চ্যানেল আই অনলাইন
English
  • সর্বশেষ
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • রাজনীতি
  • খেলাধুলা
  • বিনোদন
  • অপরাধ
  • অর্থনীতি
  • আদালত
  • ভিডিও
  • জনপদ
  • প্রবাস সংবাদ
  • চ্যানেল আই টিভি
  • নির্বাচন ২০২৬
No Result
View All Result
চ্যানেল আই অনলাইন
En

বিতর্ক পেড়িয়ে: রাধারমণ দত্ত ও তাঁর গান

রাধামাধব মণ্ডলরাধামাধব মণ্ডল
৩:০৯ অপরাহ্ন ১৭, জুলাই ২০২০
বিনোদন
A A

‘শ্যামের বাঁশিরে ঘরের বাহির করলে আমারে
যে যন্ত্রণা বনে যাওয়া গৃহে থাকা না লয় মনে॥’

‘কলঙ্কিনী রাধা’ গানটি আজ বেশ জনপ্রিয়। আমজনতার মুখে মুখে ফেরে এ গান। বলিউড তারকা আনুশকা শর্মার প্রযোজনায় সম্প্রতি অনলাইন স্ট্রিমিং সার্ভিস নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে ‘বুলবুল’ সিনেমায় একটি জনপ্রিয় বাংলা লোকগীতি হিসেবে। তার ব্যবহার নিয়ে ভারতে বির্তকের ঝড়। ‘বুলবুল’ নামে ওই ছবিতে যে প্রাচীন বাংলা গানটি নিয়ে এই বিতর্ক, সেটি হল ‘কলঙ্কিনী রাধা’। এই গানটির স্রষ্ঠা রাধারমণ দত্ত!

বিতর্ক ওই গানে হিন্দুদের ভগবান কৃষ্ণকে যেভাবে ‘কানু হারামজাদা’ এবং তাঁর লীলাসঙ্গিনী রাধাকে ‘কলঙ্কিনী’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে, সেটাকে বিশেষত উত্তর ভারতে অনেকেই হিন্দুত্বের ওপর আক্রমণ হিসেবেই দেখেছে। তবে পশ্চিমবঙ্গে তেমন কোনো হেলদোল নেই। এই আক্রমণ, সমালোচনার মুখে নেটফ্লিক্স ওই মুভির হিন্দি সাবটাইটেলেও কৃষ্ণের বর্ণনায় ‘হারামজাদা’ শব্দটি পাল্টে ‘নটখট’ (দুষ্টু) শব্দটি ব্যবহার করেছে শেষ পর্যন্ত। অপরদিকে আনুশকা শর্মা নিজে বা তার এই ছবির নির্মাতা সংস্থা এই বিতর্ক নিয়ে এখনও তেমন করে মুখ খোলেননি। সে কারণে তার জেরে নেটফ্লিক্স বয়কট করারও ডাক উঠেছে, জোড় কদমে। এই গান নিয়ে ছবিটির প্রযোজক আনুশকা শর্মাকেও ভীষণভাবে ট্রোলড হতে হচ্ছে।

নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া ‘বুলবুল’ ছবির একটি দৃশ্য

নেটফ্লিক্সের প্ল্যাটফর্মে বুলবুল রিলিজ করেছিল গত ২৪ জুন। আর তার পর থেকেই ‘কলঙ্কিনী রাধা’ নিয়ে শুরু হয়ে যায় তুমুল হইচই। তর্কবিতর্কের ঝড় ওঠে বিভিন্ন মহলে। গায়ক সাত্যকি ব্যানার্জি বলেন, এই প্রচলিত লোকগানটি বাউলরাই বেশি গেয়ে থাকেন। ফকিরদের মধ্যে এটি গাওয়ার প্রচলন কম। আর বাউলরা তো তাদের ঘরের লোক, প্রিয় রাধাকৃষ্ণকে আদর করে কত নামেই না ডাকেন। বাউলদের গানে কৃষ্ণকে ননীচোর, লম্পট আরও কত কিছুই তো বলা হয়ে থাকে। ‘ননীচোরা কৃষ্ণ’, ‘লম্পট বনমালী’ গানে এমন অনেক কিছুই বলার রীতি রয়েছে। সেই ভাবের জায়গাটিকে কাদা করা হচ্ছে।
এই বিতর্কের মধ্যেই তেলুগু ভাষায় নেটফ্লিক্সের আর একটি রিলিজ ‘কৃষ্ণ অ্যান্ড হিজ লীলা’ (কৃষ্ণ ও তার লীলা) নেটফ্লিক্সের জন্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে কৃষ্ণভক্তরা। বর্তমানে ওই প্ল্যাটফর্ম বয়কট করার দাবি আরও জোরালো হচ্ছে!

