উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি দীর্ঘদিনের হলেও এবার নানা কারণে তা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। পরীক্ষার জন্য দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়ানো পরীক্ষার্থীরা সেই ভোগান্তি আর বিড়ম্বনার কথা জানিয়েছেন।
ভর্তিচ্ছুরা জানিয়েছেন, দীর্ঘ যাত্রাপথের ধকলের সঙ্গে যোগ হয় এবার যোগ হয়েছে ঢাকার রাজপথের অসহনীয় যানজট, এরপর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাইরের কেন্দ্রগুলোতে সিট খুঁজে পরীক্ষা দেওয়ার সেই অভিজ্ঞতা ছিলো ভয়ানক।
অবশ্য শিক্ষাবিদরা এমন ভোগান্তির কথা পুরোপুরি স্বীকার না করে বলছেন, ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব হয়েছে।
বেশ কয়েক বছর ধরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার বিষয়টি আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তাবায়ন হয়নি। যদিও ২০১৩ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে উপাচার্যদের সভায় বেশিরভাগ উপাচার্য সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছিলেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অসহযোগিতায় সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেয়া যাচ্ছে না।
কোনো কোনো শিক্ষাবিদের মতে, ভর্তি ফরম বিক্রি বাবদ কোটি কোটি টাকা আয়ের যে পথ তা বন্ধ হবে বলেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতিতে যেতে চায় না।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, গত শিক্ষাবর্ষে (২০১৫-১৬) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি ফরম বাবদ আয় করে প্রায় ৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। আর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আয় করে প্রায় ৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এভাবে দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও ভর্তি ফরম বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা আয় করে।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা পরীক্ষার্থী ইয়াসার সামিন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘কোন ইউনিটে, কোন সাবজেক্টে, কত মার্কস রাখতে হবে, কোন ভার্সিটির এক্সাম ডেট কবে, এপ্লাই করার এর ডেডলাইন কবে, কোনটার এডমিট কার্ড কোন ওয়েবসাইটে, এসব নিয়ে যে কতটা কষ্ট পেতে হয়েছে তা আর বলতে চাই না।’
তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, ঢাকা-চিটাগং-সিলেট এর টিকেটের জন্য লাইনে দাঁড়ানো, সকালে চিটাগং, দুপুরে ঢাকা রাতে চিটাগং, সিইউ’র ফিটনেসবিহীন শাটল ট্রেনে ঠেলাঠেলি করে থাকা। এমন অমানবিক জার্নির পর সকালেই আবার ঢাকার জ্যাম এড়িয়ে, কয়েক কিলোমিটার হেঁটে পরীক্ষার সিটটা খুঁজে বের করে পরীক্ষা দেওয়াটা বড় বিড়ম্বনার।
রাজশাহী থেকে পরীক্ষা দিতে আসা সারোয়ার মোর্শেদ সাতীলও সুর মেলালেন সামিনের সঙ্গে।
সাতীল চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, আসলে যাত্রাপথের ভোগান্তির কথা টেনে লাভ নেই কিন্তু পরীক্ষা দিতে গিয়ে যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের অব্যবস্থাপনা চোখে পড়ে সেগুলোতে বলতেই হবে।

দু’একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ টেনে সাতীল বলেন: এখানকার এলাকার খাবারের মান খুবই খারাপ, তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে শহর বা বাজার এতোটাই দূরে যে প্রয়োজনীয় কিছু কেনার দরকার হলে তা আর করা হবে না।
তাছাড়াও এলাকাগুলোতে ভালো মানের কোনো আবাসিক হোটেল নেই। তবে সাতীলের আশা বছর খানেক পরই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সঠিক তদারকির ভেতর ফিরবে।
ভর্তি পরীক্ষা এলেই ভোগান্তিতে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের। এ ভোগান্তির শেষ কোথায়? ভোগান্তি কিভাবে দূর করা যায় এ প্রসঙ্গে চ্যানেল আই অনলাইন কথা বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সঙ্গে।
ভোগান্তির ব্যাপারটা না এড়িয়ে আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন: বর্তমানে ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অনেকটা ভোগান্তি কমানো সম্ভব হয়েছে। আসলে যারা ঢাকার বাইরে থেকে এসে থাকার জায়গার অভাব হয় সেসব শিক্ষার্থীদের খানিকটা ভোগান্তি হয়।
ডিজিটালাইজেশনের কথা উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেন: আগে ঢাবিতে ভর্তিচ্ছু একজন শিক্ষার্থীকে ফর্ম কিনতে ঢাকা আসতে হতো, ফর্ম পূরণ করতে ঢাকা আসতে হতো। কিন্তু বর্তমানে অনলাইনে ফর্ম কেনা ও পূরণ করা যাচ্ছে। যাতে করে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি অনেকাংশে কমে গেছে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট ছাড়াও বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে গিয়ে যাতায়তের চরম ভোগান্তি পড়েছে শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক বলেন: শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস থাকা প্রয়োজন। আত্মবিশ্বাসী থাকলে স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা পরীক্ষা দেবে না। তবে অনিশ্চিয়তা আর উচ্চ শিক্ষার স্বার্থে তারা সব বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দেয়।
অনেক শিক্ষার্থীই অভিযোগ করেছেন যে শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি ফর্ম কিনতে একটা শিক্ষার্থীর পরিবারের ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়ে যাচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের এ অভিযোগের প্রসঙ্গে তিনি জানান, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা জানি না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে গত পাঁচ-দশ বছরের ভর্তি পরীক্ষার ফি বাড়ানো হয় নি।







