এ কোন বিশ্বাসহীনতার অন্ধ গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছি আমরা! চোখের তারায় আমাদের অনিঃশ্বেস সন্ধিগ্ধতা, দিশেহারা আতঙ্ক আমাদের নিত্য সহচর এ ভাবে পুরুষকে পাশে নিয়ে কী ভাবে বাঁচবে মেয়েরা? অল্প চেনা থেকে অতিপরিচিত, এমনকী নিকটতম পুরুষ বন্ধুটিকে ঘিরেও আমাদের সম্পর্কের নামে সর্বদা সন্দেহের পাঁচিল তুলে রাখতে হয়। কোনও সম্পর্কের কি এটাই গভীর ট্রাজেডি নয়?
আমাদের সমাজে নারীদের সম্পর্কে পুরুষের সাধারণ মনোভাব হলো, মেয়ে মানেই যৌনবস্তু। সম্ভোগের বস্তু। তাকে ধর্ষণ করা যায়। সম্ভোগ করা যায়। আসলে সমাজ যৌনতার সঙ্গে নারীকে লগ্ন করেই যাবতীয় বৈধতা দিয়ে এসেছে বরাবর। তাই মহাভারতে দ্যূতসভায় সর্বসমক্ষে দ্রৌপদীকে ঊরু প্রদর্শন করে দুর্যোধন যে কুৎসিত যৌন ইঙ্গিত করেছিলো, দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের যে অভাবনীয় স্পর্ধা দেখাতে পেরেছিল দুঃশাসন সকল বিশুদ্ধ জ্ঞানীজন, বয়োজ্যেষ্ঠ গুণিজন নীরব দর্শক ছিলেন সে দিনও।
কারণ, চিরটা কাল মেয়েদেরকে মনে করা হয়েছে যৌনতার প্রতিরূপ। রামায়ণে সীতার অগ্নিপরীক্ষার মধ্যে নিহিত ছিল তার সতীত্বের প্রতি কদর্য সন্দেহ, সীতার নির্বাধ অশ্রুজলে কি প্রশ্ন উঠে আসেনি যে রাম-লক্ষ্মণের সঙ্গে রাবণের বিরোধের সমস্ত জের কেন সীতাকে বইতে হয়েছিলো? রাজবধূদেরই যখন এই দশা, তা হলে সাধারণ মেয়েরা দাঁড়ায় কোথায়? আসলে মেয়ে ও ধর্ষণ, নারীর সঙ্গে নারকীয়তা, কন্যা-জায়া-জননী আর যৌনতা পরস্পরের বিকল্প শব্দ হিসেবে মেনে নেবার সেই ট্র্যাডিশন আজও চলেছে।
তাই কয়েকদিন পরপর পত্রিকার শিরোনামে উঠে আসে একেকটি মর্মান্তিক ধর্ষণের খবর। এই ভয়ানক সামাজিক প্রবণতার দহনে ক্ষয়ে যেতে থাকে মেয়েদের বাইরের সব শক্তি, ভেতরের সঞ্চিত সব অঙ্গীকার কুঁকড়ে যেতে থাকে তারা। নারী ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করলে তার কথার যাবতীয় সত্যতা প্রমাণের দায় একমাত্র নারীর ওপর বর্তায় (যদিও সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান এর বিপরীত বিন্দুতে), কত সহজে কেবল নারীটিকেই ‘বাজে’ ‘খারাপ’ ‘নষ্ট’ বিশেষণে দেগে দেওয়া যায়!