কৃষ্ণকে নিয়ে রাধারমণের একাধিক জনপ্রিয় গান আজ মানুষের মুখে মুখে ঘোরে। তিনি কৃষ্ণের সাধক ছিলেন। সাধন-ভজনের মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর বৈরাগ্য জীবন। জীবনের প্রতি অনন্ত জিজ্ঞাসা তাঁকে গৃহত্যাগ করতে উদ্ধুদ্ধ করে। তিনি বৈষ্ণব সাধক সমাজের একজন, প্রকৃত সাধক। পরে নিজের আপ্তবাক্যের সাধনার তত্ত্বে, স্থায়ী চাষবাস করতে শুরু করেন মানবজমিনের উপর!

ভাটি বাংলার মায়াপ্রকৃতির লালিমা মাখা অন্যতম জেলা সুনামগঞ্জ। খাল-বিল, নদ-নদী, পাহাড়-টিলা অধ্যুষিত মনোরম মায়া প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের এক লীলাভূমি সুনামগঞ্জ। সেই সুনামগঞ্জের মাটিতে যুগ যুগ ধরে বহু মরমি কবি, বাউল, সাধক, গীতিকার, সুরকার, শিল্পী, আধ্যাত্মিক সাধক ব্যক্তিদের জন্ম হয়ে আসছে। দেওয়ান হাছন রাজা, বাউল সম্রাট শাহ্ আবদুল করিম, দুর্বিন শাহ, সৈয়দ শাহনুর, আছিম শাহ, কালা শাহ, আরকুম শাহ, শীতালং শাহ, ছাবাল শাহ, এলাহী বক্স মুন্সী, শাহ আছদ আলী, পীর মজির উদ্দিন, আফজল শাহ, কামালউদ্দীন, একলিমুর রাজা চৌধুরী, গণিউর রাজা চৌধুরী, দীননাথ বাউল, গিয়াসউদ্দীন আহমদ, মকদ্দস আলম উদাসীর মতো মানুষরাও এই জেলায় জন্মছেন।

Reneta

এই মাটির গুণেই তাঁদের দীর্ঘ সাধনার সৃষ্টিতে জারি, সারি, ভাটিয়ালি, ঘেঁটুগান, গাজীর গান, মালজোড়া বা কবিগান, কীর্তন, নগরকীর্তন, টহল, ধামাইল গানগুলো বৃহত্তর সিলেট, আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়সহ ভারতের দুই বঙ্গের বহু জেলার অনেক অঞ্চলকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি আমাদের বাংলা লোকগানের ভাণ্ডারকে করেছে আরও ঋদ্ধ এবং সমৃদ্ধ। তখনকার এই সাধকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামের খ্যাতির আড়ালে থাকা একজন জগৎবিখ্যাত গীতিকবি, সাধক রাধারমণ দত্ত।

রাধারমণ দত্তকে অনেক সোনালি অভিধায় অভিহিত করা যায়। তিনি একাধারে ছিলেন মরমি কবি, বৈষ্ণব সহজিয়া ঘরানার আখড়াধারী সাধক, ধামাইল গানের জনক কিংবা লোকায়ত বাংলার মহান কণ্ঠস্বরে গাওয়া টহলশিল্পী। জীবনের বড় একটা অংশ যিনি কাটিয়ে দিয়েছেন অনন্ত অসীমের সন্ধানে, তেমনি প্রেম, বিরহ, বিচ্ছেদ, মায়া, কায়ার দেহতত্ত্ব, ভজন, ভক্তি, ভাবের রাধাকৃষ্ণের আকুলতা নিয়ে বেঁধেছেন প্রেম ও আত্মনিবেদনের অজস্র গান। নিজে সে সব গান কখনো না লিখলেও তাঁর ভাবের ভক্তরা গুরুমুখে শোনার সাথে সাথেই পুঁথিবদ্ধ করে ফেলতেন সেই অমূল্য গীত। এভাবে তিনি সৃষ্টি করে গেছেন তিন সহস্রাধিক গান। যা তাঁকে একজন কিংবদন্তী অমর গীতিকবি আর সুরসাধকের আসনে নিয়ে গিয়ে বসিয়েছে। আজ মনে মনে তাঁর গান বাজে!

