নানান জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষে শেয়ারবাজারে আসার চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো।
সৌদি গণমাধ্যমের বরাতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে, আগামী ডিসেম্বরে শেয়ারবাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ করবে আরামকো। তা হলে আরামকোই হবে শেয়ারবাজারের ইতিহাসে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আইপিও।
সৌদি গণমাধ্যম জানায়, ১০ নভেম্বর সৌদি আরামকো বিস্তারিত প্রকাশ করবে। রিয়াদ স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষও আনুষ্ঠানিকভাবে আরামকোর শেয়ার ছাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
বিবিসি বলছে, মূলত ৫ শতাংশ শেয়ার ছাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে আরামকোর। এর মধ্যে ডিসেম্বরে ১/২ শতাংশ এবং আগামী বছর ছাড়তে পারে ৩ শতাংশ শেয়ার।
২০১৬ সালে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ২০৩০ ভিশন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আরামকোর নতুন পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ২০১৮ সালে এসে সেই ইঙ্গিত প্রকাশ্যে আসে যখন আরামকোকে রিয়াদ জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে পরিণত করা হয়।
বিবিসি বলছে, আরামকোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আমিন নাসের এই মুহুর্তকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে আরামকোর দুটি স্থাপনায় ড্রোন হামলা তার শেয়ারের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

আরামকো এখনো বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তেল কোম্পানিও, বলছেন তিনি।
বিবিসি বলছে, এই মুহূর্তে আরামকোর বাজার মূল্য হচ্ছে, দুই ট্রিলিয়ন হতে তিন ট্রিলিয়ন ডলার। (এক ট্রিলিয়ন মানে এক লাখ কোটি)। দ্বিতীয় স্থানে থাকা অ্যাপলের বাজার মূল্য হচ্ছে ৮৭৬ বিলিয়ন ডলার। আর গুগলের পেরেন্ট কোম্পানি অ্যালফ্যাবেটের বাজার মূল্য ৭৫৫ বিলিয়ন ডলার। ফলে আরামকোর ধারে কাছেও নেই অন্য কেউ।
সৌদি আরামকো যে শুধু বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল কোম্পানি তাই নয়, এটির পর যে কোম্পানিটি দ্বিতীয় স্থানে আছে, তার চাইতেও এটি বহুগুণ বড়। সৌদি আরামকোর তেলের রিজার্ভ হচ্ছে এই মূহুর্তে ২৬১ বিলিয়ন ব্যারেল। আর দ্বিতীয় স্থানে থাকা মার্কিন কোম্পানি এক্সনের তেলের রিজার্ভ হচ্ছে ১৩ বিলিয়ন ব্যারেল
১৯৩৩ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বরে একদল আমেরিকান জিওলজিস্ট এর হাত ধরে সৌদি আরবের পারস্য উপসাগর তীরের বন্দর জুবেইলে তেল আবিস্কার। সে বছরের জুলাই মাসে ঘাওয়ার তেল ক্ষেত্র আবিস্কারের পর সৌদি বাদশাহ আবদুল আজিজ মার্কিন কোম্পানি স্ট্যান্ডার্ড অয়েল’কে সৌদি আরবে তেল অনুসন্ধানের অনুমতি দেন।
তার সূত্র ধরেই এই বিজ্ঞানীদের সৌদি আরবে আসা। এরপর বাকীটা ইতিহাস। সৌদি আরব সরকার আর মার্কিন কোম্পানি স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের মধ্যে এই চুক্তির পথ ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয় অ্যারাবিয়ান আমেরিকান অয়েল কোম্পানি (আরামকো)। সৌদি সরকারকে প্রাথমিকভাবে ৫০ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড ছাড়াও আয় অনুযায়ী অর্থ দেয়ার অঙ্গীকার করে আরামকো। আরামকো সৌদি আরবের কিছু এলাকায় তেল অনুসন্ধানের একচেটিয়া অনুমতি পায়।
১৯৩৮ সালে দাহরানের কাছে দাম্মাম তেল ক্ষেত্র আবিস্কার করলো আমেরিকান প্রকৌশলীরা। ১৯৭৩ সালে আরব ইসরায়েল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের পক্ষ নেয়ার পর সৌদি আরব সরকার আরামকোর ২৫ শতাংশ শেয়ার নিয়ে নেয়। ১৯৭৪ সাল নাগাদ সৌদি সরকারের মালিকানা বেড়ে দাঁড়ায় ৬০ শতাংশে। আশির দশক নাগাদ পুরো কোম্পানিকেই রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়ে আসে সৌদি সরকার।
এনার্জি ইনফরমেশন এডমিনিস্ট্রিশেন এর তথ্য মতে, ভেনিজুয়েলার পর সৌদি আরবের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেলের মজুদ রয়েছে। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরেও দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। তবে এটি এর সুনাম অর্জন করে কারণ দেশের সমস্ত তেলের উপর এটির একচেটিয়া রয়েছ। এবং এখান থেকে তুলনামূলক সস্তায় তেল উত্তোলন করা যায়।
স্নাইডার ইলেকট্রিকের মার্কে স্টাডির পরিচালক ডেভিড হান্টার বলেছেন, আরামকো বিশ্বের বৃহত্তম অব্যক্ত তেল উৎপাদনকারী সংস্থা। ‘এটি সমস্ত তেল ও গ্যাস সংস্থার পরম মা’
সৌদিতে তেল উৎপাদন সস্তায় করা যায়। প্রতি ব্যারেলে ১০ ডলারেরও কম।
শেয়ার বাজারে আরামকোর শেয়ার ছাড়ার ঘটনাটিকে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীরা এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
মূলত সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদি অর্থনীতিতে সংস্কারের লক্ষ্যে ‘ভিশন ২০৩০’ বলে যে পরিকল্পনা ঘোষণা করেন, এটি তারই অংশ। তিনি তেলের ওপর সৌদি অর্থনীতির নির্ভরতা কমাতে চান। অর্থনীতির বিভিন্ন খাত বাইরের বিনিয়োগের জন্য খুলে দিতে চান। সেই সঙ্গে ২০১৪ সাল হতে সৌদি সরকার যে বাজেট ঘাটতির মুখোমুখি, সেটি কমিয়ে আনতে চান।







