অসংখ্য সমস্যায় জর্জরিত বর্তমান বিশ্বে উগ্র জাতীয়তাবাদ, ডানপন্থী রাজনীতি ক্রমেই বিস্তার লাভ করছে। অনেকটা বিস্ময়করভাবেই ইউরোপসহ উন্নত দেশগুলোতে ডানপন্থী রাজনীতির বিকাশের সাথে জাত্যাভিমানও যেনো ফিরছে প্রবলভাবে। মূলধারার রাজনীতিও বাধ্য হচ্ছে ডানে ঝুঁকতে। বিদ্বেষমূলক, অভিবাসী বিরোধী, বর্ণবাদী ‘জনপ্রিয়’ প্রচারণার জোরে যেমন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইউরোপের ডানপন্থার ক্রমেই জনপ্রিয়তা লাভের অন্যতম প্রধান কারণ অভিবাসী বিরোধী মনোভাব। দেখা যায় শুধুমাত্র ২০১৫ সালেই ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কাছে সিরিয়ার মতো দেশগুলো থেকে ১.৩ মিলিয়ন জনগণ আশ্রয় নেয়। এছাড়াও রয়েছে অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব। বেকারত্বের মতো আর্থিক অস্থিতিশীলতার সুযোগে মাথাচাড়া দিচ্ছে গ্রিসের গোল্ডেন ডনের মতো দল, সংসদে যাদের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। ডেনমার্কের ড্যানিশ পিউপিলস পার্টিও গত বছরের নির্বাচনে ২১ শতাংশ আসন লাভ করে। আর অস্ট্রিয়ায় এ বছরের প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে তো অল্পের জন্য জয়ী হতে পারেনি ডানপন্থী ফ্রিডম পার্টি অব অস্ট্রিয়া (এফপিও)।
সমানভাবে সফল না হলেও ইউরোপের দেশগুলোতে ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে এই মতাদর্শের দলগুলো, যেমন ইতালির লিগা নর্ড, সুইস পিউপিল’স পার্টি, নিউ-নাজি পিউপলস পার্টি আওয়ার স্লোভাকিয়া, ইংলিশ ডিফেন্স লিগ, অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি।
অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা ও অভিবাসীদের জোয়ারের সঙ্গে এই ডানপন্থী রাজনীতির বিস্তারের পেছনে কাজ করছে বর্ণবিদ্বেষ, সংখ্যাগরিষ্ঠ স্থানীয়দের জন্য চাকরী সুরক্ষিত করা, জাত্যাভিমানের মতো বিষয়গুলো। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব কেন্টের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ম্যাথিউ গুডউইনের ব্যাখ্যায় পাওয়া যায়, দ্রুত জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের কারণে মূল্যবোধ, জাতীয় সংস্কৃতি এবং পরিচিতি হুমকির মুখে বলে মনে করছে ইউরোপের দেশগুলো। অভিবাসীদের জোয়ারের কারণেই ইউরোপের বাসিন্দাদের মনে এমন শঙ্কার জন্ম।
আবার সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের বিস্তারের কারণেও একধরণের আতঙ্ক কাজ করছে। যেমন ফ্রান্সের প্যারিস হামলার পর ২০১৫ সালের আঞ্চলিক নির্বাচনে ডানপন্থী ন্যাশনাল ফ্রন্ট ২৭ শতাংশ জনপ্রিয় ভোট লাভ করে। ১৯৭২ সালে দলটি গঠিত হওয়ার পর এতসংখ্যক জনসমর্থন পায়নি। আবার মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্বাচনী প্রচারণাতেও মুসলিমদের প্রবেশ সীমাবদ্ধ করার কথা শুনা যায়।
ইউরোপ ও আমেরিকার রাজনীতিতে এমন চরিত্রিক মিল পরিলক্ষিত হয়। ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়ার রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ক্যাস মাড যেমন ইউরোপের ডানপন্থী রাজনীতি ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক হাতিয়ায় হিসেবে দেখেন, ‘জাতীয়তাবাদ, কর্তৃত্ববাদ ও জনপ্রিয়তা’কে।
এ বিষয়টিতে বিশ্বনেতাদের উদ্যোগ নিতে বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে জাতীয়তাবাদের উত্থানকে ঠেকাতে বিশ্ব অর্থনীতির সংশোধনের কথা বলেন তিনি। গ্রিস সফরে গিয়ে বুধবার (১৬ নভেম্বর) ওবামা জনগণের উদ্বেগ প্রশমনে কাজ করতে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, `ভবিষ্যতের উপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর বোধ কাজ করলে জনগণ প্রতিক্রিয়া দেখাবে। যা আমরা গ্রিসে দেখেছি। গোটা ইউরোপে দেখেছি। যুক্তরাষ্ট্রে দেখেছি। ইউই থেকে বেরিয়ে আসতে ব্রিটেনকে ভোট দেওয়ার সময়ও দেখেছি।’
উন্নত বিশ্বের এমন চরিত্র ধারণের প্রভাব কেমন হবে? অবশ্যই এর একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসিন এমন অভিমত দিয়ে বলেন, `বিশ্ব ক্রমেই আল্ট্রা ন্যাশনালিজমের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাবতো অবশ্যই রয়েছে। অস্থিরতা সৃষ্টি হবে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনাগুলো বাড়বে। গণতন্ত্র বিঘ্নিত হবে।’