রাধারমণের প্রতিকৃতি

জন্মসূত্রে রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থ, (১৮৩৩ – ১৯১৫) একজন বাংলা সাহিত্যিক, সাধক কবি, বৈঞ্চব বাউল, ধামালি নৃত্য-এর প্রবর্তক। সংগীতানুরাগীদের কাছে তিনি রাধারমণ বলেই সমাধিক পরিচিত। বাংলা লোকসংগীতের পুরোধা লোককবি রাধারমণ দত্ত। তাঁর রচিত ধামাইল গান সিলেট এবং ভারতের বাঙালীদের কাছে পরম আদরের ধন। রাধারমণ নিজের মেধা আর দর্শনকে কাজে লাগিয়ে মানুষের মনে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। কৃষ্ণ বিরহের আকূতি আর না-পাওয়ার ব্যথা কিংবা সব পেয়েও না-পাওয়ার কষ্ট তাঁকে সাধকে পরিণত করেছে। তিনি দেহতত্ত্ব, সাধনতত্ত্ব, ভক্তিমূলক, অনুরাগ তত্ত্ব , প্রেম তত্ত্ব , ভজন, টহল, ধামাইলসহ নানা ধরনের কয়েক হাজার গান নিয়ে করেছেন আপনসাধনার কাজ। সুর সেধেছেন, পড়শি মাটির জানালায়!

রাধারমণ দত্তের ১০০তম মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে ডাকটিকেট চালু হয়েছে বাংলাদেশে। এটাও কম বড়ো পাওনা নয়।

শ্রীহট্ট বা সিলেট অঞ্চলের পঞ্চখণ্ডে ত্রিপুরাধিপতি ‘ধর্ম ফাঁ’ কর্তৃক সপ্তম শতকে মিথিলা হতে আনা হয়েছিল প্রসিদ্ধ পাঁচ ব্রাহ্মণের মধ্যে ‘আনন্দ শাস্ত্রী’ নামক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব রাধারমণ দত্তের পূর্ব পুরুষ ছিলেন বলে অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধির ঐতিহাসিক গ্রন্থ, শ্রীহট্টের ইতিবৃত্তে এই তথ্য পাওয়া যায়। আনন্দ শাস্ত্রীর প্রৌপুত্র নিধিপতি শাস্ত্রীর পুত্র ভানু নারায়ণ নামক ব্যক্তি তৎকালীন মণুকুল প্রদেশে ‘ইটা’ নামক রাজ্য স্থাপন করেন। ভানু নারায়ণের চার পুত্রের মধ্যে রামচন্দ্র নারায়ণ বা ব্রহ্ম নারায়ণের এক পুত্র ছিলেন প্রভাকর। মুঘল সেনাপতি খোয়াজ উসমান দ্বারা ইটা রাজ্য অধিকৃত হলে, এই রাজ বংশের লোকগণ পালিয়ে গিয়ে আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নেয়। সেই সময় প্রভাকর দত্ত তাঁর পিতার সঙ্গে আলিসারকুল চলে যান এবং সেখানে কিছু দিন বসবাস করার পর জগন্নাথপুর রাজ্যে এসে শেষে আশ্রয় নেন। কিছু দিন পর জগন্নাথপুর রাজ্যের তৎকালীন অধিপতি রাজা বিজয় সিংহের অনুমতিক্রমে প্রভাকর জগন্নাথপুরের নিকটস্থ কেশবপুর গ্রামে বাড়ি নির্মাণ করে সেখানে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে রাজা বিজয় সিংহ প্রভাকরের পুত্র শম্ভুদাস দত্তকে মন্ত্রী পদে নিয়োগ করেন। জানা যায় বানিয়াচংয়ের রাজা গোবিন্দ খাঁ বা হাবিব খাঁ-র সঙ্গে বিবাদে জগন্নাথপুর রাজ বংশের বিপর্য্যয়ের কারণ! রাজ আশ্রিত কর্মচারীরা সে সময় দৈন্য দশায় পরেছিল। এই সময় শম্ভুদাস দত্তের পুত্র রাধামাধব দত্ত অন্যের দ্বারস্থ না হয়ে, অনন্যচিত্তে সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন এবং নিজের নিজেকে আবদ্ধ করেন সাধনায়। রাধামাধব দত্ত সংস্কৃত ভাষায় জয়দেবের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘গীত গোবিন্দম’ বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। এছাড়াও তাঁর রচিত ভ্রমর গীতিকা, ভারত সাবিত্রী, সূর্যব্রত পাঁচালি, পদ্ম-পুরাণ, কৃষ্ণলীলা গীতিকাব্য উল্লেখযোগ্য। কবি রাধামাধব দত্তই ছিলেন রাধারমণ দত্তের পিতা।

