১৮ ক্যারেট সোনায় গড়া ৩৭ সেন্টিমিটার উঁচু ও ছয় দশমিক এক কিলোগ্রাম ওজনের এক মোহনীয় ট্রফি। ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি নামের এই সোনার হরিণ জয়ের নেশায় বছরজুড়ে ব্যস্ততা, অধ্যবসায় ফুটবল দুনিয়ার। ২১১ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে শেষপর্যন্ত চূড়ান্ত লড়াইয়ে টিকে থাকে ৩২ দেশ। এক মাসের সেই আসল লড়াইয়ে শেষ হাসি যার, তার হাতেই ওঠে বিশ্বসেরা’র স্মারক, বিশ্বকাপ।
বিশ্বসেরার স্বীকৃতি, র্যাঙ্কিং’র এভারেস্টে অবস্থান, ফুটবল দুনিয়া শাসনের অলিখিত বিশেষণ, এটাই শেষ নয়। পেশাদার ফুটবলের এই স্বর্ণযুগে বিশ্বকাপ ট্রফির সাথে প্রাপ্ত অর্থ পুরস্কার হয়ে উঠেছে আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ। দেশবাসীর শ্রদ্ধা-ভালোবাসা, নিজেদের ফুটবল ফেডারেশনের লোভনীয় ইনসেনটিভ তো আছেই।
বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টের প্রাইজমানি বাবদ খোদ ফিফা ব্যয় করছে মিলিয়ন-মিলিয়ন ডলার। ২০১৪’র ব্রাজিল বিশ্বকাপে ৩২ দেশের জন্য প্রাইজমানি খাতে ফিফা খরচ করেছিল ৩৫৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। চার বছর পর রাশিয়া বিশ্বকাপে প্রাইজমানির অংক বেড়ে চারশো মিলিয়ন বা ৪০ কোটি ডলার, বৃদ্ধির হার ১২ শতাংশ।
চ্যাম্পিয়ন দলের জন্য প্রাইজমানির অংকটাও দিন দিন বাড়ছে। ২০১০’র বিশ্বকাপ জয়ী স্পেন দল ফিফার কাছ থেকে পায় ৩ কোটি ডলার। চারবছর পর ব্রাজিল বিশ্বকাপ মাত করা চ্যাম্পিয়ন জার্মানি’র প্রাপ্তি সাড়ে তিন কোটি। জার্মান ফুটবল ফেডারেশন ডিবিএফ বিশ্বকাপ জয়ী দলের প্রতি ফুটবলারকে বোনাস হিসাবে দিয়েছে চার লাখ আট হাজার ডলার। এবার বিশ্বকাপ ট্রফি জেতার পাশাপাশি চ্যাম্পিয়ন দলের জন্য ফিফা দিচ্ছে ৩ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার অর্থ পুরস্কারের হাতছানি।

২০১৮’র বিশ্বকাপ আয়োজনের সম্প্রচার স্বত্ব ও বিজ্ঞাপন থেকে ফিফার উপার্জনের টার্গেট পাঁচশো কোটি ডলার। এই বিশাল আয় থেকে বিশ্বকাপের অর্থ পুরস্কার এবং সদস্য রাষ্ট্রের জন্য বিভিন্ন প্রকল্পে উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ ও নিজেদের পরিচালন ব্যয় মেটায় ফিফা। মূলপর্বে খেলার স্বপ্ন সুদূর পরাহত হলেও বিশ্বকাপ আয়ের লভ্যাংশ থেকে আনুপাতিক হারের বরাদ্দ পেয়ে আসছে বাংলাদেশও। গত কয়েক আসরের মতো এবারো বিশ্বকাপের মূল আসরে অংশগ্রহণকারী ৩২টি দেশই পাবে কম-বেশি অর্থ পুরস্কার।
