পূর্বের রেকর্ডের মধ্যে আবহাওয়া চক্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ‘এল নিনো’ (যার অর্থ ছোট বালক) এর প্রভাবে ২০১৬ সালে লাখ লাখ মানুষের ক্ষুধা এবং রোগের হুমকি বৃদ্ধির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সাহায্যকারী সংস্থাগুলো। বিশ্ব তাপমাত্রা বৃদ্ধি করা এবং আবহাওয়ার ধরনে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা উল্লেখযোগ্য এই ঘটনার ফলে বিশ্বের কিছু অংশে ক্ষরার প্রকোপ যেমন বৃদ্ধি পাবে ঠিক তেমনি এর বিপরীত অংশে বাড়বে বন্যা।
সবচেয়ে খারাপভাবে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কায় থাকা আফ্রিকায় ফেব্রুয়ারি মাসে খাদ্য ঘাটতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছাবে। পরবর্তী ছয় মাসে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলসমূহসহ মধ্য এবং সাউথ আমেরিকাও আক্রান্ত হবে। আবহাওয়ার এই পর্যায়ক্রমিক ঘটনায় উষ্ণতম বছর হিসেবে ২০১৫ কে ছাড়িয়ে যাবে নতুন বছর ২০১৬।
ইউনিভার্সিটি অব রিডিং এর ড. নিক ক্লিংমান বলেন, কিছু হিসাবে এই এল নিনো ইতিমধ্যে রেকর্ডকৃত সবচেয়ে শক্তিশালী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মাত্রা নির্ভর করে আপনি কিভাবে তা হিসাব করছেন।
ক্ষরা এবং বন্যা উভয়ই সংঘটিত হওয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাবের মাত্রা সাহায্যকারী সংস্থাগুলোকে আতঙ্কিত করে তুলছে। আফ্রিকা জুড়ে তিন কোটি ১০ লাখের মতো মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখিন হবে, যা গতবছরের চেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে বেশি। এদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ মানুষ ইথিউপিয়ার অধিবাসী। ২০১৬ সালে যেখানে এক কোটি দুই লাখ মানুষের মানবিক সহায়তার প্রয়োজন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ক্ষরা এবং অনিয়মিত বর্ষন গুয়েতেমালা, হন্ডুরাস, এল সালভাদর এবং নিকারাগুয়ার বিশ লাখ মানুষকে আক্রান্ত করবে। মধ্য আমেরিকায় জানুয়ারিতে আরও বেশি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
গ্রীষ্মমন্ডলের অনেক দেশে আমরা ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের বড় ধরনের হ্রাস লক্ষ্য করেছি। তীব্র ক্ষরার অভিজ্ঞতা হয়েছে ইন্দোনেশিয়ার। ভারতীয় মৌসুমি বায়ু স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ কম ছিলো এবং ব্রাজিল ও অস্ট্রেলিয়াতেও মৌসুমি বায়ুর হ্রাস পাবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।
সাহায্য সংস্থা অক্সফাম শঙ্কা প্রকাশ করেছে যে এল নিনোর প্রভাব ২০১৬ সালে সিরিয়া, সাউথ সুদান এবং ইয়েমেনে চলমান অস্থিতিশীলতা আরও বৃদ্ধি করবে। ফেব্রুয়ারিতে আফ্রিকার দক্ষিণাংশে খাদ্য ঘাটতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছাবে। এর মধ্যে মার্চের আগে মালাউয়ির প্রায় ৩০ লাখ মানুষের মানবিক সহায়তার প্রয়োজন হবে। উন্নত বিশ্বে প্রভাবটি পড়বে খাদ্য মূল্য বৃদ্ধিতে।
২৬ লাখ জনগণ এবং এক লাখ ২০ হাজার অপুষ্ট শিশুকে জরুরি সহায়তা সরবরাহ করছে উল্লেখ করে যুক্তরাজ্যের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট বিভাগ (ডিএফআইডি) জানিয়েছে, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে তারা ৮০ লাখ জনগণকে খাদ্য এবং নগদ অর্থ সহায়তা সরবরাহ করবে।
যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন মন্ত্রী নিক হার্ড এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, এল নিনো’র মোকাবেলায় এখনই কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে যদি আমরা ব্যর্থ হই, তবে বিশ্বজুড়ে অরক্ষিত জনগণকে সুরক্ষায়ও আমরা ব্যর্থ হবো। আক্রান্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উদ্ভুত দেশগুলোর পাশাপাশি ব্রিটেনের জাতীয় স্বার্থের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। অরক্ষিত দেশগুলো রক্ষা এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মাধ্যমেই খাদ্য বা নতুন জীবিকার সন্ধানে মানুষের ঘর ছাড়তে বাধ্য হওয়ার অবস্থা রোধ করা যাবে।
এই এলাকাগুলোতে মানুষের পর্যাপ্ত খাদ্য এবং পানি প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধানে জরুরি ভিত্তিতে সহায়তা ব্যবস্থা করতে হবে বলেও নিক জানান। তিনি বলেন, আফ্রিকা দক্ষিণাংশে এবং ল্যাটিন আমেরিকায় আসন্ন সংকট মোকাবেলায় পদক্ষেপ গ্রহণে বিশ্ব যদি অপেক্ষা করে তবে আমরা সফল হবো না।
আবহাওয়া চক্রের একটি প্রাকৃতিক ধাপ ‘এল নিনো’, যে সময়ে কেন্দ্রীয় প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ জল পূর্ব দিকে অর্থাৎ উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকার দিকে বিস্তার লাভ করে। পঞ্জিকাবর্ষের শেষদিকে সর্বোচ্চ সীমায় পৌছানো পর্যায়টি প্রতি দুই থেকে সাত বছরের মধ্যে হয়ে থাকে যার প্রভাব পরবর্তী বসন্ত মৌসুম পর্যন্ত ভালোভাবে স্থায়ী থাকতে পারে এবং ১ বছরব্যাপী থাকতে পারে।
প্রশান্ত মহাসাগরে ব্যতিক্রমিভাবে উষ্ণ জলের উপস্থিতি দেখতে পেয়ে ১৬০০ সালের দিকে সাউথ আমেরিকা উপকূলের জেলেরা প্রথম এই পর্যায়টির স্বীকৃতি দেয়। এল নিনো শব্দটির অর্থ ছোট বালক বা খিষ্ট শিশু।
এল নিনো-সাউদার্ন অসিল্যাশন (ইএনএসও) চক্রের একটি অংশ এল নিনো। চক্রটির ঠিক বিপরীত পর্যায় হলো লা নিনা। লা নিনা কখনো শীতল পর্যায় বলে উল্লেখিত হয় এবং এল নিনোকে বলা হয় উষ্ণ পর্যায়। ১৯৯৮ সালের পর থেকে সাম্প্রতিক এল নিনোর পর্যায়টি সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনা এবং রেকর্ডকৃত সবচেয়ে শক্তিশালী তিনটির মধ্যে অন্যতম। ডাব্লিউএমও এর মতে, সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকা তিন মাসে উষ্ণমন্ডলীয় প্রশান্ত সাগরের উপরিভাগের পানির গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হবে।