কবি রাধারমণের পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় উপাসনার প্রধান অবলম্বন সংগীতের সঙ্গে। তাঁর প্রথম পরিচয় ছিল শৈশব থেকেই সংগীত। পিতার সংগীত, সাহিত্য, সাধনা তাঁকেও প্রভাবিত করেছিল। ১২৫০ বঙ্গাব্দে রাধারমণ পিতৃহারা হন এবং মা সুবর্ণা দেবীর কাছে বড় হতে থাকেন তিনি। ১২৭৫ বঙ্গাব্দে মৌলভীবাজারের আদপাশা গ্রামে শ্রী চৈতন্যদেবের অন্যতম পার্ষদ সেন শিবানন্দ বংশীয় নন্দকুমার সেন অধিকারীর কন্যা গুণময়ী দেবীকে বিয়ে করেন তিনি। পিতার রচিত গ্রন্থ গুলো সে সময় তাঁর কাছে মনের অন্দরে স্থান করে নেয়। কালক্রমে তিনি একজন স্বভাবকবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর রচিত ধামাইল গান সমবেত নারীকন্ঠে বিয়ের অনুষ্ঠানে গীত হয়। বিশেষত সিলেট, কাছাড়, ত্রিপুরা ও ময়মসিংহ অঞ্চলে একসময় এর প্রচলন খুব বেশি ছিল। রাধারমণ দত্ত একাধারে গীতিকার, সুরকার, এবং নিজেও সংগীতের শিল্পী ছিলেন। সাধক রাধারমণ দত্ত, মরমি কবি হাছন রাজার মধ্যে যোগাযোগ ছিল সুনিবিড়। অন্তরের মিল ছিল খুব বেশি। তাঁদের মধ্য বিভিন্ন সময় পত্রালাপ হতো কবিতায়। একবার হাছন রাজা রাধারমণের কুশল জানতে গানের চরণ বাঁধেন: রাধারমণ তুমি কেমন, হাছন রাজা দেখতে চায়। উত্তরে রাধারমণ লিখেন- কুশল তুমি আছো কেমন – জানতে চায় রাধারমণ। রাধারমণ একজন কৃঞ্চপ্রেমিক ছিলেন। কৃঞ্চবিরহে তিনি লিখেছেন অসংখ্য গান। এ সব গানের মধ্যে বিখ্যাত দুটি গান হচ্ছে:

‘‘কারে দেখাবো মনের দুঃখ গো আমি বুক চিরিয়া ।
অন্তরে তুষেরই অনল জ্বলে গইয়া গইয়া।
ঘর বাঁধলাম প্রাণবন্ধের সনে কত কথা ছিল মনে গো।
ভাঙ্গিল আদরের জোড়া কোন জন বাদী হইয়া
কার ফলন্ত গাছ উখারিলাম কারে পুত্রশোকে গালি দিলাম গো
না জানি কোন অভিশাপে এমন গেল হইয়া
কথা ছিল সঙ্গে নিব সঙ্গে আমায় নাহি নিল গো
রাধারমণ ভবে রইল জিতে মরা হইয়া।।’’

‘‘ভ্রমর কইয়ো গিয়া,
শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে অঙ্গ যায় জ্বলিয়া রে,
ভ্রমর কইয়ো গিয়া
ভ্রমর রে, কইয়ো কইয়ো কইয়োরে ভ্রমর,
কৃষ্ণরে বুঝাইয়া মুই রাধা মইরা যাইমু
কৃষ্ণ হারা হইয়ারে, ভ্রমর কইয়ো গিয়া
ভ্রমর রে, আগে যদি জানতামরে ভ্রমর, যাইবারে ছাড়িয়া
মাথার কেশও দুই’ভাগ করি
রাখিতাম বান্দিয়ারে, ভ্রমর কইয়ো গিয়া
ভ্রমর রে, ভাইবে রাধারমন বলে শোনরে কালিয়া
নিব্বা ছিলো মনের আগুন
কে দিলা জ্বালাইয়ারে, ভ্রমর কইয়ো গিয়া।।’’

