ঈদের চতুর্থদিন। ফজলুর রহমান বাবু বাসায় রেস্ট নিচ্ছেন। অভিনেতা মুকুল সিরাজের ফোন পেয়ে অলস হাতে কল রিসিভ করলেন। মুকুল সিরাজ একবার ‘হ্যালো’ বলে চুপ। কয়েক মিনিট চলে যায়। ধরা গলায় ফজলুর রহমান বাবুকে বলেন, ‘ভাইয়া, আপনার বিকাল বেলার পাখি নাটকটা দেখলাম। আবার চুপ। এপাশ থেকে বাবু প্রশ্ন করেন। `হ্যালো হ্যালো’ বলে মুকুলের অবস্থা জানতে চান। কিন্তু মুকুল সিরাজের পাশ থেকে কোনো সাড়া নেই। কিছুক্ষণ পর বোঝা যায়, মুকুল সিরাজ কাঁদছেন। ফুঁপিয়ে কাঁদছেন।
এই ঘটনায় ফজলুর রহমান বাবু বিস্মিত। নাটক ভালো হলে দর্শকের ভালো লাগবে এমনটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একজন অভিনেতা, যিনি জানেন, যা দেখানো হচ্ছে সবই অভিনয়। তিনি কী করে কান্না করেন। অভিনেতারা নাটক দেখার সময় সাধারণত কারিগরি দিকগুলো খেয়াল করে থাকেন। কিন্তু মুকুল সিরাজের এই কান্নায় বাবু বুঝতে পারলেন একটা ভালো নাটকে, ভালো চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।
গত ঈদুল ফিতর ছিল বাংলা নাটকের মোড় ঘুরে যাওয়ার ঈদ। কমেডির নামে ভাঁড়ামি, আঞ্চলিক ভাষায় কাতুকুতু টাইপ সংলাপ, সংলাপে গালাগালি ব্যবহার করে মানুষ হাসানোর যে ক্ষতিকর ধারা চালু হয়েছিল বাংলা নাটকে, তা প্রত্যাখান করেছে দর্শক। যেই তরুণ প্রজন্মে চাহিদার কথা চিন্তা করে নাটকের নামে ভাঁড়ামি শুরু হয়েছিল, সেই ইয়ো ইয়ো তরুণ প্রজন্মই মুগ্ধ হয়েছে সিরিয়াস গল্পের নাটকে। যার মধ্যে অনেকের চোখেই সেরা নাটক বিকাল বেলার পাখি। নাটকটি প্রচার হওয়ার পর ফেসবুকে প্রশংসা ভাসতে থাকে। তরুণ প্রজন্ম শেয়ার করতে থাকে নাটকের ইউটিউব লিংক। বেশির ভাগই মতামত দেন নাটকটা তাদের কাঁদিয়েছে। গত ১৪ দিনে নাটকটি দেখা হয়েছে পাঁচ লাখেরও বেশি বার।
বিকাল বেলার পাখি নাটকের পরিচালক আদনান আল রাজীব দেশের বাইরে থাকায় জানা গেল না নাটকটি নির্মাণের গল্প। তবে ফজলুর রহমান বাবু বলেন, ‘রাজীব একদিন আমাকে ফোন দিয়ে বলল “বাবু ভাই, একটা ফিকশন বানাতে চাই। আপনি তাতে বাবার চরিত্র করবেন।” রাজীব তার নিজের একটা গল্প বলল। তারপর স্ক্রিপ্ট পেলাম। গল্পের একটা অংশ রাজীবের গল্পের সাথে মিল আছে। আমার চরিত্রটা অনুধাবন করার চেষ্টা করলাম। আমাদের চারপাশে অতি চেনা একটা চরিত্র। তবে চরিত্র নিয়ে কাজ করার সুযোগ আছে প্রচুর। রোজার ভেতর কাজ শুরু করলাম। বৃষ্টির কারণে বিঘ্নিত হচ্ছিল শুটিং। এক পর্বের নাটক শুটিং হলো পাঁচদিন। আমি রাজীবকে বললাম, “এত সময় নিয়ে কাজ করছো, বাজেটে কুলাতে পারবে?” রাজীব বলল, “বাবু ভাই, বাজেট নিয়ে ভাবছি না। কাজটা মন মতো শেষ করতে চাইছি।” শুটিংয়ের মতো এডিটিংও ধরে ধরে অনেক সময় নিয়ে শেষ করা হলো।’
নাটক সাড়া ফেলবে এমনটা তখন ভেবেছিলেন কি না জানতে চাইলে অজ্ঞাতনামা ছবির এই অভিনেতা বলেন, ‘ভালো হবে এটা জানতাম। কিন্তু এমন সাড়া ফেলবে, সব দর্শককে কাঁদিয়ে দেবে, তা ভাবিনি।’
নাটক দেখে দর্শক কেন কান্না করছে, জানতে চাইলে বাবু বলেন, ‘এটা মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প। যেই পরিবারে ভালোবাসা থাকলেও জীবনের টানাপোড়নে সেই ভালোবাসার প্রকাশ নেই। ভালোবাসা চোখে দেখা যায় না। সন্তানের প্রতি মমতাটা দারিদ্রে ঢাকা পড়ে যায়। এবং একসময় এই সন্তানও বাবা হন। তখনই বুঝতে পারেন বাবার মমত্ব। তরুণ প্রজন্মকে ‘বাবা কী’ সেটা পরিচয় করিয়ে দিতে পেরেছি। এই পরিচয় করিয়ে দেওয়া এতটাই নিখুঁত ও স্পর্শী ছিল যে দর্শক নিজেকে এই পরিবারের একজন ভাবতে বাধ্য হয়েছে। যখনই পরিবারের একজন ভেবেছে তখন সেও টানাপোড়নে জড়িয়ে গেছে।’ যা দর্শককে কাঁদিয়েছে বলে মনে করেন ফজলুর রহমান বাবু।
চলচ্চিত্র সমালোচক ও লেখক সৈয়দ নাজমুস সাকিব চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, এই নাটকে রিয়েলিটি আছে। অনেক দিন পর দর্শক এমন নাটক দেখল যাতে ইয়ো ইয়ো জীবন নয়, বরং বাস্তব জীবনের স্বাদ পাওয়া যায়। আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষই এই জীবন যাপন করছেন। যাতে বাবার বোঝা সন্তানের ঘাড়ে না আসা পর্যন্ত সন্তান বাবার দরদ বুঝতে পারেন না। বোঝা ঘাড়ে চাপার সাথে সাথে সন্তানও বাবার মতো হয়ে যান। হেঁটে বাসায় ফেরেন। পানি খেয়ে পেট ভরেন। প্রজন্ম বুঝতে পেরেছে ‘বন্ধু ছাড়া লাইফ ইম্পসিবল’ এই ডায়ালগের ভিত্তি নেই। আসলে ‘বাবা ছাড়া লাইফ ইম্পসিবল’। এই বোধের পরিবর্তনই দর্শককে কাঁদিয়েছে।
বিকাল বেলার পাখি নাটকে অভিনয় করেছেন ফজলুর রহমান বাবু, অ্যালেন শুভ্র, ইরোরা গহর, ইফাত তৃষা ও সাফা নমনি।
চিত্রনাট্য করেছেন চারজন মিলে— আদনান আল রাজীব, মনিরুজ্জামান মনির, অন্বয় পাটওয়ারি, সাইদ আল নোমান সিয়াম। চিত্রগ্রহণ, কামরুল হাসান খসরু। সম্পাদনা, মোমিন বিশ্বাস।
বিকাল বেলার পাখি নাটকে