ষড় রিপুর মধ্যে অন্য কোনও রিপুর চরিতার্থতা নারীকে যৌন আক্রমণের মতো এমন সহজসাধ্য উপায়ে মেলে না বলে ধর্ষকের চরমতম অপরাধও কত অনায়াসে রূপান্তরিত হয়ে যায় কেবল মাত্র ধর্ষিতার লজ্জায়। সমাজের এই দুঃসহ প্রশ্রয় পুষ্টতর হয়ে ওঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পুরুষদের নানা হঠকারী মন্তব্যে। সমাজের নিরাবরণ চেহারাটা আরও প্রকট ও মারাত্মক হয়ে ওঠে। যৌনতার সঙ্গে রমণীকে লীন করে দেবার আক্ষরিক এই প্রয়াস আমাদের স্তব্ধ করে দেয়।
সেই পুরাকালে মুনি-ঋষিদের যৌনতার সুড়সুড়ি দিয়ে তপোভঙ্গ থেকে শুরু করে আজকের টিভির পর্দায় মদের বিজ্ঞাপন পর্যন্ত সর্বত্রই মেয়েদেরকে যৌনতার ভাষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখছি। পুরুষতান্ত্রিক বিধানে যৌনতার অনুষঙ্গকে বহন করে চলার আবহমানকালীন অভ্যাস মেয়েদের মেনে নিতে হয়েছে বলে নিজস্ব এক সন্ত্রাসের জগতে বাঁচাটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের অনিবার্য নিয়তি। সে জগতে অবিশ্বাস-ধস্ত নারী, পুরুষের প্রতিপক্ষে একা নারী, তাদের মন সেখানে অস্বীকৃত-উপেক্ষিত, কেবল আছে শরীরটুকু আর তাকে ঘিরে আদিমতার উল্লাস।
ভোগের সেই উৎসবে শামিল শত-সহস্র-লক্ষ জন। নইলে ব্যক্তিগত শারীর লালসা থেকে পারিবারিক বিবাদের আক্রোশ পর্যন্ত যে-কোনও কারণেরই সহজ শিকার নারী, প্রতিশোধ স্পৃহার সহজ নিবৃত্তি ধর্ষণ কেন? এই হিংস্রতার অনালোচিত বৃত্তে ধরা দিতে হয় কখনও সপ্রতিভ কোন কিশোরীকে, বাসযাত্রী নিরীহ গৃহবধূকে, হতদরিদ্র কাগজ কুড়ুনিকে। আবার কখনও আট-নয় বছরের স্কুল ছাত্রীকে, মূক-বধির তরুণীকে, এমন কী দুই-তিন বছরের শিশুকন্যাকেও, কারও নিস্তার নেই।
শুরুর যেমন অন্য এক শুরু থাকে, সব শেষের থাকে অন্য কোনও শেষ। ধর্ষণের পরেও থাকে আর এক রকম ধর্ষণ। তাই পুরুষের সঙ্গে সমান আগ্রহে যে নারীরাও ধর্ষিতার পেশা, জীবনযাত্রা, বিবাহজনিত সুলুকসন্ধান করেন এবং শেষ পর্যন্ত নারীটিকে অভিযুক্ত সাব্যস্ত করে মহাস্বস্তির কাঙ্ক্ষিত শ্বাস ফেলেন তারা যে আসলে পুরুষতন্ত্রেরই মুখ, পিতৃশাসনেরই স্বর, এ কথা বুঝি নিজেরাও বোঝেন না।
মনে পড়ে যায় ‘আদালত ও একটি মেয়ে’ অথবা ‘দহন’-এর যন্ত্রণাময় দৃশ্যগুলো। একবার ধর্ষণের পর প্রতিদিনের ধর্ষণ কী ভাবে মেয়েদের জীবন তছনছ করে দেয়, কত সহজে বেদনার দীর্ণতায় ভরে দিতে পারে মেয়েদের অস্তিত্বকে। চূড়ান্ত অবমাননা ও রুদ্ধশ্বাস ক্লেশ বিচিত্র কৌশলে যেখানে নারীকে সইতে বাধ্য করা হয়, সেখানে শোষণ আর যৌনতা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
নারীর যৌনতাকে ব্যবহার করার সমাজসিদ্ধ অন্য একটি প্রসঙ্গের অবতারণা বোধ হয় বাহুল্য হবে না। আমাদের বাক্বিন্যাসে যত ধরনের গালাগালি প্রচলিত তার সিংহভাগের সঙ্গেই জড়ানো আছে নারীর যৌনতা। পুরুষের যে কোনও মাত্রার ক্ষোভ-ক্রোধ-জ্বালা প্রকাশে মেয়েদেরকে এমন কদর্য ভাবে যুক্ত করে তোলার দিকটিও সেই পিতৃতান্ত্রিক দমনেরই ভিন্নতর প্রতিচ্ছবি।