১৪ জুন ৩২ দলের গ্রুপ পর্বের ম্যাচ দিয়ে পর্দা উঠবে রাশিয়ায় বিশ্বকাপ ফুটবলের ২১তম আসরের। গ্রুপপর্বে অংশ নেয়া প্রতিটি দল মূল আসরে খেলার যোগ্যতা অর্জনের জন্য পাবে ৮০ লাখ ডলার। এছাড়া মূল আসরে খেলার প্রস্তুতির জন্য ৩২ দলের প্রতিটির জন্য বাড়তি বরাদ্দ ১৫ লাখ ডলার। আট গ্রুপের প্রতিটি’র সেরা দুই দল পাবে ‘রাউন্ড অফ সিক্সটিনে’র টিকিট। এই সাফল্যের জন্য ১৬ দলের প্রতিটির অ্যাকাউন্টে জমা হবে ১ কোটি ২০ লাখ ডলার। ২০১৪’র বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব উতরানো দল পিছু ফিফার বরাদ্দ ছিল ৯০ লাখ ডলার।
‘রাউন্ড অফ সিক্সটিনে’র ম্যাচের জয়ী আট দল খেলবে ‘কোয়ার্টার ফাইনাল’। ‘শেষ আটে’র টিকিটের পাশাপাশি কোয়ার্টার ফাইনালিস্ট প্রতিটি দলের প্রাপ্তি ১ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা গত আসরের চেয়ে ২০ লাখ ডলার বেশি। এরপর চার দলের সেমিফাইনাল। এই পর্বে অর্থ পুরস্কার দেয়া হবে সেমিফাইনাল ও ফাইনালের পারফরম্যান্সের উপর ভিত্তি করে।
সেমিফাইনালে হেরে যাওয়া দুই দল খেলবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে। তৃতীয়স্থান পাওয়া দলের জন্য ২ কোটি ৪০ লাখ ডলার এবং চতুর্থ হওয়া দলের জন্য ২ কোটি ২০ লাখ ডলার অর্থ পুরস্কার বরাদ্দ। ২০১৪’র আসরে তৃতীয় হওয়া নেদারল্যান্ডসের প্রাপ্তি ২ কোটি ২০ লাখ ডলার। ডাচদের কাছে হেরে চতুর্থ হওয়া ব্রাজিল পেয়েছিল ২ কোটি ডলার। এবারের আসরে তৃতীয় ও চতুর্থ, দুই দলের অর্থ পুরস্কারের পরিমাণ ২০ লাখ ডলার করে বাড়ছে।

সেমি’র জয়ী সেরা দুই দল ১৫ জুলাইয়ের ফাইনালে মুখোমুখি হবে। ট্রফি না পেলেও ফাইনালে হেরে রানার্সআপ হওয়া দলটি ভরা পকেটেই দেশে ফিরবে। গত আসরের রানার্সআপ আর্জেন্টিনা পেয়েছিল আড়াই কোটি ডলার, এবারের রানার্সআপ পাবে ২ কোটি ৮০ লাখ। ফাইনালের অর্থ পুরস্কারের কথা তা আগেই লিখেছি।
গ্রুপপর্ব থেকে ফাইনাল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সাফল্যের জন্য আলাদা আলাদা অংকের অর্থ পুরস্কার থাকায় সবমিলিয়ে সফলতম দলটির মোট প্রাপ্তি নেহায়েত কম নয়। এর বাইরে বিশ্বকাপের ম্যাচে ইনজুরিতে পড়া ফুটবলারদের জন্য বীমা ঝুঁকি সুরক্ষার জন্য থাকছে মোটা অংকের অর্থ। এই হিসাবের বাইরে থাকবে বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন বা রানার্সআপ দলের জন্য নিজ দেশের সরকার বা ফেডারেশনের বোনাস বা অর্থ-পুরস্কারের ঘোষণা।
সবমিলিয়ে পেশাদারি ফুটবলের এই বাড়বাড়ন্ত সময়ে বিশ্বকাপে দলকে সাফল্য এনে দিয়ে ফুটবলারের সামনে রয়েছে মিলিওনিয়ার হওয়ার সুযোগ। বিলিয়ন ডলার প্লেয়ার ট্রান্সফারের যুগে এই প্রাপ্তির অংকটা যে খুব শিগগিরই বিলিয়ন ডলারে পৌঁছুবে তার ভবিষ্যৎবাণী করতে বড়মাপের ফুটবলবোদ্ধা হওয়ার প্রয়োজন নেই।








