বাংলাদেশ যেখানে সারা বিশ্বের কাছে বিনিয়োগ চাইছে সেখানে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ চাইছে সরকারের কাছে। ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম বাংলাদেশ নামক একটি সংগঠন ব্র্যাক ইনে আয়োজিত আলোচনা সভায় সবার জন্য উন্মুক্ত না হলেও সক্ষম উদ্যোক্তাদের বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ দিতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন উপস্থিত অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। তারা বলেছেন, সরকার শর্ত সাপেক্ষে যাচাই-বাছাই করে নির্দিষ্ট সীমার বিনিয়োগ সুযোগ দিলেও উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি দেশও উপকৃত হবে। এ সুযোগ দেওয়া হলে অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা সৃষ্টির পাশাপাশি মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া সহজ হবে। তাদের অন্যান্য যুক্তির মধ্যে রয়েছে সক্ষম উদ্যোগক্তাদের ছোট অর্থনীতির মধ্যে আটকে রাখা উচিৎ নয়; ৩২ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ নিয়ে বসে থাকলে তা দেশের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে; মুদ্রা পাচার রোধ হবে; ইত্যাদি।
সক্ষম উদ্যোগক্তা বলতে আলোচকেরা ঠিক কি বুঝিয়েছেন কাগজের খবর পড়ে তা বোঝা যায়নি। সক্ষম বা অক্ষম নির্নয় করা সহজ ব্যাপার নয়। এ জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করে তা যথার্থভাবে প্রয়োগ করা অত্যন্ত কঠিন কাজ হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারী কর্মকর্তাদের নিজস্ব বিচারবুদ্ধির প্রয়োগ করা দরকার হবে। আর তা করতে গেলে একদিকে যেমন স্বজন প্রীতির, দূর্নীতির সুযোগ বাড়বে তেমনি অন্যদিকে কালোটাকা বিদেশে পাচারের বৈধ হাইওয়ে সৃষ্টি হবে। অক্ষম ব্যাক্তিরাও এই সুযোগ নিয়ে দেশের টাকা বিদেশে পাঠিয়ে সর্বস্ব হারিয়ে আসবেন।
সভায় এফবিসিসিআই সভাপতি বলেছেন, “সক্ষম উদ্যোগক্তাদের ছোট অর্থনীতির মধ্যে আটকে রাখলে দেশেরই ক্ষতি হবে”। বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে ছোট হলেও তা ক্রমবর্ধমান এবং এর রয়েছে ১৬ কোটি নাগরিক। ২০৫০ সাল নাগাদ দেশটি ২৩তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্ব বিখ্যাত পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান, প্রাইস ওয়াটারহাউস কুপার্স (পিডব্লিউসি)। সক্ষম উদ্যোগক্তাগণ নিজেদের সঞ্চিত অর্থ ছোট অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করতে থাকলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে; নতুন নতুন প্রযুক্তি চেনা হবে, শেখা হবে, রপ্ত হবে, উদ্ভাবন হবে; কৃষি, শিল্প ও সেবার উৎপাদন বাড়বে; অর্থনীতি ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠবে। উল্টো পথে চললে অর্থাৎ ছোট অর্থনীতির দেশের পোশাক শিল্পের রক্ত ঝড়ানো শ্রমিকদের আর মধ্যপ্রাচ্যে নির্যাতন সওয়া, গতর খাটা মানুষদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে বিনিয়োগ করলে ছোট অর্থনীতির দেশ দিনে দিনে আরও ছোট হয়ে যাবে।
বিদেশে বিনিয়োগ করতে দিলে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা কিভাবে সৃষ্টি হবে তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। বক্তারা এ কথার মাধ্যমে কালোটাকা এবং অবৈধ পথে বিদেশে অর্থ পাচারের বিষয়গুলো নির্দেশ করে থাকতে পারেন। দেশের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা যথাঃ রেজিষ্টারার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ, সিকিউরিটিজ এণ্ড একচেঞ্জ কমিশন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, কর কর্তৃপক্ষ, দুর্নীতি দমন কমিশন, ইত্যাদি যথেষ্ট শক্তিশালী নয় বলে দেশে প্রচুর কালোটাকার উদ্ভব হচ্ছে। আমদানী-রফতানীর মাধ্যমেও দেশের অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। দেশের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কালোটাকাওয়ালাদের স্বস্তি দিচ্ছে না। অনেকে অনিশ্চয়তার কারণে রপ্তানি আয়ের একটা বড় অংশ বিদেশেই রেখে দিচ্ছে। বিদেশে বৈধ পথে টাকা পাঠানোর সুযোগ করে দিলে এই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে এমন ভাবার কোন কারণ নেই। এই সমস্যার সমাধান রয়েছে দেশের ভেতরে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে হবে যাতে কালোটাকার সৃষ্টি না হয় এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে হবে যাতে বিদেশে নয়, দেশে বিনিয়োগ করে বিনিয়োগকারী নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন।