দু’বর্ণের ক্রিয়াযোগে বা অমুকের ছেলে ইত্যাদি অশ্রাব্য শব্দাবলি বাদ দিয়ে ‘অপেক্ষাকৃত নির্মল’ একটি গালি ‘শালা’র অর্থগত বিশ্লেষণ করলে দেখব এখানে বক্তা উদ্দিষ্ট ব্যক্তির বোনের সঙ্গে নিজের যৌন সম্পর্কের ইঙ্গিত সূচিত করছে। পুরুষতান্ত্রিক এই ধ্যান ধারণাকে দুমড়েমুচড়ে দেবার দিন এসেছে। এ কাজে পুরুষদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। কারণ এই ধ্যানধারণাগুলো তৈরি করেছে পুরুষরাই। শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায় তার চিড়িয়াখানা উপন্যাসে লিখেছিলেন– যে জাতি নিজেদের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়েছে তারা আর কাকে শ্রদ্ধা করবে? কথাটি ভাবার মত।
নিজের প্রতি শ্রদ্ধা নিয়ে আসে নিজের মেরুদন্ডের জোর, প্রশ্ন করার ক্ষমতা, প্রতিবাদ করার সাহস। কিন্তু বাঙালি হিসেবেই শুধু নয়, এই দেশের নাগরিক হিসেবে আমি অনুভব করি এই যে, আমাদের নিজেদের প্রতি-ই আর কোনও শ্রদ্ধা নেই। থাকলে এত বেশি সহিষ্ণু হয়ে থাকতে পারতাম না আমরা। বিশেষ করে যখন অমানবিকতা এবং নৈরাজ্যে আমাদের সকলেরই পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? না কি আমরা রাষ্ট্রের পেতে দেওয়া ভোগের জালে আবদ্ধ হয়ে অনুভব-ই করতে পারছি না কীভাবে, ঠিক কীভাবে আমাদের প্রতি মুহূর্তে ধর্ষণ করে চলেছে এই রাষ্ট্র।
কুমিল্লায় আমাদের এক বোনের মৃত্যু আমাদের এই প্রতি মুহূর্তে ধর্ষিত হয়ে চলা অস্তিত্বের এক রূপক। তাকে মানুষের বাচ্চারা নির্মম ভাবে হত্যা করেছে। কিন্তু শুধু কি তাকেই হত্যা করেছে? সেই কি শুধু একা? পার্বত্য চট্টগ্রামে গ্রামের পর গ্রামে নারীরা ধর্ষিত হন, খুন হন, কেউ কিছু বলেন না। হাঁ, আমিও চাই কুমিল্লার মেয়েটিকে যারা এভাবে হত্যা করল, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হোক।
কিন্তু আমরা কি চাইব না এক নিরুপদ্রপ পৃথিবী জন্ম নিক? চাইব না সভ্যতার এই সংকট দূর হোক আমাদের জীবন থেকে? চাইব না একটু ভালো ভাবে, নিরাপদে বাঁচুক আমার মেয়ে? আমার মা-এর দিকে একটু গর্বের সঙ্গে তাকাতে পারব না? আমার বোনের জন্য একটু নির্ভয় মনে থাকতে পারব না? আমার বান্ধবীর সাহসে জাগাতে পারবো না উৎসাহের স্পর্শ?
বড় লজ্জা করছে। রাগ হচ্ছে। একমাত্র গণ অভ্যুত্থান পারে ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে। সেই পরিবর্তনের অভ্যুত্থান আমরা কী সৃষ্টি করব না? আমরা কি অনেক সহ্য করে ফেলিনি? আর কতদিন? আমাদের মেরুদণ্ড কি নেই? আমরা কি শুধুই সহ্য করে যাব? রোম যখন পুড়বে, তখন বেহালা বাজাব নীরোর মত? প্রেমের কবিতা লিখব? বানানো সাজানো গোছানো মিথ্যে কথা লিখে যাব? ভয় পেয়ে যাব রাষ্ট্রকে? দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষকে কি পারে রাষ্ট্র খুড়োর কল সামনে রেখে পোষ্য করে রাখতে? ভয় দেখিয়ে দেখিয়ে মেরুদণ্ড বাঁকিয়ে দিতে? প্রতিবাদের ভাষা কেড়ে নিতে? চোখে ঠুলি পরিয়ে রাখতে?
রবি ঠাকুর তো আমাদের দেখিয়েছেন, যে যখন জ্বলে ওঠার সময়, তখন জ্বলে উঠতে হয়। জালিয়ান ওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের পর প্রতিবাদে কারোও সঙ্গ না পেয়ে উনি তো একাই জুতো মেরেছিলেন ইংরেজদের মুখে। তাহলে আমরা কেন ফুঁসে উঠব না? গর্জে উঠব না? গর্জে আমাদের উঠতেই হবে। কারণ এ সময়টা মোটে ফুল খেলবার নয়।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