তিনি বাল্যাবধি ঈশ্বরে বিশ্বাসী আর ধর্মানুরাগী ছিলেন। শাস্ত্রীয় পুস্তকাদীর চর্চা করতেন নিয়মিত। সাধু সন্ন্যাসীর সংস্পর্শে এসে তিনি শাক্ত, শৈব, বৈষ্ণব ইত্যদি নানা মত, পথের সঙ্গে পরিচিত হন। কবির সংসার জীবন সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। শুধু জানা যায়, রাধারমণ-গুণময় দেবীর ৪ ছেলে ছিল। তাদের নাম- রাজবিহারী দত্ত, নদীয়াবিহারী দত্ত, রসিকবিহারী দত্ত আর বিপিনবিহারী দত্ত। তবে দুঃখের বিষয় একমাত্র পুত্র বিপিনবিহারী দত্ত ছাড়া বাকি ৩ পুত্র এবং স্ত্রী গুণময় দেবী অকালে মারা যান, শুধু বেঁচে থাকেন বিপিনবিহারী দত্ত। তারপর কবি রাধারমণ দত্ত সংসারজীবন সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়েন। ১২৯০ বঙ্গাব্দে ৫০ বছর বয়সে কবি চলে যান মৌলভীবাজার জেলাধীন ঢেউপাশা গ্রামে সাধক রঘুনাথ ভট্টাচার্যের কাছে। তিনি তাঁর কাছে শিষ্যত্ব লাভ করেন। শুরু হয় কবির বৈরাগ্য জীবন। আরম্ভ করেন সাধনা। গৃহত্যাগ করে জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওরের পাশে একটি আশ্রম তৈরি করেন। সেখানে দীর্ঘদিন চলে তাঁর সাধন-ভজন। কবি নিজেই গেয়েছেন তাঁর নিজের বহু গান। নলুয়ার হাওরের আশ্রম দিবা রাত্র সাধনা করতেন। কৃষ্ণ নামে মগ্ন হয়ে থাকতেন। এবং অসংখ্য ভক্ত পরিবেষ্টিত ধ্যান মগ্ন অবস্হায় তিনি গান রচনা করে গেয়ে যেতেন। ভক্তরা শুনে শুনে তা স্মৃতিতে ধরে রাখত। পরে তা লিখে নিত।

বিভিন্ন সংগ্রাহকদের মতে, রাধারমণের গানের সংখ্যা তিন হাজারেরও বেশি। সাধক রাধারমণের বেশ কিছু গানের বই বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। অধ্যাপক যতীন্দ্র মোহন ভট্টাচার্য প্রথমে রাধারমণ দত্তের গান সংগ্রহের উদ্যোগ নেন। কলকাতা থেকে বাউল কবি রাধারমণ নামে ৮৯৮ টি গান নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। মোহাম্মদ মনসুর উদ্দীন তাঁর হারামনি গ্রন্থের সপ্তম খণ্ডে রাধারমণের ৫১ টি গান অন্তর্ভুক্ত করেন। সিলেটের মোদন মোহন কলেজের সাহিত্য পরিষদ থেকে ‘রাধারমণ সঙ্গীত’ নামে চৌধুরী গোলাম আকবর সাহিত্যভূষণের সংগৃহিত একটি গ্রন্থ ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকার অ্যার্ডন পাবলিকেন্স প্রকাশ করেছে সুমনকুমার দাশ সম্পাদিত ‘অগ্রন্থিত রাধারমণ’ বইটি। দীর্ঘ দিন পর রাধারমণের অগ্রন্থিত গান সংগ্রহ হওয়ায় এ গ্রন্থটি সংস্কৃতি মহলে প্রশংসা কুড়ায়।

