঞদের ধারণা। এই অবস্থায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার শেষ পরিণতি কী হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। হঠাৎ দেশ হারিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ১০ লাখ মানুষের সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান বাংলাদেশের চেষ্টার পাশাপাশি জাতিসংঘের নেতৃত্বের মাধ্যমে আসুক, এই আমাদের প্রত্যাশা।









