“নেপাল কি আফগানিস্তানের পথেই যাচ্ছে?” বহু বছর আগে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো টাইমস অব ইন্ডিয়ার এই প্রতিবেদক কেশাব প্রধানকে এমনই একটি প্রশ্ন করেছিলেন। সেই সময়কার হিন্দু রাজ্যটি জর্জরিত ছিলো মাওবাদিদের দ্বারা সংগঠিত জনযুদ্ধে, যার ফলে ১৬ হাজারেরও বেশি নিহত হয়েছিলো।
নেপালের নতুন সংবিধান নিয়ে সৃষ্ট উত্তাল পরিস্থিতিতে ভুট্টোর সেই পর্যবেক্ষণটি অনেকটাই সত্য প্রমাণিত হচ্ছে। নতুন এই সংবিধানের মূলনীতি ফেডারেল পদ্ধতি, ধর্মনিরপেক্ষতা, সংসদীয় গণতন্ত্র এবং প্রজাতন্ত্র। রাজতন্ত্রের অবসানের পর প্রায় নয় বছর স্থায়ী কোনো সংবিধান না থাকার প্রেক্ষিতে নেপাল আফগানিস্তানের মতোই তিক্ত জাতিগত বিভক্তির সম্মুখিন।
জাতিগতভাবে বিভক্ত দলগুলো তাদের স্বায়ত্তশাসনের প্রভাব বলয় আরও বৃদ্ধি করার জন্য যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। এদের মধ্যে মাধেশী ( মাইথিলি, ভোজপুরি, আভাধি, হিন্দি এবং উর্দু ভাষি জনগণ) এবং থারু (বিহারের সাথে সিমান্ত অঞ্চল টেরাই’য়ে বসবাসকারী) এবং ইউপি। পাহাড়ি এলাকায় লিম্বু, খাম্বু, মাগার, গুরুং এবং তামাং’রাও (মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত নেপালি) একই রকম বিক্ষুদ্ধ রয়েছে। পাহাড়ি এলাকার খাসা নামে পরিচিত আরিয়ান বংশোদ্ভূত নেপালিরা বংশ পরিক্রমায় নেপাল, ভারত এবং ব্রিটিশ আর্মিতে যোগদান করে আসছে।
নেপালিদের মধ্যে বিক্ষুদ্ধ পক্ষগুলোর মধ্যে বিশেষ করে বাহুন-খাসা এবং কিছু মাধেশী দল হিন্দু রাষ্ট্রের জন্য আন্দোলন করছে। কিন্তু মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত নেপালিরা যারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বি অথবা প্রকৃতিপূজার অনুসারি তারা এই দাবির বিরোধীতা করে আসছে।
ভারতের সাথে সামাজিক-অর্থনৈতিক সম্পর্ক “রোটি-বেটি কা রিশতা” তৈরির গৌরবের ধারক মাধেশীরা বৈষম্যের শিকার। তাদের আনুগত্যের প্রতি সন্দিহান নেপালের সাবেক শাসক অভিজাত এবং পাহাড়ি নেপালিদের পক্ষগুলো মাধেশীদের প্রতি অবিচার করে আসছিলো।
মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত নেপালিরা শত শত বছর ধরে প্রান্তিক জনগোষ্ঠি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। প্রধানত অভিজাত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী বাহুন এবং কাশত্রিয়া গোত্রের অধিকাংশই আবার দরিদ্র। শ্রমিক শ্রেণির সাথে সম্পর্কযুক্ত থারু সম্প্রদায় সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার।
নেপালের জনগোষ্ঠির ৩০ শতাংশ মাধেশীরা তাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। দেশটির বেশিরভাগ শিল্পাঞ্চলে বসবাসরত এই গোষ্ঠি প্রথম ১৯৯০ সালে রাজা বীরেন্দ্রর সাথে তাদের অধিকার বিষয়ে আলোচনা করে। যখন রাজা বীরেন্দ্র নেপালের কংগ্রেস এং ইউনাইটেড বাম ফ্রন্টের আন্দোলনে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করছিলেন।