এছাড়া গুরুসদয় দত্ত, নির্মলেন্দু ভৌমিক, আবদুল গাফফার চৌধুরী, কেতকী রঞ্জন গুণ, মুহাম্মদ আব্দুল হাই, হুছন আলী, সৈয়দ মুর্তাজা আলী, নরেশ চন্দ্র পাল, যামিনী কান্ত র্শমা, মুহম্মদ আসদ্দর আলী, মাহমুদা খাতুন, ড. বিজন বিহারী পুরকায়স্থ, সৈয়দ মোস্তফা কামাল, মো. আজিজুল হক চুন্নু, জাহানারা খাতুন, নরেন্দ্র কুমার দত্ত চৌধুরী, অধ্যাপক সুধীর চন্দ্র পাল, অধ্যাপক দেওয়ান মো. আজরফ, নন্দলাল শর্মা, শামসুল করিম কয়েস, শুভেন্দু ইমামসহ আরও অনেক বিদগ্ধজন মানুষ রাধারমণ দত্তের গান সংগ্রহ করেছেন। রাধারমণের আর কয়েকটি জনপ্রিয় গান:

‘প্রাণ সখী রে ওই শোন কদম্বতলে, বংশী বাজায় কে!
বংশী বাজায় কে রে সখী, বংশী বাজায় কে
আমার মাথার বেণী খুইল্যা দিমু, তারে আইনা দে!
প্রাণ সখী রে ওই শোন কদম্বতলে, বংশী বাজায় কে!
যে পথ দিয়ে বাজায় বাঁশি সে পথ দিয়ে যায়
সোনার নূপুর পরে পায়ে!
আমার নাকের নোলক খুইল্যা দিব, সেইনা পথের গায়ে।
আমার গলার হার গড়িয়ে দেব, সেই না পথের গায়ে।
যদি হার জড়িয়ে পড়ে যায়,
প্রাণ সখী রে, ওই শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে।
যার বাঁশি এমন, সে বা কেম্‌ জানিস যদি বল
সখি করিস না তো ছল, আমার মন বড় চঞ্চল।
আমার প্রাণ বলে তার বাঁশি জানে আমার চোখে জল।
প্রাণ সখী রে, ওই শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে।
করলা বাঁশের-ও বাঁশি ছিদ্র গোটা ছয়
বাঁশি কতই কথা কয়।
নাম ধরিয়া বাজায় বাঁশি রহনো না যায়
ঘরে রহনো না যায়।
প্রাণ সখী রে, ওই শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে।
কোন বা ঝাড়ের বাঁশের বাঁশি, ঝাড়ের লাগাল পাই।
জড়ে পেড়ে উগরাইয়া, সায়রে ভাসাই ॥
ভাইবে রাধারমণ বলে, শুন গো ধনি রাই।
জলে গেলে হবে দেখা, ঠাকুর কানাই ॥
প্রাণ সখী রে, ওই শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে।’

আরও একটি গান, বেশ মনে পরে-

‘শ্যামল বরণ রূপে মন নিল হরিয়া
কুক্ষণে গো গিয়াছিলাম জলের লাগিয়া
কারো নিষেধ না মানিয়া সখি গো।।
আবার আমি জলে যাব ভরা জল ফেলিয়া
জল লইয়া গৃহে আইলাম প্রাণটি বান্ধা থুইয়া
আইলাম শুধু দেহ লইয়া সখি গো।।
কি বলব সই রূপের কথা শোন মন দিয়া
বিজলি চটকের মতো সে যে রইয়াছে দাঁড়াইয়া
আমার বাঁকা শ্যাম কালিয়া সখি গো ।।
ভাইবে রাধারমণ বলে মনেতে ভাবিয়া
মনে লয় তার সঙ্গে যাইতাম ঘরের বাহির হইয়া
আমি না আসব ফিরিয়া সখি গো ।।”

কিংবা

‘মান ভাঙ রাই কমলিনি চাও গো নয়ন তুলিয়া
কিঞ্চিত দোষের দোষী আমি চন্দ্রার কুঞ্জে গিয়া।
এক দিবসে রঙে ঢঙে গেছলাম রাধার কুঞ্জে
সেই কথাটি হাসি হাসি কইলাম তোমার কাছে।
আরেক দিবস গিয়া খাইলাম চিড়া পানের বিড়া
আর যদি যাই চন্দ্রার কুঞ্জে দেওগো মাথার কিরা।
হস্তবুলি মাথে গো দিলাম তবু যদি না মান
আর কতদিন গেছি গো রাধে সাক্ষী প্রমাণ আন।
নিক্তি আন ওজন কর দন্দলে বসাইয়া
অল্প বয়সের বন্ধু তুমি মাতি না ডরাইয়া।
ভাইরে রাধামরণ বলে মনেতে ভাবিয়া
আইজ অবধি কৃষ্ণনাম দিলাম গো ছাড়িয়া।