বিদেশে বৈধ পথে বিনিয়োগের সুযোগ করে দিলে কালোটাকা নির্বিঘ্নে বিদেশে চলে যাবে। এতে কালোটাকার কারবারীদের টাকা পাচারের খরচ এবং ঝুঁকি কমবে। তারা ব্যাক্তিগতভাবে লাভবান হবেন। দেশের কি লাভ হবে? দেশের লাভ হতে পারে যদি কালোটাকা বিদেশে প্রেরণের সময় কর নির্ধারন করা হয়। করারোপ করে বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচারের সুযোগ করে দিয়ে সামান্য পরিমাণ টাকা কর হিসেবে আদায় করার মানে হয় না। আর তা করা হলে পাচারকারীদের পাচার খরচ বেড়ে যাবে। তারা বৈধ পথে টাকা পাচার করতে নিরুৎসাহিত হবেন; অবৈধ পথেই টাকা পাচার চালাতে থাকবেন।
বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে দেখা যায় বাংলাদেশের চেয়ে বেশী পরিমাণ লাভ করা যায় সামান্য কিছু অনুন্নত দেশে। উন্নত দেশে ব্যবসায়ে প্রতিযোগিতা বেশী থাকে বলে সেখানে মুনাফা বেশী করার সুযোগ কম থাকে। বাংলাদেশ এখনো এতটা সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি যে উন্নত দেশের প্রতিযোগীদের তাদের নিজেদের দেশের মাটিতে হারিয়ে দিয়ে বেশী পরিমাণ লাভ করতে পারবে। উন্নত দেশে না হলেও অনুন্নত দেশে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সে সুযোগ আছে যেমন পোশাক শিল্প। পোশাক শিল্পে বাংলাদেশ প্রযুক্তিগত ভাবে নয় বরং সস্তা শ্রমের সঙ্গে কিছু ব্যবস্থাপনা দক্ষতা যোগ করে বাংলাদেশ মুনাফা অর্জন করছে। এই দক্ষতা যদি আরেকটি সস্তা শ্রমের দেশে নিয়োগ করা যায় এবং সেখানকার আইনি এবং ভৌত অবকাঠামো যথার্থ থাকে তবে সেখানে বিনিয়োগ করে বাংলাদেশ ভাল লাভ করতে পারবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আফ্রিকায় অনেক দেশে রয়েছে যেখানে গিয়ে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করলে সস্তা শ্রমের কারণে ভাল লাভ করতে পারবে। আফ্রিকার শ্রম সস্তা হলেও অবকাঠামো যথার্থ নয়। অবকাঠামো যেখানে ভাল সেখানে গিয়ে ইতোমধ্যে উন্নত দেশের বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করে বসে আছে। নতুন বিনিয়োগ করে তাদের সঙ্গে পেরে ওঠা কঠিন। দেশে উৎপাদিত পণ্য বিদেশে বিপণনের জন্য যে বিনিয়োগের দরকার হয় সে বিনিয়োগের সুযোগ সরকার ইতোমধ্যেই দিয়েছে।
বিদেশে বিনিয়োগ করা হলে একটা লাভ হওয়ার সুযোগ আছে। সেটা হলো – বিদেশে প্রেরিত অর্থের বিনিয়োগের উপর যে লাভ হবে তা দেশে ফিরিয়ে আনা যাবে। এতে জাতীয় আয় বৃদ্ধি পাবে। জাতীয় আয় বৃদ্ধি পেলেও সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন তাতে হবে না। বড় বড় ব্যবসায়ীদের পকেট আরও ভারী হবে মাত্র। অন্যদিকে বিদেশে অর্জিত মুনাফা দেশে ফিরিয়ে আনা সহজ নয়। বিভিন্ন আইন-কানুন এবং দুর্নীতির বেড়াজাল ভেদ করে সামান্য কিছু লভ্যাংশ ফেরত আনা সম্ভব হতে পারে। বিনিয়োগ যেহেতু অন্য দেশে হবে সেদেশের আইন-কানুন অনুযায়ী লভ্যাংশ নির্ধারন হবে। আইনের প্রয়োগ বিনিয়োগকৃত দেশে কতটা সফল ভাবে হয় তার উপর নির্ভর করবে লভ্যাংশ নির্ধারন। আইনের প্রয়োগ দূর্বল হলে কর ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা থেকে লভ্যাংশ কম দেখানোর প্রবণতা বেড়ে যায়। লভ্যাংশ সঠিক ভাবে নির্ধারন হলেও সঠিক পরিমাণ লভ্যাংশ ফেরত আসল কি-না তা নিশ্চিত করার উপায় থাকবে না। সঠিক পরিমাণ লভ্যাংশ ফেরত আসলেই বা কি? দেশে মুনাফার চেয়ে বেশী দরকার কর্মসংস্থান; উৎপাদন; অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। প্রবৃদ্ধি হলে আরও বেশী বিনিয়োগ হবে; আরও বেশী কর্মসংস্থান ও উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বিদেশে বিনিয়োগ করা তখনই সঠিক হবে যখন দেশে বিনিয়োগের সুযোগ থাকে না। বর্তমান বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ অপরিসীম। বিদেশীরা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার নিয়ে অপেক্ষায় আছে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার সঠিক সময়টির জন্য। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটা স্থায়ী সমাধানের আভাস দেখা যাচ্ছে। স্বাধীনতা বিরোধী পাকিস্তান পন্থী রাজনীতি দেশ থেকে চিরবিদায় নিচ্ছে। স্বাধীনতা বিরোধী চক্র এবং সেই সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদীরা মাঠে না থাকলে আগামী দিনের রাজনীতি অনেক গঠনমূলক হবে; অনিশ্চয়তা, সহিংসতা বহুলাংশে কমে যাবে। সে রকম পরিস্থিতির আভাস পেয়েই চিন, জাপান এবং ভারত বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের জন্য আলাদা আলাদা অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করা হচ্ছে। সরকারী এবং বেসরকারী খাত থেকে চীনারা ৩৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাব স্বাক্ষর করে গেছে। এই বিনিয়োগের বাস্তবায়ন শুরু হলে দেশের সামগ্রি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