প্রতিটি জাতিগত দলের জন্য স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে প্রধান করে মাওবাদীদের ১০ বছর ব্যাপি চলা ‘জনযুদ্ধ’ এর ফলে মাধেশীদের আন্দোলন আরও ত্বরান্বিত হয়। মাধেশীদের আন্দোলনকে পরে গণ আন্দোলনে রূপ দেন সাবেক মাওবাদি নেতা উপেন্দ্র যাদব। প্রথম গণপরিসদ নির্বাচনে ভালো করলেও দুর্নীতি ও সামর্য্দহিনতার কারণে গত বছর অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় নির্বাচনে করুণ পরিনতি বরণ করে নিতে হয় মাধেশী দলের।
সংবিধান প্রণয়নের প্রক্রিয়া শেষ ধাপে আসার সময় সংসদে দলে ভারী মাধেশী দল আন্দোলনে রাস্তায় নেমে আসে। মাধেশীদের প্রতিনিধিরা কয়েক সপ্তাহ ধরে সংসদ বর্জন করে আসলেও ৮৫ শতাংশের সমর্থনের ভিত্তিতে সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখ নতুন সংবিধান গৃহিত হয়।
নেপালের এই সন্ধিক্ষণে ভারত দুটি পথ অনুসরণ করছে। প্রথমত কয়েকজন বিজেপি নেতা বলেছেন, তারা নেপালকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়। পরে এনডিএ সরকার মাধেশীদের পক্ষ হয়ে নেপালের সাথে মধ্যস্থতা করা শুরু করে। যা নেপালের নেতারা ‘বহির্দেশের হস্তক্ষেপ’ হিসেবে দেখছে। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব এস জয়শঙ্করের নেপালের নেতাদের সাথে শেষ সময়ের বৈঠকটিও কোনো ফল এনে দিতে ব্যর্থ হয়।
এর ফলে নেপাল মাধেশী আন্দোলনকারীদের দ্বারা অনির্দিষ্টকালের জন্য অর্থনৈতিক অবরোধের মধ্যে পরেছে। ১৯৮৯ সালেও ভারতের সাথে নেপালের যোগাযোগের আনুষ্ঠানিক ২২টি পথের মধে ২০ টি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো। তবে নেপালিদের মধ্যে এখন ভারতবিরোধীতা আরও প্রকট। পূর্ববর্তী অবরোধটি ছিলো একজন শাসকের বিরুদ্ধে কিন্তু এখন নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্বে তাদের একটি নির্বাচিত সরকার রয়েছে যা কাঠমুন্ডুতে “ভারতের সমর্থনের ভিত্তি” বলে পরিচিত।
অন্যান্য সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে নেপাল ভারতের নিকটতম প্রতিবেশি। এ দুই দেশ সাধারণ ভুকাঠামো, ইতিহাস, ধর্ম, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য ধারণ করে বলে তাদের ভাগ্যও পরস্পরের সাথে অনেকটাই সম্পর্কযুক্ত। নেপালে কোনো উত্তপ্ত পরিস্থিতি কাঠমুন্ডু এবং দিল্লিকেও সমভাবে আঘাত করতে পারে।
কাঠমুন্ডুর আবেদন সত্ত্বেও নেপালের কেবল অপারেটররা ভারতের চ্যানেল সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছে। এর জবাবে মাধেশী আন্দোলনকারীরা টেরাই অঞ্চলের বারা এবং পার্সা জেলায় নেপালি চ্যানেল বন্ধ করে দিয়েছে।
পাহাড়ি এলাকার নেপালিরা বলছে, ভারতের সমর্থন ছাড়া মাধেশীরা সীমান্ত বন্ধ করতে পারে না। এর ফলে পাহাড়ি নেপালি এবং ভারত সম্পর্কিত বিষয়গুলোর মধ্যে আবারও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে একসময় ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করা মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত নেপালি এবং থারু সম্প্রদায়ের লোকেরা মাধেশীদের থেকে দুরে সরে এসেছে।
ভারতের চাপে নতিস্বীকার না করলেও নেপালের রাজনীতিবিদ এবং গণমাধ্যম ভারতের সাথে তাদের অঘোষিত দ্বন্দ্বে চীনের সমর্থনকে স্বাগত জানিয়েছে। যদিও সামান্য কিছু সংযত আচরণ ভারত এবং নেপালের মধ্যে যুদ্ধ শুরু থামাতে পারে যার ফলে দুদেশই ক্ষতিগ্রস্থ হবে।
(সূত্র : টাইমস অব ইন্ডিয়াতে প্রকাশিত কেশাব প্রধান এর প্রতিবেদন থেকে অনূদিত)