কৃষ্ণ আমার আঙিনাতে আইতে মানা করি।
মান ছাড় কিশোরী।
যাও যাও রসরাজ, এইখানে নাহি কাজ
যাওগি তোমার চন্দ্রাবলীর বাড়ি।
চন্দ্রাবলীর বাসরেতে সারারাত পোহাইলার রঙ্গে
এখন বুঝি আইছ আমার মন রাখিবারে।
ভাবিয়া রাধারমণ বলে দয়ানি করিবে মোরে
কেওড় খোলো রাধিকা সুন্দরী।’

শ্যামকে নিয়ে তাঁর আরও একটি গান আমাদের হৃদয় মন্দিরে জায়গা করে নিয়েছে। তেমনই কয়েকটি গানকে এখানে দেওয়া হলো:

১.

‘শ্যাম কালিয়া সোনা বন্ধু রে
নিরলে তোমারে পাইলাম না
আমার মনে যত দুঃখ
আমি খুলিয়া কইলাম না বন্ধুরে
ফুলের আসন ফুলের বসন রে
বন্ধু ফুলের বিছানা
ওরে নীল কমলে ছুয়া চন্দন
আমি ছিটাইয়া দিলাম না বন্ধু রে
আগে যদি জানতাম বন্ধু রে
যাইবায় রে ছাড়িয়া
ওরে দুই চরণ বান্ধিয়া রাখতাম
আমার মাথার কেশ দিয়া বন্ধু রে
ভাইবে রাধা রমণ বলে রে বন্ধু
মনেতে ভাবিয়া
নিভা ছিল মনের আগুন
কে দিলা জ্বালাইয়া বন্ধুরে
নিরলে তোমারে পাইলাম না’

২.

‘আমারে আসিবার কথা কইয়া
মান করে রাই
রইয়াছ ঘুমাইয়া |
রাধে গো,
আমার কথা নাই তোর মনে,
প্রেম করছ আয়ানের সনে,
শুইয়া আছ নিজ পতি লইয়া |
আমি আর কতকাল থাকব রাধে গো
দুয়ারে দাঁড়াইয়া |
মান করে রাই রইয়াছ ঘুমাইয়া |
রাধে গো,
দেখার যদি ইচ্ছা থাকে,
আইস রাই যমুনার ঘাটে,
কাল সকালে কলসি কাঁখে লইয়া |
আমি জলের ছায়ায় রূপ হেরিবো গো
কদমডালে বইয়া,
মান করে রাই রইয়াছ ঘুমাইয়া |
রাধে গো,
নারীজাতি কঠিন রীতি
বুঝে না পুরুষের মতি,
সদাই থাকে নিজেরে লইয়া,
করছ নারী রূপের বড়াই গো,
রাধারমণে যায় কইয়া ,
মান করে রাই রইয়াছ ঘুমাইয়া।।’’

৩.

‘‘আমার বন্ধু দয়াময়
তোমারে দেখিবার মনে লয়
তোমারে না দেখলে রাধার
জীবন কেমনে রয় বন্ধুরে
কদম ডালে বইসারে বন্ধু
ভাঙ্গ কদম্বের আগা
শিশুকালে প্রেম শিখাইয়া
যৌবনকালে দাগা রে
তমাল ডালে বইসারে বন্ধু
বাজাও রঙের বাশি
সুর শুনিয়া রাধার মন
হইলো যে উদাসী রে
ভাইবে রাধা রমণ বলে
মনেতে ভাবিয়া
নিভা ছিল মনের আগুন
কে দিল-ই জ্বালাইয়া রে।।’’

১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই নভেম্বর, ৮২ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন রাধারমণ দত্ত। তাকে হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী দাহ না করে সহজিয়া মতাদর্শে সমাধিস্থ করা হয়। জগন্নাথপুরের কেশবপুরে তাঁর নামে একটি সমাধি মন্দির রয়েছে। রাধারমণ দত্তের স্মৃতি রক্ষায় ইতোমধ্যে সরকারও নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সিলেটের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝেও হিন্দু-মুসলমান সকল বিয়েতেই ধামাইল গানের তালে তালে বিশেষ একধরনের নৃত্যের প্রচলন আছে। এই ধামাইল গান, নৃত্য আঞ্চলিকতা ছাড়িয়ে জাতীয়, আন্তর্জাতিক স্তরেও সমাদৃত হয়েছে। তবে বিয়েতে ব্যবহারিক প্রয়োগ এখন কমেছে।

রাধারমণ তাঁর অনেক গানে ‘ভাইবে রাধারমণ বলে’ কথাটির উল্লেখ করেছেন। ‘ভাইবে’ মানে হলো ভাবিয়া বা ভেবে। রাধারমণের গানের সংখ্যা যেমন অনেক, তেমনই তাঁর গানের বিষয়ও প্রচুর। বিভিন্ন ধারায় তিনি অসংখ্য ভক্তিমূলক গানও রচনা করেছেন। ধামাইল গানের গতি যেভাবে এগিয়ে যায় তা হলো ক- বন্দনা, খ- আহ্বান বা আসরস্তুতি, গ- উদয়, ঘ- বাঁশি, ঙ- জলভরা, চ- শ্যামরূপ, ছ- গৌররূপ, জ- আক্ষেপ, ঝ- বিচ্ছেদ, ঞ- কুঞ্জ, ট- মানভঞ্জন, ঠ- মিলন, ড- সাক্ষাৎ এবং ঢ- বিদায়। অদ্ভুত সুন্দর এক ব্যঞ্জনায় ধামাইল গান আর নৃত্য দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধতার আবেশে আচ্ছন্ন করে।

কারে দেখাব মনের দুঃখ’, ‘কলঙ্কিনী রাধা’, ‘ভ্রমর কইয়ো গিয়া’, ‘আমারে আসিবার কথা কইয়া’, ‘আমার বন্ধু দয়াময়’, ‘আমি রব না রব না গৃহে’, ‘পালিতে পালিছিলাম পাখি দুধ-কলা দিয়া’, ‘শ্যাম কালিয়া প্রাণ বন্ধুরে’, ‘মনে নাই গো আমারে বন্ধুয়ার মনে নাই’, ‘বংশী বাজায় কে গো সখী’, ‘আমার গলার হার’, ‘বিনোদিনী গো তোর’, ‘দেহতরী ছাইড়া দিলাম’, ‘কার লাগিয়া গাঁথো রে সখী’ প্রভৃতি গান ছাড়াও বৃহত্তর সিলেট, আসাম, শিলিগুড়ি অঞ্চলে ধামাইল গানগুলো আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

Jui  Banner Campaign
ট্যাগ: কৃষ্ণনেটফ্লিক্সবুলবুলরাধালিড বিনোদন
শেয়ারTweetPin

সর্বশেষ

ছবি: সংগৃহীত

টাঙ্গাইলে দুই ভাই যাচ্ছেন সংসদে

ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৬

যে চারটি আসনে ‘না’ ভোট জিতেছে

ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৬

বিএনপি ও জামায়াতের সংঘর্ষে আহত ৮

ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

গোপালগঞ্জ কাদের দখলে?

ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৬

‘গাদ্দারি’র অভিযোগ তুললেন সারোয়ার তুষার

ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৬
iscreenads

প্রকাশক: শাইখ সিরাজ
সম্পাদক: মীর মাসরুর জামান
ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড , ৪০, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণী, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮, বাংলাদেশ
www.channeli.com.bd,
www.channelionline.com 

ফোন: +৮৮০২৮৮৯১১৬১-৬৫
[email protected]
[email protected] (Online)
[email protected] (TV)

  • আর্কাইভ
  • চ্যানেল আই অনলাইন সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সম্পর্কে
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

Welcome Back!

Login to your account below

Forgotten Password?

Retrieve your password

Please enter your username or email address to reset your password.

Log In

Add New Playlist

No Result
View All Result
  • সর্বশেষ
  • ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট
  • প্রচ্ছদ
  • চ্যানেল আই লাইভ | Channel i Live
  • বাংলাদেশ
  • আন্তর্জাতিক
  • স্বাস্থ্য
  • স্পোর্টস
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • কর্পোরেট নিউজ
  • আইস্ক্রিন
  • অপরাধ
  • আদালত
  • মাল্টিমিডিয়া
  • মতামত
  • আনন্দ আলো
  • জনপদ
  • আদালত
  • কৃষি
  • তথ্যপ্রযুক্তি
  • নারী
  • পরিবেশ
  • প্রবাস সংবাদ
  • শিক্ষা
  • শিল্প সাহিত্য
  • চ্যানেল আই সকল সোস্যাল মিডিয়া

© 2023 চ্যানেল আই - Customize news & magazine theme by Channel i IT